কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী খাদি শিল্প :বিশ্বব্যাপী ঐতিহ্য ধরে রাখলেও অর্থাভাবে তাতীঁরা পরিবর্তন করছে পেশা

মো.জাকির হোসেন :–
কুমিল্লার খাদি শিল্প । ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটি সুদীর্ঘকাল থেকে এই জেলাকে পাক-ভারত সহ বিশ্বের বিভিন্নস্থানে পরিচিত করে তোললেও যে তাতীঁরা এই শিল্পটির জন্য এত মেধা শ্রম দিয়েছে তাদের উন্নয়নে কেউ এগিয়ে আসেনি। ফলে বিশ্বের দরবারে কুমিল্লার খাদি পরিচিতি পেলেও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই পেশা থেকে দুরে সরে যাচ্ছে তাতীঁরা। ফলে এখন কেউ চাইলেই পায়রা কুমিল্লার খাদি কাপড়। সেস্থান বর্তমানে দখল করে আছে মেশিনের তৈরী তাতের কাপড়। যা জেলা সহ দেশের সর্বত্রই কুমিল্লার খাদি কাপড় বলে বিক্রয় করছে বিক্রেতারা। খাদি’র যখন এই দূর্দীন তখনও কুমিল্লার চান্দিনার গ্রামীন খাদি নামের একটি প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটিকে বাচিঁয়ে রাখার প্রানান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশীয় কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের তৈরী খাদি কাপড় সংগ্রহ করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিক্রয় করে কুমিল্লার খদ্দরকে পরিচিত করে রেখেছে। খদ্দর কাপড়টির উৎপাদন প্রক্রিয়া তুলা থেকে তৈরী সুতা দিয়ে। কুমিল্লার চান্দিনা ও আশপাশের দেবিদ্বার,বুড়িচং,মুরাদনগর উপজেলার তাতীঁরা সুদীর্ঘকাল থেকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তুলা সংগ্রহ করে নিজস্ব চরকায় সুতা কেটে সেই সুতা থেকে খদ্দর কাপড় তৈরী করে আসছে। তবে বর্তমানে মেশিনের তৈরী সুতার কাপড়ের কারনে কুলিয়ে উঠতে পারছেনা তাতীঁরা। একেতো সময় অনেক পাশাপাশি মুজুরী কম থাকায় তাই দিন দিন এই পেশা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে তাতীরা। তারপরও ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পটিকে স্থানীয়ভাবে বাচিঁয়ে রাখার প্রানান্তকর চেষ্টা চালাচ্ছে কেউ কেউ। দেবিদ্বারের তাতীঁ রনজিৎ কুমার দেবনাথ আক্ষেপ করে বলেন,একেতো কাচাঁমালের অতিরিক্ত মূল্য,তারউপর মেশিনের তৈরী কাপড়ের সাথে হাতে তৈরী কাপড়ের উৎপাদনে দীর্ঘ সময় সহ মুজুরী কম থাকায় বর্তমানে দিন দিন এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে তাতীঁরা। তবে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও তাতীঁদের মাঝে যদি সরকারী ভাবে আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হতো তবে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখা যেত।

1
কুমিল্লার চান্দিনাকে অনেকেই বলেন খদ্দরের আদি এলাকা। এই চান্দিনার পৌর এলাকাধীন চান্দারপাড় এলাকায় অবস্থিত গ্রামীন খাদি নামের খদ্দর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি। এর প্রতিষ্ঠাতা শৈলেন্দ্রনাথ গুহ। তারা নিজেদের আদি খদ্দরের কাপড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বলে দাবী করেন। বর্তমানে এটি পরিচালনা করছেন অরুণ কান্তি গুহ। স্থানীয় ও গ্রামীন খাদি নামের প্রতিষ্ঠানটির সাথে আলাপ করে জানা যায়,জেলার চান্দিনা,দেবিদ্বার,মুরাদনগর,হোমনা ও তিতাসে রয়েছে কমপক্ষে ২ থেকে আড়াই’শ তাতীঁ। এই প্রতিষ্ঠানটি ছাড়াও স্থানীয় কিছু অবস্থাপন্ন লোক নানাভাবে আর্থিক সুবিধা দিয়ে এই তাতঁ শিল্পটি বাচিঁয়ে রেখেছে। আর এর মাঝে বেচেঁ আছে কুমিল্লার খদ্দর। গ্রামীন খাদির পরিচালক অরুন কান্তি গুহ জানান,তাদের প্রতিষ্ঠানটি চান্দিনা,দেবিদ্বার,হোমনা,তিতাসের বিভিন্ন তাতঁশিল্পিদের তুলার তৈরী সুতা সহ নগদ অর্থ আগাম সাহায্য দিয়ে তাতীদেরকে খদ্দর কাপড় তৈরীতে প্রানান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আর পরবর্তীতে উৎপাদিত খদ্দর কাপড় তারা নিজেরাই ওই তাতীঁদের কাছ থেকে ক্রয় করে বাজারজাত করছেন। তিনি আরো বলেন,তাদের প্রতিষ্ঠান প্রতিমাসে কমপক্ষে ১০/১২ হাজার মিটার কখনো কখনো পরিবেশ পরিস্থিতি অনুকুলে থাকলে ২০ হাজার মিটার উৎপাদিত খদ্দর কাপড় রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রয় করেন। ঢাকার প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে তাদের পছন্দের নমুনা সরবরাহ করে গ্রামীন খাদি’র কাছে। তারা সেভাবে সরবরাহ করে। পরবর্তীতে ওই সকল প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব পছন্দের তৈরী কাপড় রপ্তানী করছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। এক্ষেত্রে আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন, বেলজিযাম, ফ্রান্স, জার্মানী, অস্ট্রেলিয়া ,জাপান উল্লেখযোগ্য। স্থানীয়ভাবেভাবে জানা যায়, জেলার চান্দিনা উপজেলার বারেরা, মাধাইয়া, দোতলা, নাওতলা, রায়পুর সহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় একশ্রেনীর ব্যবসায়ী তুলা ক্রয় করে স্থানীয় মহিলাদের কাছে তা সরবরাহ করেন। তারা নিজস্ব চরকায় সুতা কেটে পরবর্তীতে সেটা ওই ব্যবসায়ীদের কাছে পুনরায় বিক্রি করেন। এরপর সেই সুতাগুলো গ্রামীন খাদির কাছে সরবরাহ করা হয়। সেটা পরবর্তীতে তাতীঁদের কাছে পৌছে যায়। তাতীঁরা সেই সুতা দিয়ে কাপড় বুনে সেটা আবারো গ্রামীন খাদি’র কাছে পৌছে দেয়। এরপর ঢাকা সহ দেশের প্রতিষ্ঠিত তৈরী খাদি পোষাক রপ্তানী কারক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পছন্দের তালিকা নিয়ে এগিয়ে আসে। রং,কাপড়ের ধরন তুলে দেয় গ্রামনি খাদি’র কাছে। গ্রামীন খাদি’ও সে হিসেবে তাদের সরবরাহ তুলে দেয়। এরপর এসকল প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদিত কাপড় রপ্তানী হয় ইউরোপ,আমেরিকা সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। স্থানীয়ভাবে আলাপকালে জানা যায়,চান্দিনার বারেরা, বেলাশ্বর, ভোমরকান্দি, রামমোহন, ভানী, মাধাইয়া, দেবিদ্বারের বরকামতা, বাখরাবাদ, মোহনপুর, দীঘিরপাড়, মুরাদনগরের কোম্পানীগঞ্জ, বাতাকান্দি, জাহাপুর, বাঁশকাইট, হোমনার রামকৃষ্ণপুর, শোভারামপুর, হিঙ্গারীয়া, তিতাসের কলাকান্দি ইউনিয়নের আফজলেরকান্দি গ্রামে তাতীঁরা তুলা থেকে তৈরী সূতা থেকে কাপড় বুনে সেই কাপড় চান্দিনা গ্রামীন খাদিতে নিয়ে আসে। সুত্র জানায়,তুলার বাজার মূল্যের উপড় কাপড়ের মূল্য উঠানামা করলেও প্রতি গজ খাদি কাপড় গড়ে ২’শ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া তুলা ও মেশিনে তৈরী সুতার সাহায্যে উৎপাদিত কাপড় প্রতি গজ ১’শ ৪০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। গ্রামীন খাদি সুত্রে জানা যায়,তারা তাদের ক্রেতাদের চাহিদা ও পছন্দের উপর কাপড় উৎপাদন করে। তাদের পছন্দের মাঝে রয়েছে স্ট্রাইপ,চেক স্ট্রাইপ,গড় চেক,প্লেন,তেসরি প্রভৃতি শ্রেনীর কাপড় । ঢাকার প্রতিষ্ঠিত রপ্তানী কারক প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, বিবি রাসেল, রুবি গজনবী, ছোটনা, দেশাল, ক্রেক্রাফট, প্রবর্তনা, মটিভ, রঙ, অঞ্জন, নিপূণ, বাংলার মেলা। এসকল প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পছন্দের সরবরাহ নিয়ে গ্রামীন খাদিতে এসে ভীড় করে। পরে উৎপাদিত প্রায় সকল কাপড়ই ঢাকায় চলে যায়। সেখান থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। এইভাবে কুমিল্লার প্রত্যন্ত জনপদে উৎপাদিত খাদি কাপড় উৎপাদনে যে তাতীঁরা বিশাল ত্যাগ শিকার করে দেশ বিদেশে পরিচিত করছে কুমিল্লার খদ্দর’কে ,সেই তাতীঁরা কিন্তু ভালো নেই একেবারেই। জেলার বিভিন্নস্থানে ঘুরে তাতীঁদের সাথে আলাপ করে জানা যায়,বর্তমানে মেশিনের তৈরী কাপড়ের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় হাতে তৈরী কাপড়ের দিকে সাধারন মানুষের নজর কম। এছাড়াও মুজুরী কম থাকায় দিন দিন এই পেশা থেকে লোকজন অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। বর্তমানে কুমিল্লার খাদি’র অবস্থা,এর প্রসার,প্রচার,সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রামীন খাদি’র পরিচালক অরুণ কান্তি গুহ বলেন,সুপ্রাচীন কাল থেকে কুমিল্লার খদ্দর জেলা পেরিয়ে দেশের বাইরে এর সুনাম পরিচিতি বৃদ্ধি করে আসছে। আজও সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।। তবে মেশিনের উৎপাদিত কাপড়ের সাথে কুলিয়ে উঠতে না পারায় দিন দিন চরকায় কাটা সুতা দ্বারা তাতেঁর তৈরী কাপড়ের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা সহ তাতীঁদের আর্থিক সহযোগীতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শুধুমাত্র ঐতিহ্যবাহী এই খাদি’কে টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...