লাকসামে জরাজীর্ণ ভবনে চলে সেটেলমেন্ট অফিসের কার্যক্রম : বিএস খতিয়ান বিলিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ

মোঃ আবুল কালাম, লাকসাম :—

কুমিল্লার দক্ষিণাঞ্চলের ৪টি উপজেলার বিশেষ করে লাকসাম উপজেলার অধিকাংশ ভূমি মালিক ভূমি জরিপের ২ যুগ পরও চূড়ান্ত খতিয়ান না পেয়ে মালিকানা জটিলতায় রয়েছেন। আর সম্প্রতি কিছু কিছু এলাকার চূড়ান্ত খতিয়ান বিলিতে অতিরিক্ত টাকা আদায়সহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে জানায়, লাকসাম সেটেলমেন্ট অফিসে ৬০ টাকার ছাপা খতিয়ান নিতে কমপক্ষে ৩শ’ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা দিতে হয়। আর ৩৫০ টাকার নক্সা নিতে লাগে ৮শ’ থেকে দেড়-দু’হাজার টাকা। তাছাড়া, সময়মতো খতিয়ান-নক্সা না দিয়ে গড়ি মসি করে সময় ক্ষেপনেরও অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, লাকসাম উপজেলা সেটেলমন্ট অফিসের দায়িত্বে থাকা সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার সুবোধ রঞ্জন চৌধুরী এ অফিসে গরহাজির। অন্যান্য স্থানে অতিরিক্ত দায়িত্বের সুবাধে তিনি কুমিল−ায় অবস্থান করেন। প্রতিটি খতিয়ান ও নক্সার বিপরীতে অতিরিক্ত টাকা না দিলে তিনি নথিতে সই করেন না। তাছাড়া, উপরে (!) টাকা দেয়ার কথা বলেও অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী একাধিক জমির মালিক লিখিতভাবে জানান, লাকসাম উপজেলার বিভিন্ন মৌজার চূড়ান্ত খতিয়ান ৬০ টাকার স্থলে সেটেলমেন্ট অফিসে কর্মরত অনুপম কুমার শীল ৩শ’ টাকা আদায় করছেন। আর ৩৫০ টাকার নক্সা ৫শ’ টাকা আদায় করছেন। আর কোনো মতে ৩০ দিন পেরুলেই খতিয়ান ৮শ’ থেকে ১ হাজার আর নক্সা দেড় হাজার থেকে ২ হাজার টাকা দিতে হয়। তারা জানান, বেশ কিছুদিন ধরে খতিয়ান বিলি করার পরও কৌশলে তার ট্যাংকে জমা অনেকগুলোই করে রেখেছেন। তাছাড়া, ৩৩ ও ৩৪ ধারা মতে খতিয়ান সংশোধনের জন্য হাজার হাজার টাকা নিয়েও সংশোধন না করায় জনসাধারণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে তাদের অভিযোগ। এ বিষয়ে তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
লাকসাম সেটেলমেন্ট অফিসে সেবা নিতে আসা মানুষজন জরাজীর্ণ ভবনে কোনোভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বসার কোনো জায়গা নেই। চুড়ান্ত খারিজ খতিয়ানে ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি টাকা নেয়ার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী ভূমি মালিকরা। তাছাড়া, ওই কার্যালয়ে নক্সা ও খতিয়ানের সরকারি মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করে ফেলে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
গত সোমবার সরেজমিন লাকসাম উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসে গিয়ে দেখা যায়, ওই কার্যালয়ের নিত্যদিনের কাজ চলছে জরাজীর্ণ ভবনে। সেমিপাকা টিনসেডের চালায় অনেক ছিদ্র। বৃষ্টি এলেই ভেতরে পানি ঢুকবে। বারান্দার অনেকাংশ জুড়ে চাল নেই। কিছু অংশে টিন ভেঙ্গে পড়ে রয়েছে। এসব মাড়িয়ে ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, দিনদুপুরে কয়েকটি বাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। ভবনের দু’পাশে খোলা জায়গা থাকলেও জানালা আটকে রাখা আছে। পেশকার ইমাম হোসেনের টেবিলের তিনপাশে ১২/১৪ জনের জটলা। এ সময় লাকসাম উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রাশিদা বেগম অন্য টেবিলের পাশের চেয়ারে বসে ভ্যানেটি বেগ থেকে কয়েকটি ১শ’ টাকার নোট বের করে অপর একজনকে দিয়ে পেশকারকে দিচ্ছেন। কিন্তু বার বার ‘এ টাকায় হবে না’ বলে পেশকার টাকা ফিরিয়ে দিচ্ছেন। পরে জানা গেলো ৬০ টাকার খারিজ খতিয়ানের জন্য কয়েকশ’ টাকা দেয়ার পরও অপারগতা প্রকাশ করছেন তিনি। এ সময় বাইরে দাঁড়ানো আবদুল ওহাব নামে এক লোক এগিয়ে এসে তার পিতাকে দেখিয়ে বলেন, আমাদের জমি-জমার খতিয়ান নিতে ৮শ’ টাকা লেগেছে। ওই টাকা না দিলে পেশকার চূড়ান্ত খতিয়ান দিতে অপারগতা জানায়।
নক্সাকারক মোস্তাফিজুর রহমানের টেবিলের পাশে ৪/৫ জন ভীড় করছে। তাদের সাথে টাকা নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় দরকষাকষি হচ্ছে। অন্য পাশের টেবিলে লোকজন না থাকায় খারিজ সহকারী অনেকটা গা এলিয়ে চেয়ারে বসে আছেন।
ওই ভবনের ভেতরে ষ্টোর রুমে নজর পড়তেই গা শিউরে ওঠে। দেয়ালের মাঝামাঝিতে অনেকাংশ জুড়ে ফাটল। যে কোনো সময় ধ্বসে পড়তে পারে। নিচে ট্যাংক, বস্তা, কাপড় ও পলিথিনে মোড়ানো নথিপত্র রাখা হয়েছে। উপরের সিলিংয়ের বেড়ায় পানি পড়ে কালো হয়ে আছে।
অতিরিক্ত টাকা নেয়ার বিষয়ে পেশকার ইমাম হোসেন জানান, যেসব খতিয়ান কুমিল্লা ফিরে গেছে সেগুলো আনতে ৮-৯শ’ টাকা নেয়া হয়। অনেকে অফিসের লোকদের দায়িত্ব দেয়ায় আমরা এ কাজ করে দেই। চূড়ান্ত খতিয়ান ও নক্সায় অতিরিক্ত টাকা নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সাধারণ খতিয়ান ও নক্সা নিতে সরকারি ফি’র বাইরে আমরা অতিরিক্ত টাকা নেই না। তবে সরকারি ফি’র তালিকা ফেলে দেয়ার বিষয়ে তিনি কিছু না বলে চুপ করে থাকেন।
জরাজীর্ণ ভবনের বিষয়ে পেশকার ইমাম হোসেন জানান, পৌরসভার মেয়র আলহাজ মফিজুর রহমান পুরাতন পৌরভবনের কয়েকটি কক্ষ দেয়ার জন্য সম্মত হয়েছেন। তাছাড়া, এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ শফিউল আলমের সাথেও আলাপ হয়েছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে সেটেলমেন্ট অফিসটি পুরনো পৌর ভবনে স্থানান্তর হতে পারে।
সূত্র জানায়, কুমিল্লা দক্ষিণাঞ্চলের ৪টি উপজেলায় ভূমি জরিপের ২ যুগ পরও অধিকাংশ ভূমি মালিকরা বিএস চূড়ান্ত খতিয়ান হাতে না পেয়ে মালিকানা জটিলতায় প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এছাড়া, চূড়ান্ত খতিয়ান না থাকায় কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে একশ্রেণীর ভূমিদস্যুরা। অন্যদিকে, উপজেলা ভূমি অফিস চূড়ান্ত বিএস খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ সরবরাহের জন্য বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ধর্না দিচ্ছেন। লাকসাম পৌরসভার নশরতপুর গ্রামের ডাঃ নির্মল ব্যানার্জির অভিযোগ, তার চূড়ান্ত বিএস খতিয়ান না থাকায় সম্পত্তির নামজারি, মালিকানা সীমানা নির্ধারণ, বহুতল স্থাপনা নির্মাণের জন্য অনুমোদন পেতে পৌরসভা ও ভূমি অফিসসহ বিভিন্ন দফতরে নানা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। জানা গেছে, ১৯৯০ দশকে জেলার দক্ষিণাঞ্চলের লাকসাম, মনোহরগঞ্জ, নাঙ্গলকোট ও কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার ৪৫৯টি মৌজার জরিপ হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত আপিল নিষ্পত্তিও শেষ হয়। আপিল নিষ্পত্তির পর প্রায় অধিকাংশ বিএস চূড়ান্ত ছাপা খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ কুমিল−া জোনাল সেটেলমেন্ট কার্যালয়ে পৌঁছে। এদিকে, মৌজা জরিপের ২ যুগ পরও চূড়ান্ত ছাপা খতিয়ানগুলো সেটেলমেন্ট কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও দায়িত্ব অবহেলায় সংশ্লি−ষ্ট উপজেলা ভূমি অফিসগুলোতে পৌঁছেনি। এগুলো কুমিল−া জোনাল সেটেলমেন্টের রেকর্ড রুমে অযতœ-অবহেলায় পড়ে রয়েছে। তবে বিএস চূড়ান্ত খতিয়ান না থাকার কারণে নিজ প্রয়োজনে ভূমি মালিকদের মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে জোনাল অফিস থেকে হাতে লেখা ডিপি খতিয়ান সংগ্রহ করতে হয়। সরকারি সম্পত্তি রক্ষা এবং জনসাধারণের হয়রানি নিরসনে চূড়ান্ত ছাপা হওয়া বিএস খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপগুলো উপজেলা ভূমি অফিস ও সংশ্লি−ষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসে পাঠানোর আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী ভূমি মালিকরা। এদিকে, পশ্চিমগাঁও গ্রামের খোরশেদ আলম অভিযোগ করে বলেন, বিএস চূড়ান্ত খতিয়ান প্রিন্ট হওয়ার পর যথাযথ প্রক্রিয়ায় ওই খতিয়ানগুলো উপজেলা ভূমি অফিসে না পৌঁছানোর কারণে ভূমি মালিকরা নামজারি করতে গিয়ে এসএ খতিয়ান থেকে মালিকানা মেলাতে পদে পদে নানা হয়রানির শিকার হন। এ সুযোগে ভূমি বিভাগের অসাধু কর্মকর্তারা এসএ খতিয়ান থেকে মালিকানা মেলানোর অজুুহাতে বা রেকর্ড না থাকার অজুুহাতে নামজারি জমা-খারিজ করতে মোটা অংকের উৎকোচ আদায় করে নেন। এছাড়াও ভূমি মালিকদের ভূমি ক্রয়-বিক্রয়ের স্বার্থে অসাধু কর্মকর্তাদের দাবি মিটিয়েই প্রতিনিয়ত নামজারি জমা-খারিজ সম্পন্ন করতে হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লাকসাম ভূমি অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, সকল বিএস খতিয়ান চূড়ান্ত না হওয়ার কারণে একশ্রেণীর প্রভাবশালী ভূমিদস্যু কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তিকে নিজেদের দাবি করে হাতিয়ে নিচ্ছে। অপরদিকে, প্রিন্ট হওয়া বিএস চূড়ান্ত খতিয়ানগুলো ভূমি মালিকদের কাছে না পৌঁছানোর কারণে জমা-খারিজ করতে সিএস ও এসএ খতিয়ান থেকে মালিকানা হিস্যা মেলাতে পারিবারিক কলহ-বিবাদে জড়িয়ে পড়ছেন। আবার এসব বিবাদ নিয়ে উপজেলা ভূমি অফিসে গিয়ে নামজারি জমা-খারিজ করতে আরো বেশি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। অনেক সময় দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যেনতেনভাবে জমা-খারিজ করিয়ে দিয়ে মানুষকে বেশি ভোগান্তিতে ফেলছেন।
ওইদিন সরেজমিন গিয়ে সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার সুবোধ রঞ্জন চৌধুরীর দেখা মেলেনি।
এ ব্যাপারে কুমিল্লা জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের রেকর্ড কিপার আবুল বাশার জানান, প্রয়োজনীয় লোকবল সংকট এবং সরকারি প্রজ্ঞাপন না হওয়ায় ছাপা হওয়া চূড়ান্ত বিএস খতিয়ানগুলো সংশ্লি−ষ্ট মৌজার ভূমি অফিসগুলোতে পাঠানো বিলম্ব হয়। তবে স্বল্প সময়ে খতিয়ানগুলো পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...