আমাদের জীবনের মূল্য কত?

ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান

আমাদের জীবনের মূল্য কত, আসলেই কোনো মূল্য আছে কী? এই বুর্জুয়া সমাজে এ প্রশ্নের জবাব বেশ জটিল। কেননা, দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তি যদি হয় সমাজের প্রভাবশালী তবে তার জীবনের দাম নির্ধারণ হয় এক ধরনের, আবার খেটে খাওয়া শ্রমিক কিংবা সাধারণ নাগরিক হলে তার জীবনের দাম নির্ধারণ হয় অন্যভাবে। দেশে প্রতিদিন যেহারে মানুষ মরছে তাতে তো মনে হয় না- আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো মূল্যই আছে । লঞ্চ ডুবে, ভয়াবহ আগুনে, সড়কপথে দুর্ঘটনায়, ফ্লাইওভার ভেঙে, আন্দোলন-হরতালে পেট্রোল বোমায়, র‌্যাব, বিজিবি-পুলিশের গুলিতে, ভবন ধসে মরছে মানুষ।পত্রিকার পাতায় আর টেলিভিশনের পর্দায় শুধু সারি সারি লাশ আর লাশ। স্বজন হারানো মানুষের আহাজারি।

এসব লাশের মূল্য কত? ২০ হাজার কিংবা লাখ টাকা! সম্প্রতি পদ্মার পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে লঞ্চডুবির ঘটনায় ৭৮জন নিহত হয়েছে । প্রাথমিকভাবে মরদেহ দাফনের জন্য নগদ ২০ হাজার টাকা সহায়তা দেয়া হয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দেয়ার পর ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১ লাখ ৫ হাজার করে টাকা দেওয়া হবে বলে নৌমন্ত্রী শাহজাহান খান ঘোষণা দিয়েছেন ।

এর আগে গেল বছর পিনাক-৬ দুর্ঘটনায় নিহতের স্বজনদের অনুরূপ ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছিল। তেমনি তাজরিন ফ্যাশান ও রাজাপ্লাজা ট্রাজেডির ঘটনাও সরকারের ইচ্ছা মাফিক ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল। তবে তাদের অনেকে আজও সেই ক্ষতিপূরণের টাকাও পায়নি। এভাবে কোনো দুর্ঘটনা ঘটার সাথে সাথে মন্ত্রী-এমপিরা মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করতে ইচ্ছা মাফিক ক্ষতি পূরণ ঘোষণা করেন।এছাড়া জাহাজ-লঞ্চডুবিতে নিহতদের আইনগতভাবে কোনো ক্ষতিপূরণের সুযোগ নেই।

যতদূর জানা যায় তাতে, সড়কপথে যাত্রীবাহী বাসের বাধ্যতামূলক বীমার বিধান রয়েছে। ‘থার্ড পার্টি ইন্স্যুরেন্স’ ছাড়া কোনো গাড়ি রাস্তায় চলতে পারে না। যদিও ক্ষতিপূরণের অঙ্ক কম, তবুও আইনটি থাকায় বাস দুর্ঘটনা হলে নিহতের স্বজনরা ক্ষতিপূরণ পান। এখন এর পরিমাণ সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা। এ হিসেবে বলা মানুষের জীবনের সবোর্চ্চ দাম আইনগতভাবে মাত্র ৩০ হাজার টাকা। সেটা আবার সবক্ষেত্রের জন্য নয়।

প্রচলিত আইনে এখন পর্যন্ত লঞ্চে চলাচল করা যাত্রীদের বীমার আওতায় আনা হয়নি। ফলে বাড়ছে লঞ্চ দুর্ঘটনা, দীর্ঘায়িত হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। বীমা না থাকায় লঞ্চ চলছে ইচ্ছামতো। যাত্রী তুলছে অতিরিক্ত। বীমা বিশেষজ্ঞদের দাবি, যাত্রীবাহী সব লঞ্চ ইন্স্যুরেন্সের আওতায় আনতে পারলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যেত।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্র মতে, দেশে বর্তমানে ৫৮০টি লঞ্চ চলাচল করছে। এর মধ্যে দোতলা এবং তিনতলা লঞ্চ রয়েছে ১৯০টি। বাকিগুলো একতলা এবং দেড়তলা লঞ্চ। এসব লঞ্চের যাত্রী পরিবহনের গড় ধারণক্ষমতা সর্বনিম্ন ১২ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ জন। সাধারণত নৌপথে প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই লাখ যাত্রী চলাচল করে। তবে দুই ঈদের আগে-পরে এ সংখ্যা পাঁচ লাখে গিয়ে ঠেকে। এসব লঞ্চে চলাচলকারী যাত্রীদের জন্য বীমা করার বাধ্যতামূলক কোনো আইন নেই। ফলে কোনো লঞ্চের মালিক যাত্রীদের জন্য বীমা করে না।

১৯৩৮ সালের পুরনো আইনেও লঞ্চযাত্রীদের বীমার বিধান ছিল না। সত্তর বছর পর যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশে বীমা আইন করা হয়, যা ২০১০ সাল থেকে কার্যকর করা হয়। সেখানেও যাত্রীবাহী লঞ্চের বীমার ঝুঁকি গ্রহণের বিধান নেই। এর ফলে নিহতের স্বজনদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে দুর্ঘটনা ঘটার পর সরকার জনরোষ থেকে রক্ষা পেতে কিংবা অনুকম্পা প্রকাশ করে যথেচ্ছাভাবে নিহতদের স্বজনদের ক্ষতিপূরন দিয়ে থাকে।

জানা যায়, এরশাদ সরকারের আমলে লঞ্চে যাত্রীদের জন্য বীমা করার একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু লঞ্চ মালিকদের বাধার কারণে তা হয়নি। ২০০৪ সালেও তৎকালীন সরকার নদীপথে লঞ্চ চলাচলে যাত্রীবীমা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েও পরে পিছিয়ে যায়। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময় এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

অতি সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নৌপথের যাত্রীদের জন্য একটি বীমানীতি করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এটিও চলছে ঢিমেতালে। কখন আলোর মুখ দেখবে তা কেউ জানে না।

এদিকে বীমার বিধান না থাকলেও বর্তমানে একটি ট্রাস্টি ফান্ড আছে। লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহতের স্বজনদের ওই ফান্ড থেকে এককালীন সর্বোচ্চ ১ লাখ ও আহত হলে ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হয়। এর বাইরে আর কোনো আর্থিক সুবিধা পান না তারা। ২০০৬ সাল থেকে ওই তহবিল চালু করা হয়েছে। কিন্তু ১৯৭৬ সাল থেকে সর্বশেষ পিনাক-৬ লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার যাত্রী মারা গেছেন, আহত ছয় শতাধিক। অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে চলাচল করার কারণে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা হয়েছে।(সূত্র: সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর)

ফলে লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহতদের জীবনের দাম বিশ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা। আসলে কত জনের দাম দিবে, মানুষ মরছে তো শত শত। ওদেরকে সংখ্যায় গোণা হয়। কারণ ওরা গরীব মানুষ।পঙ্গ পালের মত জন্ম হয় আবার মরেও সেই ভাবে। কে এদের খোঁজ খবর রাখবে। কার বা তাতে এত মাথা ব্যাথা।

কিন্তু আমার আপনার কাছে হয়তবা ওদের কোন মূল্য নেই। কিন্তু কারো কাছেই কি ওদের কোন মূল্য নেই? না তা ঠিক না। কারো কারো কাছে ওরাই সব। কেননা, ওইসব লোকজনের উপরই নির্ভরশীল অনেক পরিবার। কেনই বা হবে না। আমার কাছে আমার মা বাবা ভাই বোন স্ত্রী সন্তান সন্ততি যেমন। সবার কাছেই তো তেমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। সবাই তো রক্তমাংসে গড়া মানুষ।শারীরিক প্রক্রিয়াও সবারই একই রকম।স্বজন হারালে সবারই শোক অনুভব হবার কথা।

তবে আজকে প্রশ্ন হলো পাটুরিয়া ঘাটের অদূরে লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটে গেল, তারপরেই আমাদের মাননীয় মন্ত্রীকে ঘোষণা করতে শোনা গেল মৃতদের সবার জন্য এক লাখ ৫ হাজার টাকা (এত টাকা!) ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে, শোঁকসন্তপ্ত পরিবারের সবার জন্য সমবেদনা ঘোষণা করা হল। আর কিই বা আশা করা যেতে পারে।

এইযে ক’দিন আগে এত বড় দুর্ঘঘটনা ঘটে গেল, তার জন্য কি কোনো লঞ্চ চলাচল কাজ বন্ধ হবে। না কোনো মালিক এ জন্য শাস্তি পাবে? না কক্ষনো না। কিছুদিন হয়তবা মিডিয়াতে লেখালেখি হবে। টেলিভিশনের পর্দায় ফলাও করে খবর প্রচার হবে। আর কিছুদিন পরে আবার আমরা সবাই ভুলে যাবো। তবে কি আমরা আরেকটা ঘটনার জন্য প্রস্তুত থাকব? আরেকবার দুঃখ প্রকাশ করব? মন্ত্রীরা আবার মৃতের জন্য ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করবেন? আবারো নদীতে লাশ ভেসে উঠবে, বাতেশে লাশের গন্ধ বের হবে অন্য কোথাও। না তা হতে পারেনা। একবিংশ শতাব্দীর এই সভ্য সমাজে তা আর চলতে দেয়া যায় না। এভাবে আর মানুষ মরতে পারেনা।

আমরা এই ঘটনার উচ্চ পর্যায়ের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছি। সরকারের পক্ষ থেকে এমন ব্যবস্থা নেয়া হোক যাতে সামনে আর কোন দিন এমন ঘটনা না ঘটে। কিংবা যাতে এই ধরনের ঘটনা সর্বনিম্ন পর্যায়ে কমিয়ে আনা যায়।
আমি এই ঘটনায় নিহতদের সবার আত্মার জন্য মাগফেরাত কামনা করছি। আর শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্য সমবেদনা জানানোর ভাষা আমার জানা নাই। সেই সাথে প্রচলিত আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং লঞ্চ কিংবা জাহাজে চলাচলকারী যাত্রীদের জন্য বীমার বিধান বাধ্যতামূলক করা হোক।তবে আশা করা যায়- এমন অহরহ দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। সেই সাথে নৌপথে মানুষের জীবনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।

লেখক: শিক্ষা ও সমাজ বিষয়ক গবেষক, ই-মেইল- sarderanis@gmail.com

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...