নাঙ্গলকোটে মুক্তিযোদ্ধার নাম ভাঙ্গিয়ে সুবিধা নিচ্ছেন ব্যাংকার ইলিয়াস মজুমদার

মো. আলা উদ্দিন :–

একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধারা এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। সারাদেশেই এখন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে চলছে নানা রকমের গুঞ্জন। খোদ মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীও এ বিষয় নিয়ে বেশ সোচ্চার। সাম্প্রতিক কালে কয়েকজন সচিবসহ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করায় বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসলে সারাদেশের মানুষ তথা জেলা ভিত্তিক মুক্তিযোদ্ধা সংসদ হাই কমান্ড একটু নড়ে চড়ে বসেছেন।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তেমন কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি বলেও অনেকে অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ আছে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও স্থানীয়ভাবে সনদ সংগ্রহ করে অনেক অমুক্তিযোদ্ধাই সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। এ ঘটনার বাস্তব প্রমাণ মিলেছে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলায়। উপজেলার নারায়নকোট গ্রামের মৃত- হাফেজ ছেরু মিয়া মজুমদারের ছেলে, জোড্ডা বাজার বালিকা মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ব্যাংকার ইলিয়াস মজুমদারের বিরুদ্ধে অমুক্তিযোদ্ধা হয়েও টাকার বিনিময়ে সনদ সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। অমুক্তিযোদ্ধা হয়েও তিনি টাকার বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিশেষ গেজেটে (নং- ৬৬২২) নাম অর্ন্তভূক্ত করেছেন। ১০/০৯/২০০৬ইং তারিখে তিনি মুক্তিযোদ্ধা সনদ (সনদ নং ম-১২১৪৪২) গ্রহন করেন। এ প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে।
এসএসসি পরীক্ষার প্রশংসাপত্র, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান প্রদত্ত চারিত্রিক সনদ এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রণীত চুড়ান্ত ভোটার তালিকায় উল্লেখিত ০৩/০১/১৯৬১ইং জন্ম তারিখ অনুযায়ী মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ অভিযুক্ত ইলিয়াস মজুমদারের বয়স ছিল ১০বছর ২মাস ২৩দিন। কিন্তু তিনি প্রকৃত বয়স গোপন করে টাকার বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংগ্রহ করে তিনি এখন মুক্তিযোদ্ধা সেঁজেছেন। ভাতার জন্য করা আবেদনপত্রে তিনি তার জন্ম তারিখ উল্লেখ করেছেন ০১/০১/১৯৫৬ইং। তবে, তিনি এই জন্ম তারিখের স্বপক্ষে কোনো প্রমান পেশ করেননি। ভাতার জন্য করা আবেদনপত্রের সাথে সংযুক্ত বিভিন্ন কাগজেও ভিন্ন ভিন্ন জন্ম তারিখ উল্লেখ করা হয়। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য করা আবেদনপত্রে জন্ম তারিখ উল্লেখ করেছেন ০৩/০১/১৯৫৬ইং। এত অভিযোগ থাকার পরেও অভিযুক্ত ইলিয়াস মজুমদার মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মানীভাতা (ভাতা বই নং- ১৮৪১২) উত্তোলনসহ সকল সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। এছাড়া তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ব্যাংকে চাকরিও নিয়েছেন। তিনি বর্তমানে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত আছেন বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মুক্তিযোদ্ধা জানান, ১০ বছর বয়সে কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায়? সেটা আমার বোধগম্য নয়। যদি তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি কোথায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন? প্রশিক্ষকের নাম কি? তার সহযোদ্ধা হিসেবে কে কে ছিল? সেসব তথ্য প্রকাশ করছেন না কেন? এছাড়া যদি তিনি অমুক্তিযোদ্ধা হয়ে থাকেন, তবে এ অপকর্মের সাথে জড়িত সকলের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে অভিযুক্ত ইলিয়াস মজুমদার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, আমি এ ব্যাপারে আপনার সাথে কথা বলতে রাজি নই। আপনি উর্দ্ধত্মন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করুন। একথা বলে তিনি লাইন কেটে ফোন বন্ধ করে দেন। এরপর একাধিক বার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তারিক সালমান জানান, আমি এখানে আসার আগে থেকেই তিনি (ইলিয়াস মজুমদার) ভাতা উত্তোলন করেন। ভাতার জন্য করা আবেদনপত্রের সাথে মুক্তিযোদ্ধা সনদ ছাড়া তিনি অন্যকোন কাগজপত্র জমা দেননি। আমি এ বিষয়ে তাকে এবং উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইসহাক মিয়াকেও অবহিত করি এবং পুনরায় কাগজপত্র জমা দিতে বলি। কিন্তু ২/৩ মাস অতিবাহিত হলেও এখনো পর্যন্ত আমার কাছে কোন কাগজপত্র জমা দেয়নি।
নাঙ্গলকোট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইসহাক মিয়া এ বিষয়ে বলেন, কোনো প্রকার আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করে তাঁকে (ইলিয়াস মজুমদার) মুক্তিযোদ্ধা বানানো হয়নি। তার নিজের কাগজপত্র বিভিন্ন স্থানে জমা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংগ্রহ করেছেন আর সেই সুবাধে ভাতাও পাচ্ছেন। কোথায় কিভাবে এসব কাগজপত্র সংগ্রহ করেছেন, তা আমার জানার বিষয় না। এ জন্য যাচাই বাছাই কমিটি ভালো বলতে পারবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির বর্তমান সদস্য সচিব মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ জানান, পূর্বের যাচাই-বাছাই কমিটিতে আমি ছিলাম না। এছাড়া বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কিংবা অন্য কেউ কোন অভিযোগ করেনি। তাই এ ব্যাপারে আমি কিছু জানিনা। কিছুদিনের মধ্যেই পুনরায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই করা হবে। তখন বিষয়টি অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
অপর দিকে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সফিউল আহমেদ বাবুল জানান, ইলিয়াস মজুমদার কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন, তা আমার জানা নেই। তবে তার বিরুদ্ধে কেউ লিখিত অভিযোগ করলে তা খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রমাণ সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply