সোসাল বেনিফিট বাড়ানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখাই উন্নয়ন—– মনোহরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোস্তফা মোরশেদ

 

কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোস্তফা মোরশেদ বুধবার (১ এপ্রিল) নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিক মো. হুমায়ুন কবির মানিককে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে উপজেলার বিভিন্ন বিষয়ে যা বললেন তার চুম্বকাংশ পাঠকদের জন্য নিন্মে তুলে ধরা হল-

মো. হুমায়ুন কবির মানিক : উন্নয়ন বলতে কী বুঝায়?

মোস্তফা মোরশেদ : উন্নয়ন একটি বহুমুখী বিষয়। ১৯৪০ এর দশক থেকে এর সংজ্ঞা ও পরিমাপ করার পদ্ধতি ক্রমশঃ পরিবর্তিত হচ্ছে। উন্নয়ন মূলত জনগণের সাথে সম্পৃক্ত। একটি নির্দিষ্ট এলাকার উন্নয়ন হলো যখন সবগুলো Sector যখন একসাথে এগুতে থাকে এবং এর সাথে জনগণের জীবন যাত্রার মান উন্নত হয়।

মো. হুমায়ুন কবির মানিক : মনোহরগঞ্জের প্রধান সমস্যাগুলো কী কী?

মোস্তফা মোরশেদ : মূল সমস্যাগুলো হল-
(ক) খুবই স্বল্প গতির ইন্টারনেট। তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের এ পর্যায়ে দেশ যে গতিতে যাচ্ছে আমরা তার থেকে অনেক পিছিয়ে আছি।
(খ) বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাব, শতকরা ৯৮ ভাগ অগভীর পানিতে আর্সেনিক রয়েছে। এর পাশাপাশি কিছু কিছু এলাকায় পানিতে লবনের পরিমানও বেশি। এমনকি পানিতে ম্যাঙ্গানিজও আছে।
(গ) স্বাস্থ্য সেবার দিকটি অবহেলিত।
(ঘ) শিক্ষার গুনগত মান আমার দৃষ্টিতে কম। এর অনেক কারণ রয়েছে। শিক্ষকদের স্বল্পতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো গত সমস্যা ইত্যাদি। শিক্ষকদের স্বল্পতা বিষয়টি অনেকটা দুষ্ট চক্রের (Vicious Cycle)মতো। আমরা আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক তৈরি করতে পারিনি।
(ঙ) উপজেলা পর্যায়ের অফিসগুলো থেকেও আমরা পুরোপুরি সেবা দিতে পারছিনা। আসলে অনেক অফিসে অফিস প্রধান নেই। আর আসলেও কেউ দীর্ঘ মেয়াদে থাকতে চাননা। এখানকার নাগরিক সুবিধাদি অনেক কম। সেটাই প্রধান কারণ। মূলতঃ আমরা নাগরিক সুবিধাদি তৈরি করতে পারিনি এবং একারনেই আমরা এখানে থাকতে অনাগ্রহী। এটাও একটা দুষ্ট চক্র।
এছাড়া সহকারি কমিশার (ভূমি) না থাকায় আমার উপর অতিরিক্ত চাপটুকু রয়েছে।

মো. হুমায়ুন কবির মানিক : মনোহরগঞ্জের উন্নয়নের জন্য কী Strategy অবলম্বন করা উচিত?

মোস্তফা মোরশেদ : উন্নয়নের বিভিন্ন দিক রয়েছে। সব উপজেলার উন্নয়নের চিত্র এক নয়। উন্নয়নের জন্য দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
(ক) উন্নয়নের কর্মকান্ডের অগ্রাধিকার তালিকা চিহ্নিত করা।
(খ) সার্বিকভাবে এ অঞ্চলের ও এ অঞ্চলের মানুষের সমক্ষতা বাড়ানো। যেমন : এ অঞ্চলের জন্য যে সব কাজ করা জরুরী তার একটা দীর্ঘ তালিকা থাকতে পারে কিন্তু কোন কাজটা আগে করতে হবে তা চিহ্নিত করা জরুরী। এ অঞ্চলের অবকাঠামো, বিশেষ করে রাস্তাঘাট তৈরি করা জরুরী। আমাদের এমপি মহোদয়ের আন্তরিকতায় সে কাজটুকু অত্যন্ত ভালোভাবে হচ্ছে। জলাঞ্চল হবার কারণে উন্নয়নের এ পর্যায়ে আমাদের রাস্তাগুলো বারবার মেরামত করা হলেও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সে জন্য রাস্তার পাশে গার্ড ওয়াল গুলো তৈরি করা বিশেষ প্রয়োজন। এটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া দরকার।
অগ্রাধিকার নির্বাচন করার কারণ রয়েছে। প্রত্যেকটা অঞ্চলের অর্থনীতির সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাছাড়া প্রতিটি অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের একটা Trade-off ও আছে। অনেকেই বলে থাকেন যে, মনোহরগঞ্জ বাজারে যে ব্রীজ রয়েছে তার উপর রিকশা গুলোর কারণে অনেক জ্যাম হয়। কথা সত্য, এদেরকে সরিয়েও দেয়া যায়, কিন্তু এরা যাবে কোথায়? তাছাড়া এলাকার মানুষের সময়ের যেটুকু মূল্য দেয়া দরকার তার চেয়ে এই রিকশাগুলো দাড়িয়ে থাকলে মনে হয় Social Cost এর চেয়ে Social Benefit বেশি হবে। Social Benefit বাড়ানোর এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখাই উন্নয়ন।

দ্বিতীয়ত, সক্ষমতা অর্জনের যে বিষয়টি তা হলো, দেখুন, লাকসামের জন্য যা দরকার তা মনোহরগঞ্জের জন্য না হলেও চলবে। একটি Airport হবার কোন যৌক্তিকতা এখানে নেই, যেটা কুমিল্লার অন্য অনেক উপজেলায় করা যেতে পারে। আমরা আসলে এ পর্যায়ে সে সক্ষমতা অর্জন করতে পারিনি। তবে নিশ্চয়ই একদিন এখানেও Airport হবার অর্থনৈতিক যোগ্যতা আমরা অর্জন করতে পারব।

মো. হুমায়ুন কবির মানিক : সমন্বয়ের জায়গায় কতটুকু কাজ করছে?

মোস্তফা মোরশেদ : সমন্বয়ের জায়গাটি অনেক ভালো এবং গুছানো। আমাদের এমপি মহোদয় জনাব মোঃ তাজুল ইসলাম সত্যিকার অর্থে একজন আদর্শবান মানুষ। তাঁর মনোহরগঞ্জ নিয়ে অনেক স্বপ্ন আছে এবং তিনি তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করছেন। আমি বা আমরা যা করছি তা মূলত এমপি মহোদয়ের নির্দেশে এবং পরার্মশে। কুমিল্লার সম্মানিত জেলা প্রশাসক জনাব মোঃ হাসানুজ্জামান কল্লোল মহোদয় অনেক আন্তুরিক। তিনি সব বিষয়গুলো সার্বক্ষনিকভাবে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে মনিটর করেন।

মো. হুমায়ুন কবির মানিক : উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে আপনার কাজের মূল্যয়ন করবেন কিভাবে?

মোস্তফা মোরশেদ : আমার কাজের কোন মূল্যায়ন আমি করতে পারিনা। এটা এই জনপদের অধিবাসীরা বলতে পারবেন। আমার এই দেড় বছরের অধিক কর্মকালে হাসি মুখে সেবা দেয়ার যে প্রচেষ্ট ছিল সেটাকেই আমি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেই। একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার অনেকেই মনে করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার এর অধিক্ষেত্র উপজেলা পরিষদ কেন্দ্রিক। কিন্তু এটা বুঝা দরকার যে উপজেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার যে কাজ তা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অনেকগুলো কাজের একটি অংশ মাত্র। এর বাইরে জাতীয় সরকার (কেন্দ্রিয় সরকার) এর সাথে তার অনেক কাজ রয়েছে যার ব্যপ্তি অনেক অনেক বেশি।

মো. হুমায়ুন কবির মানিক : কোনও সুনির্দিষ্ট প্রাপ্তি কিংবা ভালোলাগে?

মোস্তফা মোরশেদ : অনেক প্রাপ্তি আছে তবে তা নিয়ে আমি সন্তুষ্ট নই। এলাকার সাহিত্য-সংস্কৃতির একটা চর্চা শুরু হয়েছে। খেলাধুলার সাথে অনেকেই সম্পৃক্ত হচ্ছেন। আসলে এগুলোই উন্নয়ন। এ ধারাবাহিকতা অব্যহত রাখতে হবে। সমাজের উৎকর্ষ সাধন করতে এবং মাদকের বিরুদ্ধে এ বিষয়গুলো নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। দৈনন্দিন কাজের বাইরে কিছু কিছু কাজ করেছি যা ভাবলে ভালো লাগে। জরাজীর্ণ উপজেলা পরিষদটি এখন আগের চেয়ে অনেক আকষর্নীয়। হাসপাতালের বর্হিঃবিভাগ চালু হওয়া অনেক মানুষ স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মাঝে একটা প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অনেক বেশি শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করছে। আইন-শৃঙ্খলার সার্বিক পরিস্থিতি আগের যেকোন সময়ের চেয়ে ভালো।

মো. হুমায়ুন কবির মানিক : কোনও অপ্রাপ্তি?

মোস্তফা মোরশেদ : অপ্রাপ্তি আছে অনেক। শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে আমি প্রথম থেকেই অনেক পরিশ্রম করছি। এমনকি কোন পারিশ্রমিক ছাড়া বিভিন্ন প্রশিক্ষনে প্রশিক্ষন দিয়েছি। এলাকার প্রায় সব কটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেছি। কিন্তু আমার প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তি অনেক কম। যেসব পুকুর কিংবা জলাশয়ের কারনে রাস্তা গুলো ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া কষ্টকর হচ্ছে। তবে প্রচেষ্টা অব্যহত আছে। রাস্তার পাশে সরকারি গাছগুলো রক্ষায় জনগনের একরকম অনিহা রয়েছে। উপজেলা নতুন হওয়ায় মূলত দশ বছর আগে এগুলো ওভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়নি। তারই একটা ধারাবাহিকতা রয়ে গেছে। সকল সরকারি সম্পত্তিতে জনগণের Ownership তৈরি করতে পারলে এ সম্পত্তি রক্ষা করা অনেক সহজ হবে। তাছাড়া যত্রতত্র ড্রেজার মেশিন বসানোর একটা সমস্যাতো আছেই।

মো. হুমায়ুন কবির মানিক : সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা নিয়ে আপনার মন্তব্য?

মোস্তফা মোরশেদ : সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা নিয়ে অনেক কিছু বলার আছে। প্রথমতঃ অনেক পত্রিকায় আমাদের নিগেটভ সংবাদগুলো অনেক গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ পায়। কিন্তু আমরা অনেক ভালো কাজ করছি। এছাড়া লাকসামের সংবাদের সাথে মনোহরগঞ্জকে জুড়ে দেবার একটা প্রবনতা রয়েছে। অনেক জায়াগায় দেখবেন মনোহরগঞ্জের কোনও reference ছাড়াই লাকসাম-মনোহরগঞ্জের সংবাদ একসাথে ছাপা হয়েছে। দেখুন, উন্নয়নের জন্য আমাদেরকে মানবিকভাবেও প্রস্তুতি নিতে হবে। উন্নয়ন হওয়া দরকার এটা feel করতে হবে। আমার মনে হয় আমরা অনেকেই এখনো লাকসাম কেন্দ্রিক এবং মানসিকভাবে লাকসামকেই নিজের উপজেলা মনে করি। আমাদের যা দরকার তার জন্য আমাদের Voice raise করতে হবে। লাকসামের অনেক কিছুর সাথেই আমাদের মিলবেনা এবং অনেক ক্ষেত্রে আমরা তাদের চেয়ে ভালো করছি।
পরিশেষে, বর্তমান এই পরিস্থিতিতে সন্ত্রাস ও নাশকতা কারীদের বিরুদ্ধে আপনাদের সোচ্চার হবার অনুরোধ করছি। আশা করছি আপনাদের লেখনির মাধ্যমে সকল অপশক্তিকে জয় করে একটি সুন্দর, সুশৃংখল ও উন্নত মনোহরগঞ্জ উপজেলা আমরা গড়ে তুলতে পারব।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...