লাকসামে নিখোঁজের ১৭ মাসেও খোঁজ মেলেনি বিএনপি নেতা হিরু-হুমায়নের

 

মো. আলাউদ্দিন :–
‘১৭ মাস পার হতে চলল, তাও আমার স্বামীর সন্ধান পেলাম না। তিনি বেঁচে আছেন কি না, জানি না। স্বামীর জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে আমার শ্বশুরও চলে গেলেন। আমার সন্তানরা বারবার জানতে চায় ওদের বাবা কোথায়? তাদের বাবা আসছে না কেন? সন্তানদের আমি কোনো জবাব দিতে পারি না। সন্তানদের কান্না দেখে নিজেকেও সামলাতে পারি না। আমি অন্তত এইটুকু জানতে চাই, আমার স্বামী বেঁচে আছেন কি না।’ কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লার লাকসাম পৌর বিএনপির সভাপতি হুমায়ুন কবির পারভেজের স্ত্রী শাহনাজ বেগম।
‘বাবাকে অপহরণের ১৭ মাস পূর্ণ হলো। কিন্তু বাবা বেঁচে আছেন কি না, জানি না। আমরা আর কত দিন এভাবে বাবার জন্য অপেক্ষায় থাকব?’ বলছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য লাকসাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম হিরুর একমাত্র ছেলে রাফসান ইসলাম।
২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর অপহরণের শিকার হন লাকসামের সাবেক এমপি ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম হিরু। একই সঙ্গে অপহৃত হন লাকসাম পৌর বিএনপির সভাপতি মো. হুমায়ুন করিব পারভেজ। সোমবার ১৭ মাস পূর্ণ হলো ওই দুই নেতা অপহরণের।
এদিকে বিএনপির ওই দুই নেতাকে অপহরণের পর গুমের অভিযোগে করা পাঁচ র‌্যাব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব হয়নি এত দিনেও। তারেক সাঈদকে প্রধান আসামি করে র‌্যাব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে করা ওই মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আগামী মাসে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন এর তদন্ত কর্মকর্তা।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৮ মে রবিবার দুপুরে অপহৃত হুমায়ুন কবির পারভেজের বৃদ্ধ বাবা রঙ্গু মিয়া বাদী হয়ে ওই দুই ব্যক্তিকে অপহরণের পর গুমের অভিযোগ এনে আদালতে মামলা করেন। ওই মামলায় র‌্যাব-১১-এর বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া সাবেক অধিনায়ক (সিইও) লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদসহ পাঁচজনকে আসামি করা হয়।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন র‌্যাব-১১-এর তৎকালীন কুমিল্লা ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা কম্পানি-২ এর মেজর শাহেদ হাসান রাজীব, উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) মো. শাহজাহান আলী, উপপরিদর্শক কাজী সুলতান আহমেদ ও উপপরিদর্শক অসিত কুমার রায়। আদালত তখন মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য লাকসাম থানার ওসিকে নির্দেশ দেন।
ওই মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর রাতে জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার হরিশ্চর এলাকা থেকে মো. সাইফুল ইসলাম হিরু, মো. হুমায়ুন কবির পারভেজ ও লাকসাম পৌর বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দিনকে র‌্যাব আটক করে। পরে ওই রাতেই জসিম উদ্দিনকে লাকসাম থানায় হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু হিরু-হুমায়ুনের খোঁজ মেলেনি আজও।
মামলায় র‌্যাব তাঁদের অপহরণ করে গুম করেছে বলে দাবি করা হয়। তবে গত বছরের ৩১ আগস্ট ছেলে হারানোর শোক নিয়েই চিরবিদায় নেন হুমায়ুনের বৃদ্ধ বাবা ও মামলার বাদী রঙ্গু মিয়া। পরে নিহতের ছোট ছেলে গোলাম ফারুকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাঁকে ওই মামলার বাদী হিসেবে স্থলাভিষিক্ত করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, র‌্যাব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে করা ওই মামলার প্রথম তদন্ত প্রতিবেদন গত বছরের ১৫ অক্টোবর আদালতে দাখিল করে পুলিশ। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাদীপক্ষ বিএনপির দুই নেতাকে র‌্যাব অপহরণ করেছে বললেও তার সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতকারীরা তাঁদের অপহরণ করে থাকতে পারে। তখন পুলিশের ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান মামলার বাদী।
বাদীপক্ষে ওই মামলার প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ বদিউল আলম সুজন জানান, বাদীর নারাজি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ ফেব্র“য়ারি আদালত মামলাটি সিআইডি পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেন। আগামী ২০ মে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) কুমিল্লা জোনের এএসপি মো. জামাল উদ্দিন বলেন, ‘মাত্র ১৫-২০ দিন আগে ওই মামলা তদন্তের কপি হাতে পেয়েছি।’

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...