ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে ঝুঁকিপূর্ন ক্রসিং গুলো মৃত্যু ফাঁদ : দুর্ঘটনা নিহত আহতের পরিসংখ্যান নিয়ে বিভ্রান্তি

মো.জাকির হোসেন :–
দেশের প্রধান ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার দাউদকান্দি টোলপ্লাজা থেকে চৌদ্দগ্রাম মোহাম্মদ আলী পর্যন্ত ১০৪ কিলোমিটার এলাকায় গত এক বছরে হাইওয়ে পুলিশের নথিভূক্ত তালিকায় ২৯১টি দুর্ঘটনা, ১৫৯ জন লোকের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এসংক্রান্তে পুলিশের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত ১০০টি মামলা রুজু করা হয়েছে বলেও সুত্র জানায়। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন । প্রতিদিনই মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে ছোট-বড় দূর্ঘটনা ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রে চালক-মালিক পক্ষের সাথে গোপন আপোষ রফায় মামলার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। এতে কুমিল্লা অংশের সড়ক দূর্ঘটনার প্রকৃত হিসেব অজ্ঞাত রয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে দূর্ঘটনার খবর পেয়ে বেসরকারী মালিকানাধীন রেকার দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহনগুলো সরিয়ে নিয়ে যায়। এক্ষেত্রেও পুলিশ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকে।
সরেজমিন ঘুরে হাইওয়ে ও থানা পুলিশ,পরিবহন সমিতি সহ স্থানীয় বিভিন্ন সুত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়,ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়ক দেশের প্রধান ব্যস্ততম মহাসড়ক। প্রতিদিন এই মহাসড়কের কুমিল্লা অংশ দিয়ে রাজধানী ঢাকা ছাড়াও চট্রগ্রাম,কক্সবাজার,টেকনাফ,বান্দারবন,রাঙ্গামাটি,খাগড়াছড়ি,ফেনী,নোয়াখালী,লক্ষèীপুর,রামগতি,চৌমুহনী,চাঁদপুর,হাজিগঞ্জ,কচুয়া,কুমিল্লার লাকসাম,নাঙ্গলকোট, বরুড়া চৌদ্দগ্রাম কোম্পানীগঞ্জ,মুরাদনগর,ব্রাহ্মণবাড়িয়া,হোমনা,দাউদকান্দি,ভৈরব,কিশোরগঞ্জ,নেত্রকোনা,ময়মনসিংহ সহ উত্তর বঙ্গের বিভিন্ন জেলার কমপক্ষে অর্ধশতাধিক গন্তব্যে কমপক্ষে ২০/২২ হাজার যানবাহন চলাচল করে। সাম্প্রতিক সময়ে মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে ফোর লেনের কাজ শুরু হওয়ার পর চালকরাও হয়ে পড়েছে বেপরোয়া। এতে করে মহাসড়কের অসমাপ্ত অংশ দিয়ে চালকরা যানবাহন নিয়ে আগে যাওয়ার প্রতিযোগীতায় নেমে পড়ে। বর্তমানে মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের প্রায় ৭০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হলেও জেলার সদর উপজেলার বেলতলী,আলেখারচর,ময়নামতি নাজিরাবাজার,সৈয়দপুর,চান্দিনা,ইলিয়টগঞ্জ,গৌরীপুর,দাউদকান্দির বেশ কিছু জায়গায় এখনো কাজ সম্পূর্ন হয়নি। কিন্তু দেখা যায় বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা প্রতিদিন এই অসমাপ্ত অংশ দিয়ে যানবাহন চলাচল করায় নির্মানাধীন সড়কের মাটি সড়ে সেখানে ছোট-বড় খানা-খন্দকের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে অনেক সময় ছোট-বড় যানবহন দুর্ঘটনাকবলিত হচ্ছে। এছাড়া ফোর লেনের কাজ যেভাবে এগুচ্ছে সেভাবে মহাসড়কের ডিভাইডারের কাজ হচ্ছে না এতে চালকরা যত্রতত্র যানবাহন নিয়ে বিপদজনকভাবে মহাসড়কের একপাশ থেকে অপরপাশে চলে আসে আগে যাওয়ার প্রতিযোগীতা করে। একারনেও প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। বিষয়টি নিয়ে ফোর লেনের কুমিল্লা অংশের দায়িত্বেরত নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি স্বীকার করে বলেছিলেন,দুর্ঘটনা এড়াতে মহাসড়কের ডিভাইডারের অসম্পূর্ন অংশে মাটি ফেলে যানবাহন পারাপারে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করা হবে। কিন্তু মহাসড়কের বেলতলী,আলেখারচর,ময়নামতি সেনানিবাস এলাকা,নাজিরাবাজার,সৈয়দপুর,মোকাম,কাবিলা,নিমসার,কোরপাই,চান্দিনা,মাধাইয়া সহ বিভিন্নস্থানে সড়কে ডিভাইডার না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহনগুলো। এতে প্রতিদিই জেলার মহাসড়কের কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনা ঘটছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দায়িত্বশীল সুত্র জানায়,মহাসড়কে প্রতিদিনই কমপক্ষে ৫/৬ টি ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটলেও হাইওয়ে পুলিশ দুর্ঘটনার পর চালক-মালিকদের সাথে সমঝোতা করে মামলা ছাড়াই ছেড়ে দিচ্ছে সেসকল যানবাহন । কোন কোন সময় প্রভাবশালীদের চাপে পড়ে যানবাহনের মালিকরা দুর্ঘনায় নিহত বা আাহতদের নাম মাত্র অর্থ প্রদান করলেও মামলা হয়না কোন চালকের বিরুদ্ধে ফলে মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে যানবাহনের দুর্ঘটনার প্রকৃত হিসেব কখনো পাওয়া যায়না। মহাসড়কে গত এক বছরে কতটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে,নিহত কত,আহত কত,মামলা হয়েছে কতটি যানবাহনের বিরুদ্ধে এসংক্রান্তে তথ্য জানতে চাইলে অজ্ঞাত কারনে কুমিল্লা ময়নামতি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ( ওসি) অপারগতা প্রকাশ করেন সাংবাদিকদের কাছে। কুমিল্লা পুলিশ সুপার মোঃ শাহ আবিদ হোসেন জানান,গত এক বছরে মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে যানবাহন দুর্ঘটনায় ১’শ ৫৯ জন নিহত ছাড়াও যাত্রী, পথচারীসহ কমপক্ষে ৩৩৭ জন লোক আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। মহাসড়কের ব্যস্ততম ক্রসিংগুলোতে সংকেত সহ ট্রাফিক ব্যবস্থা দুর্বলতার কারনেও সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। এই সড়ক পরিবহন শ্রমিক ও যাত্রীদের জন্য আতংকের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।এছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, রাস্তা দখল করে হাটবাজার, দীর্ঘ সময় সড়কের উপর যানবাহন রেখে যাত্রী উঠানামানো,সড়কের উপর সিএনজি স্ট্যান্ড,মহাসড়কে ধীরগতির সিএনজি অটোরিক্সা,ইজিবাইক,নসিমন,ভটভটি,করিমন,ট্রাক্টর সহ অন্যান্য থ্রিহুইলার যানবাহন দ্রুতগতির যানবাহনের সাথে পাল্লা দিতে গিয়েও দুর্ঘটনা কবলিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে না থাকায় সড়কে মানুষের মৃত্যুর মিছিল প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে মহাসড়ক দুটি তদারকির দায়িত্বে থাকা কুমিল্লা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফ উদ্দিন বলেন, আমরা এসব হাটবাজার অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্টদের বারবার চিঠি দিলেও কোনো লাভ হয়নি। লালমাই হাইওয়ে পুলিশের ইনচার্জ (আইসি) লুৎফুর রহমান বলেন, মহাসড়কের ওপর হাটবাজার ও যানজট নিরসনে আমাদের কয়েকটি টিম কাজ করে। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, চালকদের অসাবধানতা, তন্দ্রাচ্ছন্নতা, আইন অমান্য করে গাড়ি চালানো, মোবাইল ফোনে কথা বলা, অদক্ষ চালক দিয়ে গাড়ি চালানো, ওভার লোড, ওভার টেকিংসহ ডিভাইডার ও চার লেনের সড়ক না হওয়ায় এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে অহরহ।
এ ছাড়া পরিবহন মালিক শ্রমিকদের অতি মুনাফার মানসিকতা ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিতদের গাফিলতিকে দায়ী করেছেন তারা। তারা আরও বলেন, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর নির্দেশে ওই মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। চার লেনের কাজ সমাপ্ত হলেই এ ভয়াবহ দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে বলে নাগরিক সমাজের অভিমত। সংশ্লিষ্টরা জানান, মহাসড়কের পাশাপাশি ঘনবসতি ও বিভিন্ন ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, হাটবাজার সংলগ্ন এলাকায় গতিরোধক না থাকায় পথচারী চাপা পড়ার দুর্ঘটনা বেড়ে গেছে। এদিকে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের চৌদ্দগ্রাম বাজার, মিরশানী বাজার, হাড়িসর্দার বাজার, মিয়াবাজার থেকে শুরু করে সদর দক্ষিনের সুয়াগাজী বাজার, পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড়, ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট,বুড়িচংয়ের নিমসার বাজার, কাবিলা , চান্দিনা বাজার, ইলিয়টগঞ্জ বাজার, গৌরীপুর বাজার খুবই ব্যস্ততম এলাকা। এইসকল স্থান দিয়েও প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জেলা সদর ছাড়াও বিভিন্ন জেলায় যাতায়াতে মহাসড়ক ব্যবহার করে। এ প্রসঙ্গে অনেক যাত্রী জানান, মহাসড়কে হাটবাজার,সহ কম গতির যানবাহন চলাচল দুর্ঘটনার অন্যতম কারন। পাশাপাশি অদক্ষ চালকরাও এর জন্য কম দায়ী নয়। এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দায়িত্বশীল একাধিক সুত্র জানায়,জেলার মহাসড়কে যে পরিমান দুর্ঘটনা ঘটে তার সঠিক হিসেব কখনোই জানা সম্ভব হবে না। কারণ যে কোন দুর্ঘটনা ঘটার সাথে সাথে হাইওয়ে বা থানা পুলিশের নিয়োজিত সোর্সরা এক শ্রেনীর পরিবহন নেতাদের যোগসাজশে পুলিশের সাথে গোপন সমঝোতায় এগিয়ে আসে। এতে একটা পছন্দের টাকায় দফারফা হয়ে দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহন ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে । এছাড়া পাবলিক রেকার উঠিয়ে দিয়ে দুর্ঘটনা কবলিত যানবাহন পুলিশের রেকার দিয়ে উদ্ধার সহ সঠিক মনিটরিং করা হলেই প্রকৃত সংখ্যা জানা যাবে। পাশাপাশি অদক্ষ ও ভূয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে যে সকল চালকরা মহাসড়কে যানবাহন চালাচ্ছে সেটা প্রতিরোধ নিয়মিত ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করতে হবে। তাহলে হয়তো মহাসড়কে প্রকৃত দুর্ঘটনার সংখ্যা,নিহত,আহত ইত্যাদি পরিসংখ্যান জানা যাবে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...