মনোহরগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি, জনজীবন বিপর্যস্ত

আকবর হোসেন, মনোহরগঞ্জ প্রতিনিধি:
টানা বর্ষণ ও ডাকাতিয়ার জোয়ারে প্লাবিত হয়ে গেছে কুমিল্লার জলাঞ্চল নামে খ্যাত মনোহরগঞ্জ উপজেলা। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে। উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ডাকাতিয়া নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে । উপজেলা ১৬৫টি গ্রামের প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ পানিবন্ধি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বিপর্যস্ত জীবন যাত্রা। কর্মজীবি ও মধ্য বিত্ত শ্রেণির মানুষেরা পরিবার পরিজন নিয়ে পড়েছে মহাবিপদে। গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে উপজেলার প্রায় ৯০ ভাগ এলাকাই প্লাবিত। উপজেলার সদরের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিছিন্ন। উপজেলা মৎস অফিসের সুত্র মতে, বন্যায় উপজেলার ১০৮টি পুকুর ও জলাশয়ের ৮৫০ হেক্টর মৎস ঘেরের প্রায় ২০০ শতাধিক চাষীরা দিশেহারা। সরকারী হিসাব মতে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমান প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা। যার বেসরকারী হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ হচ্ছে কোটি টাকা ছাড়িয়ে। মৎস্য ঘেরগুলো ভেসে যাওয়ায় অনেক মৎস চাষীকে ঘেরের পাড়ে বিলাত করে কাদতে দেখা গেছে। উপজেলার বাইশগাঁও ইউনিয়নস্থ মৎস্য চাষী মোহাম্মদ উল্যাহ জানান, প্রায় ৪ একর পুকুর জলাশয় দীর্ঘদিন থেকে মৎস চাষ করে আসছেন। এতে তার বিনিয়োগের পরিমান প্রায় ২০ লক্ষাধিক টাকা। বন্যা ঘের ভেসে যাওয়ায় সর্বস্ব খুইয়ে এখন পাগল পারা মোহাম্মদ উল্যাহ্। উপজেলার উত্তর হাওলা ইউনিয়নস্থ অপর মৎস্য চাষী মো. জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘদিন থেকে মৎস চাষ করে আসছেন প্রায় ৫ একর পুকুর জলাশয়ে। বন্যায় খামারের মাছ গুলো ভেসে যাওয়ায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় মোহাম্মদ উল্যাহ্ দিক-বিদিক ছুটাছুটি করে নেট এবং কচুরিপানা দিয়ে ঘের মাছ সর্বশেষ রক্ষার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। এমনিভাবে আরো কথা হয় হাসনাবাদ ইউনিয়নের মৎসচাষী আবুল খায়ের হাজ্বী,কামাল হোসেন, লক্ষণপুর ইউনিয়ন মিজানুর রহমান, মিলন, সরষপুর ইউনিয়নস্থ শাসছু, মানিকসহ আরো অনেকের সাথে। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন এলাকার পট্টি খামার বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় বিক্রির উপযোগী শেডের মুরগীগুলো মরে যাচ্ছে। পট্টি খামারীদের মাঝে মোহাম্মদ তোফায়েল আহমেদ, আলী আকবর, মহিন উদ্দিন জানান খামার ভেসে যাওয়া মুরগীগুলো বাড়ীর চাদের ওপর তুলেও শেষ রক্ষা হয়নি। কারণ ভিজে যাওয়ায় মুরগীগুলো নিমুনী ও রানীক্ষেত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে উপজেলার শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। উপজেলার সাথে যোগাযোগের অন্যতম রাস্তাগুলোর মধ্যে লাকসাম-মনোহরগঞ্জ সড়ক, হাসনাবাদ-মনোহরগঞ্জ সড়ক, শান্তির বাজার-পোমগাঁও-মনোহরগঞ্জ সড়ক, বাইশগাঁও-মান্দারগাঁও-মনোহরগঞ্জ সড়ক, সাইকচাইল-ক্ষণপুর সড়ক, খিলা-মনোহরগঞ্জ সড়কসহ বিভিন্ন রাস্তাগুলোতে পানি ওঠে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এছাড়াও দূষিত পানিতে হাটা চলা ধুয়া মুছা করার কারণে মানুষ বিভিন্ন রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। উপজেলার শিক্ষা খাতে ক্ষতিগ্রস্থ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান ও উপজেলা প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য মতে, উপজেলার ১০২ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নুূরানী মাদ্রাসার প্রায় সবগুলো প্লাবিত হয়ে গেছে এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ২৬টি স্কুল, ১টি স্কুল এন্ড কলেজ, ১টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ১৪টি মাদ্রাসা, ৩টি কলেজের প্রায় সবগুলোই বন্যা কবলিত। এ গুলোর মাঝে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ উত্তর হাওলা ইউনিয়নস্থ কৈয়ারপাড় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, জনতা বাজার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাইশগাঁও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মান্দারগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়, দাদঘর-কেয়ারী দাখিল মাদ্রাসা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পাঠদানে ব্যাঘাত ঘটায় সরকারীভাবে ছুটির কোন দিক-নির্দেশনা না থাকলেও প্রতিষ্ঠান প্রধান ও ম্যানেজিং কমিটির লোকজন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাপ্তাহিক মৌখিক ছুটি ঘোষণা করে তবে দাপ্তরিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অফিস কক্ষ খোলা রাখা হয়। বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্থ বাইশগাঁও ইউপি অফিস কার্যক্রম প্রায় ১ স্প্তাাহ বাবত বন্ধ রয়েছে। এদিকে ভারী বর্ষণের ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ সর্বোচ্চ ৩৪ ঘন্টা পর্যন্ত বন্ধ থাকে। বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মো. তাজুল ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইশরাত জাহান পান্না, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোস্তফা মাহিদুল মোরশেদ, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ইলিয়াছ পাটোয়ারী, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আফরোজা কুসুমের সাথে যোগাযোগ করলে তারা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের পাশে দাড়ানোর জন্য উপজেলার সর্বস্তরের জনগণের প্রতি উদাত্ব আহ্বান জানান।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...