সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভে সিয়াম-সাধনা

—মো. আলী আশরাফ খান
আমরা জানি, প্রত্যেক মানুষের মাঝেই দু’টি প্রবৃত্তি বিদ্যমান। সুপ্রবৃত্তি আর কুপ্রবৃত্তি। সুপ্রবৃত্তি মানুষকে সত্য-সুন্দর আলোর পথে পরিচালিত করে। আর কুপ্রবৃত্তি অন্ধকার-ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে। এই দুই প্রবৃত্তির বৈরিতা একজন মানুষ যতদিন বাঁচবে ততদিন চলবে এটাই স্বাভাবিক। মানুষের মধ্যে যে কুপ্রবৃত্তি রয়েছে, সে কুপ্রবৃত্তি মানুষকে অন্যায়-অনাচারে লিপ্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে। কুপ্রবৃত্তির এ তাড়না থেকে আত্মরক্ষার উপায় এবং উন্নততর আদর্শের অনুসারী হওয়ার উদ্দেশ্যেই রমযানের রোজা পালনের বিধান করা হয়েছে। মানুষ যাতে কুপ্রবৃত্তিকে দমন করতে পারে, শরীয়তের বিধান পালন করতে পারে এবং যাবতীয় অকল্যাণকর কাজ থেকে আত্মরক্ষা করে আল্লাহপাকের অনন্ত-অসীম রহমতের যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে-এ উদ্দেশ্যেই আল্লাহপাক রমযানের সিয়াম-সাধনার বিধান প্রবর্তন করেছেন। অন্যান্য ইবাদতে লোক দেখানো ইবাদতের সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু রোজার মধ্যে এ সম্ভাবনা নেই। রোজা শুধু আল্লাহপাকের জন্যই পালন করা হয়। রোজা মানবের জন্য এক অফুরন্ত নেয়ামত। শুধু তাই নয়, এটি স্রষ্টা প্রদত্ত এক অমীয় সুধা সমগ্র মানবজাতির জন্যই।
রোজা বা সিয়াম-সাধনার ব্যাপকতা বহুল। মহান আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন রমযানের ঐতিহাসিক পটভূমির প্রতি ইঙ্গিত করে কুরআন পাকে এরশাদ করেন, “হে ঈমানদারগণ তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো”। এখানে মুসলমানদের প্রতি রোজা ফরজ হওয়ার নির্দেশটি একটি বিশেষ ব্যবস্থার কথা উল্লেখিত হয়েছে। শুধু নির্দেশই নয়, এটাও বলা হয়েছে যে, রোজা শুধু তোমাদের উপরই ফরজ করা হয়নি, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের উপরও ফরজ করা হয়েছিল। এ কথাগুলোর দ্বারা যেমন রোজার বিশেষ গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে তেমনি মুসলমানদের এই মর্মে একটা সান্ত¦নার ইঙ্গিতও রয়েছে যে, রোজা একটি কষ্টকর ইবাদত সত্য, তবে তা শুধু মুসলমানদের উপরই ফরজ হয়নি, তাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোর উপরও ফরজ করা হয়েছিল।
বিশ্ববিখ্যাত তাফসীরকার আল্লামা আলুসী (রহ.)-এর মতে, হযরত আদম (আ.)-এর প্রতি রোজার হুকুম ছিল। কিন্তু সেই রোজার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় না। অন্যান্য তাফসীর বিশারদগণও এ ধরনের মত পোষণ করেছেন। আরেফ বিল্লাহ শাইখুল ছিন্দ আল্লামা মাহমুদুল হাসান (রহ.) উপরোক্ত আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, ‘রোজার হুকুম আদম (আ.)-এর যুগ হইতে যথারীতি আজ পর্যন্ত বিদ্যমান রয়েছে’। পৃথিবীর প্রথম যুগের প্রথম শরীয়তধারী নবী হযরত নূহ (আ.)-কে লক্ষ্য করেই আল্লাহপাক কুরআনে বলেছেন, “লাইইউমিনা মিন কাওমিকা ইল্লামান ক্বাদ আমানা”। অর্থঃ যারা ঈমান এনেছে তারা ছাড়া আর কেহই ঈমান আনবে না”। তখন হযরত নূহ (আ.) অতিষ্ঠ হয়ে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করেন, ‘রাব্বিলাতাবার আলাল আরদ্বি মিনাল কাফিরীনা দাইয়্যারা’। অর্থঃ হে আমার পালনকর্তা পৃথিবীর বুকে যেন কোনো কাফেরের গৃহ অবশিষ্ট না থাকে”।
কেয়ামতের দিন শাফায়াতের জন্য উম্মতগণ সর্বপ্রথম হযরত নূহ (আ.)-এর নিকট যাবে। এ কারণেই হযরত নূহ (আ.)-কে পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম রসূল হিসেবে ঘোষণা করে।” ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) তাফসীরে ইবনে কাসীরে লিখেছেন, হযরত যাহহাক (রহ.) বলেছেন, “হযরত নূহ (আ.)-এর যুগ হতে প্রত্যেক মাসেই তিনটি রোজা পালন করার হুকুম ছিল। তারপর যখন রমযানের রোজা পালনের হুকুম হল, তখন হতে প্রতি মাসে তিনটি রোজা পালনের হুকুম প্রবর্তিত হলো। হযরত মুসা (আ.) ও হযরত দাউদ (আ.)-এর সময়েও রোজা পালনের নির্দেশ ছিল বলে জানা যায়। মহান আল্লাহপাক যখন হযরত মুসা (আ.)-কে তুর পর্বতে ডেকে তাওরাত কিতাব প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিলেন, তখন আল্লাহপাক হযরত মুসা (আ.)-কে সেখানে ৩০ রাত অবস্থানের নির্দেশ দিলেন। এ সম্পর্কে কুরআন মাজিদে এরশাদ হয় যে, “আর স্মরণ কর ঐ সময়কে যখন আমি মূসার জন্য ৩০ রাত নির্ধারণ করেছিলাম এবং আরো ১০ দ্বারা পূর্ণ করেছিলাম। এভাবে তার পালনকর্তার নির্ধারিত ৪০ রাত পূর্ণ হয়।”
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে, হযরত মুসা (আ.) যিলক্বদ এবং যিলহজ্জের ১০ দিন রোজা পালন করে আল্লাহ পাকের দরবারে হাজির হন এবং তাওরাত কিতাব প্রাপ্ত হন এবং হযরত ইবনে ওমর (রা.)-কে প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (স.) রোজা পালনের আদেশ স্বরূপ এরশাদ করেন যে, ‘ছুম আফদ্বালাছ ছিয়ামি ইনদাল্লাহি ছাওমা দাউদা আলাইহিস সালামু কানা ইয়া ছাওমু ইয়াওমাও ওয়াইয়াফতুরুর ইয়াওমান। অর্থঃ আল্লাহর নিকট যে রোজা উত্তম সে রোজা রাখ, আর সেই রোজা হলো-যা হযরত দাউদ (আ.) রেখেছেন।
হযরত দাউদ (আ.) একদিন রোজা রাখতেন আর একদিন ইফতার করতেন। এই হাদীস দ্বারা জানা যায়, হযরত দাউদ (আ.) রোজা রাখতেন। শুধু তই নয়, বাইবেল ‘দার’ বাদশাহের যুগে বাইতুল লাহমের বাসিন্দা এবং বনি ইয়াহুদাদের প্রতি রোজা রাখার বিষয় সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এমনি করে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সব শরীয়তেই রোজার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির এ কঠোর সাধনার প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। এছাড়াও ধর্ম, গোত্র নির্বিশেষে সকলের মধ্যেই রোজা পালনের তথ্য পাওয়া যায়। তাকওয়া অর্জন, আত্মশুদ্ধি ও স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনে রোজা আদি যুগ হতেই বিভিন্ন বর্ণক্ষেত্র এবং ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। প্রাচীন চীনা সম্প্রদায়ের লোকেরা একাধারে কয়েক সপ্তাহ রোজা রাখত। অনুরূপ রোজা রাখার রেওয়াজ খৃস্টান পাদ্রী, পারসিক, অগ্নিপূজক এবং হিন্দুযোগীদের মধ্যে লক্ষ্য করা যেত। অবশ্য পারসিক এবং হিন্দুযোগীদেরও রোজা ছিল, কিন্তু তারা রোজা থাকা অবস্থায় মাছ, গোশত, তরিতরকারি ইত্যাদি খাওয়া থেকে বিরত থাকতো বটে, ফলমূল এবং কিছু কিছু পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকত না।
ইসলামে রোজার যে নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা এই দুই বিপরীতমুখী নিয়মের মধ্যপন্থাস্বরূপ। ইসলামে রোজা একদিকে যেমন কঠোরতা বিবর্জিত, অপরদিকে এর বাস্তব রূপ আংশিকভাবেও প্রতিষ্ঠা পায়নি। অর্থাৎ এখানে দীর্ঘ সময় একাধারে রোজা রাখাও যেমন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তেমনিভাবে রোজাদরকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যাবতীয় পানাহার হতেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে। একদিকে সূর্যাস্ত যাওয়ার পর্যন্ত যেকোনো বস্তু পানাহার, যেকোনোভাবেই হোক না কেন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ রাসূল্লাল্লাহ (স.) বলেন, ‘ইয়্যাকুম ওয়ালা বিছালা ওয়ালা ছামা মান ছামা দ্বাহারা”।
অর্থঃ একাধারে রোজা রাখা নিষেধ, যারা সব সময় রোজা রাখে, ইসলামের দৃষ্টিতে তা রোজাই নয়।” তিনি আরও বলেন, “লা ইয়াযালুন্নাছু বি খাইরিন আজ্জালু ইফতিরা”। অর্থঃ মানুষের জীবনে সত্যের আলো বিদ্যমান থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নির্ধারিত সীমায় গ-িবদ্ধ থেকে যথাসম্ভব ইফতার তাড়াতাড়ি করবে।” রোজার ব্যাপকতা প্রসঙ্গে আরও বলা যায় যে, আগের যুগে রোজা কোনো বিশেষ জাতির ওপর জরুরি বিবেচিত হত। যেমন প্রাচীন হিন্দুদের বিশ্বাস ছিল, রোজা শুধু তাদের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিবর্গ ব্রাহ্মণদেরই পবিত্র দায়িত্ব। আবার গ্রীকরা বিশ্বাস করতো, রোজা একমাত্র নারীদের উপর বাধ্যতামূলক, এটা পুরুষদের ইবাদত নয়। কিন্তু ইসলাম এ ব্যাপারেও মধ্যম পন্থা অবলম্বন করেছে।
ইসলাম এত বড় গুরুত্বপূর্ণ এবাদতকে শুধু নারী সম্প্রদায় বা কোনো বিশেষ ব্যক্তিবর্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং রোজার প্রশ্নে ইসলাম সাম্যের নীতি গ্রহণ করেছে। এখানে ধনী-গরীব, বাদশা-ফকির, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে। সবাইকে রোজার শর্তাবলী অবলম্বণপূর্বক রোজা রাখতে হবে। প্রত্যেকটি মানুষ যেমন যেন রোজার বরকত এবং ফয়েজ লাভ করতে পারে- এটাই রোজার ব্যাপকতার মুখ্য উদ্দেশ্য। বাহ্যত ধনী ব্যক্তি রোজার মাধ্যমে গরীবের দুঃখকষ্ট বুঝতে পারবে, এটাই শুধু রোজার পবিত্র উদ্দেশ্য নয়। তাকওয়া অর্জনের প্রশ্নে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের জন্যই রোজা ফরজ করা হয়েছে। রোজার ফরজ ও বরকতে প্রত্যেকটি মানুষ সংগ্রামী হবে, সংবেদনশীল হবে, সহানুভূতিশীল হবে। এটাই রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য। সম্পদ ও পদমর্যাদার প্রশ্ন যাতে মানুষ সমাজে পাহাড়সম পার্থক্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, এরূপ মহৎ উদ্দেশ্যে রোজা ফরজ করা হয়েছ। সমাজে ধনী-দরিদ্র ও উঁচু-নীচ সকলের জন্য ফরয করা হলেও ক্ষেত্র বিশেষে এই নিয়মেরও শিথিলতা রয়েছে। রোগাক্রান্ত ব্যক্তি, বৃদ্ধ এবং গর্ভবতী নারী অর্থাৎ যাদের রোজা রাখার ক্ষমতা নেই তাদের জন্য রোজা পালনে শিথিলতা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এরশাদ করেন, “ফামান কানা মিনকুম মারিদ্বান আওআলা ছাফারিন ফাইদ্দাতুম মিন আইয়্যাম উখারা ওয়া আলাল্লাযীনা ইউতিমুনাহু ফাদ্বিয়াতু ত্বায়ামি মিসকিনিন”।
অর্থঃ তোমাদের মধ্যে যে কেউ অসুস্থ অথবা প্রবাসে থাকবে তার জন্য অন্যান্য দিন উল্লিখিত সংখ্যক রোজা রাখতে হবে। আর যারা রোজা রাখতে অক্ষম হইবে তাদের বদলাস্বরূপ (একদিনের জন্য) একজন মিসকিনকে খাবার দিতে হবে”। আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিনের উপর প্রগাঢ় বিশ্বাস সৃষ্টির অনুপম দৃষ্টান্ত রোজা বা সিয়াম-সাধনার প্রথম বৈশিষ্ট্য। রোজা রাখার মধ্য দিয়ে ব্যক্তির অন্তরে আল্লাহর প্রতি ঐকান্তিক বিশ্বাস জন্মে এবং আল্লাহর প্রেমে মত্ত হয়ে তার অন্তর উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তার অন্তরে বিশ্বাস প্রতিস্থাপন হয় যে, আল্লাহপাক সর্বশক্তিমান। তিনি বিচার দিনের মালিক। যার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে মানুষ ক্ষুধা, পিপাসা, কাম-ক্রোধ, লোভ-লালসা ইত্যাদি যত রকম স্রষ্টা কর্তৃক নিষিদ্ধ কর্ম পরিত্যাগ করে রোজা পালনে ব্রত হয়ে থাকে।
রোজা বা সিয়াম-সাধনার আরেকটি মুখ্য উদ্দেশ্য হলো, আখলাক-চরিত্র সংশোধন। রোজা মানুষের ভেতর ও বাহির দুই দিকেই সংশোধন করে থাকে। মানুষের ভেতরের অবস্থা পরিবর্তন করা অর্থাৎ নূরান্বিত করা এবং তার স্বভাব প্রকাশ্যভাবে সুন্দর ও নান্দনিকরূপে গড়ে তোলার মাধ্যমে এ গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে রোজা বা সিয়াম-সাধনার অতি উত্তম পথ অবলম্বন। এ রোজা বা সিয়াম সাধনার চর্চায় মানুষ লাভ করে এক অমীয় সুধা। এটা এক অফুরন্ত নেয়ামত স্রষ্টা প্রদত্ত মানুষের জন্য। এতে মানুষ দুনিয়ার লোভ-লালসা, অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের ব্যাধি হতে পরিত্রাণ পাওয়ার সুযোগ লাভ করে। আর এটা অন্তরের বিশুদ্ধতার দ্বারাই অর্জন হয়। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এ প্রসঙ্গে বলেন, “মানুষের শরীরের মধ্যে এক টুকরা গোশত রয়েছে, যতক্ষণ তা ভালো থাকবে সমস্ত শরীর ততক্ষণ ভালো থাকবে। আর এটা যার বিগড়ে যাবে তখন গোটা শরীর বিগড়ে যাবে। শুনে রাখ! সাবধান! তা হচ্ছে ক্বলব।”
রোজা বা সিয়াম-সাধনায় ক্বলবকে সুষ্ঠু ও পবিত্র রাখার পূর্ণ ব্যবস্থা বিদ্যমান। আর এই ক্বলব’র (অন্তরের) অবস্থানকে পবিত্র ও নির্মল করার জন্য নামাযের পরই রোজার স্থান।
পবিত্র কুরআন ও হাদীসে রোজা সম্পর্কে অসংখ্য ব্যাখ্যা ও প্রমাণ রয়েছে। এক হাদীসে ‘সবর’ আলো অর্থাৎ রূহানী আলো। এমনি করে অসংখ্য হাদীস রয়েছে এ নিয়ামত রোজা বা সিয়াম-সাধনাকে ঘিরে।

সবচেয়ে বড় কথা এ রোজা রাখার মধ্য দিয়ে মানুষ তার নিজের ‘নফস’কে পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে অভ্যস্ত হয়। আর এ রমযানের শিক্ষাকে বলা হয়, “ধৈর্য়ের এক অনুপম শিক্ষা”। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, “যারা ধৈর্যধারণ করে আল্লাহপাক তাদের পরিপূর্ণ পুণ্যদান করেন”।
রমযানের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এরা অন্তর্ভুক্ত হলো-মানুষ আল্লাহপাকের অসংখ্য নেয়ামতের শোকর গুজারী করবে বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে। “যদি তোমরা শোকর আদায় কর নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য নিয়ামত বাড়িয়ে দেব। আর যদি নিয়ামতের না শোকরী কর তাহলে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি খুবই ভয়ঙ্কর”। কাজেই রোজার মাধ্যমে মানুষ শোকর আদায় করতে শিখে এবং আল্লাহপাকের হুকুমের কদর বুঝতে পারে। এ সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও এরশাদ করেন, “আল্লাহপাকের প্রদত্ত হেদায়েতের উপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এবং কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর। আল্লাহপাকের মহব্বতে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনার্থে তোমরা উন্নত হয়ে যাও”।
হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে যে, ‘তোমার দুনিয়ার চাকচিক্য, আমোদ-প্রমোদ ও ধন-সম্পদের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে নিন্মস্তরের ব্যক্তিকে লক্ষ্য করবে তাহলেই তোমরা আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতসমূহের মূল্য বুঝতে সক্ষম হবে’। রোজা তথা সিয়াম-সাধনার বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে এটাও উল্লেখযোগ্য যে, ‘মানুষের মধ্যে পরস্পর স্নেহ-ভালোবাসা, মায়া, মমতা, আন্তরিকতা এবং সমবেদনার জন্ম দেয়া। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, ‘যে ব্যক্তি রোজাদারকে ইফতার করাবে, তাকে রোজাদার ব্যক্তির সমান সওয়াব দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি রোজদারকে খানা খাওয়াবে, আল্লাহপাক তাকে হাউজে কাওসারের পানি পান করাবেন। অতঃপর তিনি জান্নাতে এমনাবস্থায় প্রবেশ করবেন যে, হাশরের ময়দানে তার পিপাসা লাগবে না। আর যে কেউ রমযানে তার কর্মচারীদের সাথে নম্র ব্যবহার করবে, আল্লাহ পাক তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করবেন’।
ইসলামে নির্ধারিত প্রত্যেকটি ইবাদতই একমাত্র আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি লাভের জন্য হয়ে থাকে। রোজার মাধ্যমেও মানবজাতি আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিনকে পাওয়ার জন্য ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালায়। মানুষ তার সমস্ত কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করে বিভিন্ন কষ্ট সহ্য করে আল্লাহপাককে পাওয়ার প্রত্যাশী হয়ে এবং এখলাসের সাথে আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় রোজা রাখে এবং ধৈর্যের সাথে সমস্ত কষ্ট সহ্য করে তাহলে সে অবশ্যই সৌভাগ্যের অধিকারী হতে পারবে।
হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘হাদীসে কুদসীতে আল্লাহপাক বলেন, মানুষের প্রত্যেকটি কাজই তার নিজের জন্য। কিন্তু রোজা একমাত্র আমার জন্য। অতএব, আমিই রোজার পুরস্কার প্রদান করবো”।
হাদীসে আরও বর্ণিত আছে, ‘রোজা মানুষের জন্য ঢালস্বরূপ, তাই তোমরা রোজা রাখ। রোজা রেখে ভাল কথাবার্তা বল। যদি কেউ গালিগালাজ বা ঝগড়া-বিবাদ করে, তাহলে তাকে বলে দাও, ভাই আমি রোজা রেখেছি। ঐ আল্লাহর কসম করে বলছি, যার মুঠোতে আমার প্রাণ রোজাদার ব্যক্তির মুখের গন্ধ মেশক আম্বরের সুগন্ধি হতেও আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। রোজাদারের জন্য দুটি খুশির সময় একটি ইফতারের সময়, অপরটি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়। অনুরূপভাবে পবিত্র রমযানকে ঘিরে রয়েছে অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি। যা মানবজাতি তথা আমাদের স্রষ্টার নৈকট্য লাভে সর্বোত্তম পন্থার দোর উন্মোচন করে। এক কথায় সিয়াম-সাধনা সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভের অন্যতম এক অনন্য উপায়।
===============================
লেখক : কবি, কলামিস্ট ও গবেষক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।
তারিখ:০৯.০৬.১৫

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...