নাঙ্গলকোটে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের ১২৬টি পদ শূন্য : শিক্ষা কার্যক্রম ব্যহত

 

মো. আলাউদ্দিন :—
কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে তীব্র শিক্ষক সংকট দেখা দিয়েছে। উপজেলার ১৪৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫২ টিতে প্রধান শিক্ষক ও ৭৪ টিতে সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এতে বিদ্যালয়গুলোতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাকার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় ৭৮টি পুরনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা অনুযায়ী রেজিস্টার্ড, কমিউনিটি ও এনজিও পরিচালিত মোট ৬৩টি প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে পুরনো সরকারি ৭৮, নতুন জাতীয়করণ করা ৬৩ এবং বিদ্যালয়বিহীন গ্রামে নতুন তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ মোট ১৪৪টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিদ্যালয়গুলোতে ৫৫হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। কিন্তু তীব্র শিক্ষক সঙ্কট থাকায় দীর্ঘদিন যাবত বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষাকার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে।
তথ্য মোতাবেক উপজেলায় পুরনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের ১৬টি ও সহকারী শিক্ষকের ৪০টি পদ শূন্য রয়েছে। নতুন জাতীয়করণ করা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ৩৬টি প্রধান শিক্ষকের পদ এবং ৩৪টি সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত তিনটি নতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত এক বছরেও শিক্ষকের কোনো পদ সৃষ্টি করা হয়নি। বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ডেপুটেশনে তিনজন করে শিক্ষক দিয়ে প্রাক-প্রাথমিকসহ অন্য পাঁচটি শ্রেণীর ক্লাস পরিচালনা করতে গিয়ে শিক্ষকদের গলদঘর্ম হতে হয়। বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সঙ্কটের পাশাপাশি বর্তমানে একজন প্রধান শিক্ষকসহ ২৫ জন মাতৃত্বকালীন ছুটি, পিটিআই ট্রেনিংয়ে আছেন ২৫ জন এবং চিকিৎসা ছুটিতে আছেন পাঁচজন শিক্ষক।
এ ছাড়া বর্তমান সরকারের সারা দেশে বিদ্যালয়বিহীন গ্রামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন পরিকল্পনার আওতায় নাঙ্গলকোটে তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রত্যেক বিদ্যালয়ে ৪৬ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন করে শিক্ষক নিয়োগের নিয়ম থাকলেও এখানে তীব্র শিক্ষক সঙ্কটের কারণে এ নিয়ম মানা সম্ভব হচ্ছে না।
পুরনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নতুন জাতীয়করণকৃত ও নতুন প্রতিষ্ঠিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাসিক সমন্বয় মিটিং ও জরুরি প্রয়োজনে উপজেলা সদরে এলে তখন দুই থেকে তিনজন শিক্ষক দিয়ে ক্লাস পরিচালনা করতে হয়। এতে করে শিক্ষকদের ক্লাস পরিচালনায় হিমশিম খেতে হয়। এ ছাড়া বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকসহ সহকারী শিক্ষকের তীব্র সঙ্কট থাকায় বিরামহীনভাবে ক্লাস নিতে গিয়ে শিক্ষকেরা মনোযোগ সহকারে ক্লাস নিতে পারেন না বলে জানিয়েছেন অনেক শিক্ষক। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকেরা তাদের বাৎসরিক নিয়মিত ছুটি, মাতৃত্বকালীন ছুটি, চিকিৎসা ছুটি এবং পিটিআই ট্রেনিংসহ উপজেলা রিসোর্স সেন্টারে বিভিন্ন ট্রেনিংয়ে থাকলে অন্য দুই থেকে তিনজন শিক্ষক দিয়ে দুই শিফটে ক্লাস চালিয়ে নেয়া সম্ভব হয় না। অন্যদিকে বিদ্যালয়গুলোতে বছরের পর বছর প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় শিক্ষকেরা যেনতেনভাবে ক্লাস চালু রাখেন।
দক্ষিণ শাকতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. লিটন জানান, বিভিন্ন বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সঙ্কটের কারণে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল সোয়া ৪টা পর্যন্ত মধ্যে আধা ঘণ্টা বিরতি ছাড়া একটানা ক্লাস নিতে হয়। এতে প্রতি শিক্ষককে প্রায় ৯টি ক্লাস নিতে হয়। যার ফলে পাঠদানের মান ভালো করা সম্ভব হয় না। কোনো শিক্ষক ছুটিতে থাকলে রুটিন এবং পাঠ টিকা অনুযায়ী ক্লাস নেয়া কখনো সম্ভব হয় না। অন্যদিকে প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে বছরের শুরুতে শিক্ষকদের শিশু জরিপ, সুবিধাভোগী পরিবার বাছাই, উপবৃত্তি তালিকা তৈরি এবং স্টুডেন্ট কাউন্সিলের জন্য ভোটার তালিকা তৈরিতে শিক্ষকদের ব্যস্ত থাকতে হয় প্রায় তিন মাস। এতেও প্রতিষ্ঠানগুলোতে ওই সময় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিদ্যালয়গুলোতে প্রথম শিফটে শিশু শ্রেণী, প্রথম, দ্বিতীয় শ্রেণী এবং বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীর ক্লাস চালু থাকে। দ্বিতীয় শিফটে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণীর কাস নিতে হয়। মাত্র তিন থেকে চারজন শিক্ষকের মধ্যে প্রতি শিক্ষক প্রথম শিফটে চার পিরিয়ড ও দ্বিতীয় শিফটে ছয় পিরিয়ড ক্লাস নিতে গিয়ে হাঁফিয়ে উঠেন। যার ফলে ভালোভাবে পাঠদান দিতে পারেন না।
নাঙ্গলকোটের জলাঞ্চলখ্যাত মৌকারা ইউনিয়নের গোরকমুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যোগাযোগবিহীন হওয়ায় বিদ্যালয়টিতে কোনো শিক্ষক যেতে চান না। বিদ্যালয়টিতে দীর্ঘ ১১ বছর যাবত কোনো প্রধান শিক্ষক নেই। মধ্যে ছয় মাস একজন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া বিদ্যালয়টিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ মাত্র তিনজন সহকারী শিক্ষক রয়েছে। যার ফলে বছরের পর বছর প্রধান শিক্ষক বিহীন মাত্র তিনজন শিক্ষক দিয়ে কোনোভাবে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিদ্যালয়টির চতুর্দিকে বর্ষাকালে প্রায় চার মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকায় এখানে দায়িত্বরত শিক্ষকদের বর্ষাকালে পানি বন্দী অবস্থায় কষ্টের মধ্যে ক্লাস পরিচালনা করতে হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক যখন মাসিক মিটিং ও বিভিন্ন অফিসিয়াল কাজে উপজেলা সদরে আসেন তখন মাত্র দুইজন সহকারী শিক্ষক দিয়ে শ্রেণী কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। বর্তমানে সহকারী শিক্ষক বিল্লাল হোসেন গত প্রায় এগার বছর থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। তার বাড়ি স্কুল থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরত্বে।
বটতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষকদের ১০টি পদের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন ছয়জন। এর মধ্যে একজন ডেপুটেশনে বিদ্যালয়বিহীন নতুন স্থাপিত প্রতিষ্ঠান হিরমত আলী মজুমদার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন। চারজন সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতে গিয়ে প্রধান শিক্ষককে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
দক্ষিণ বায়রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত দুই বছর থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ তিনজন শিক্ষক দিয়ে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীসহ পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ক্লাস পরিচালনা করতে গিয়ে শিক্ষকেরা পেরে উঠছেন না। শিহর চিওড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩৭০জন শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছেন পাঁচজন শিক্ষক। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রধান শিক্ষকের একটি পদ এবং সহকারী শিক্ষকের তিনটি পদ শূন্য রয়েছে।
সদ্য জাতীয়করণকৃত করাকোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৬৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ শেখ ছায়দী জানান, চারজন শিক্ষক দিয়ে ক্লাস পরিচালনা করতে গিয়ে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এতে করে শিক্ষকদের পাঠদান বিঘিœত হয়।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার নবীর উদ্দিন বলেন, নাঙ্গলকোটে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে তীব্র শিক্ষক সঙ্কট রয়েছে। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করা প্রয়োজন। ছয় মাস পর-পর শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষক নিয়োগের নিয়মিত প্যানেল থাকলে পদ শূন্য হওয়ার সাথে সাথে নতুন শূন্য পদ পূরণ করা সম্ভব হবে।
তিনি আরো বলেন, শিক্ষকদের আরো কর্তব্যপরায়ণ হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ এবং উদ্বুদ্ধকরণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তাদের আগমন-প্রস্থান যথাসময়ে ঠিক রাখার চেষ্টাও করা হচ্ছে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...