কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কটি যেন মরন ফাঁদ : দিনভর যানজট : পথে পথে ৩টি ট্রাক উল্টে ও ১১টি এক্সেল ভেঙ্গে বিকল

মোঃ আক্তার হোসেন :–

জনদূর্ভোগখ্যাত ‘কুমিল্লা- সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে’ প্রতিদিনের ন্যায় মঙ্গলবারও ছিল যানজটে আকাল। কুমিল্লা- সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের দেবিদ্বার ও বুড়িচং উপজেলার অংশের ১০ কিলোমিটার পথে পথে সড়কের খাদে থেকনা খেয়ে ৩টি মালবাহী ট্রাক উল্টে এবং ১১টি মালবাহি ট্রাকের চাকা পানচার ও কক্সেল ভেঙ্গে জানজটের কবলে কয়েকশত জানবাহন।
মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে ঘটনাস্থল যেয়ে দেখা যায়, কুমিল্লা- সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের দেবিদ্বার অংশের বারেরা এলাকায় এক্সেল ভেঙ্গে একটি মালবাহী ট্রাক সোমবার দিনভর পড়ে থাকলেও মঙ্গলবার ভোর রাতে ট্রাকটি সড়িয়ে নেয়া হয়। ওই একই জায়গার সামান্য দূরে একটি পিকাপভ্যান যান্ত্রিক ত্রুটিতে মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকেই পড়ে আছে। জাফরগঞ্জ(হাতিমারা) থেকে বুড়িচং উপজেলার কংশনগর বাজার সংলগ্ন দেবিদ্বার উপজেলার ছয়গুড়া এলাকা পর্যন্ত প্রায় ৩কিলো এলাকা জুড়ে ছিল জানজট। ১০/১২টি ট্রাক- বাসের ব্যবধানে ১টি করে ট্রাক চাকা পানচার ও কক্সেল ভেঙ্গে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
স্থানীয় ও ট্রাক চালকরা জানান, সকাল ৮টায় হাতিমারা এলাকায় একটি বাসকে সাইড দিতে যেয়ে সিলেট থেকে আসা পাথর বোঝাই একটি ট্রাক সড়কের পূর্ব পার্শ্বে কাত হয়ে পড়ে যায়। সকাল ১০টায় একই জায়গায় সড়কের পশ্চিম পার্শ্বে চট্রগ্রাম থেকে আশুগঞ্জগামী সুটকী বোঝাই অপর একটি ট্রাক কাত হয়ে পড়ে যায়। দুপুর ১টায় চট্রগ্রাম থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামী কাঠ বোঝাই একটি ট্রাক সামান্য ব্যবধানে কাত হয়ে পড়ে যায়। পাশাপাশি সড়কের মাঝখানে একটি মাল বোঝাই ট্রাক পানচার হয়ে জানজটের সৃষ্টি হয়। একই নিয়মে পথে পথে ছয়গুড়া পর্যন্ত আরো ১০টি মালবাহী ট্রাক চাকা পানচার ও কক্সেল ভেঙ্গে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
ছয়গুড়া এলাকায় সড়ক ও জণপদ বিভাগের দু’কর্মচারীকে দেখা গেলেও সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে ওরা পালিয়ে যায়। সড়কের বেহাল অবস্থায় ভোক্তভূগী চালক ও যাত্রীদের জণরোষানলে পড়তে হয় সাংবাদিকদের। সরকার, মন্ত্রী, এমপিদের ব্যর্থতার দায়ঝাল মেটায় সাংবাদিকদের গালমন্দ ও তেড়ে আসার মধ্য দিয়ে। এক পর্যায়ে সাংবাদিরাও পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়।
জনদূর্ভোগখ্যাত ‘কুমিল্লা- সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক’টি সংস্কারে মঙ্গলবার পর্যন্ত সড়ক ও জণপদ বিভাগ কিংবা ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে দরপত্র আহবানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানেরও কোন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। জণগুরুত্বপূর্ণ সড়কটি দিন দিন আরো খারাপের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। এ সড়কের কোন অভিভাবক না থাকায় জণগুরুত্বপূর্ণ সড়কটি গত দু’বছর ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে আছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সড়ক ও জণপদ বিভাগের দূর্নীতিবাজ কর্মচারীরা গত দু’বছর ধরে সংস্কারের নামে লক্ষ লক্ষ টাকা এনে ভূয়া ভাউচারে আত্মসাৎ করেছে। সংস্কারের নামে টাকা বরাদ্ধ আনার দু’বছর পূর্বে ওই সড়কের জন্য নতুন করে বরাদ্ধ না আসার নিয়ম থাকায় বর্তমান বেহাল অবস্থায় সওজের কর্মচারীরা বিপাকে আছেন। সম্প্রতি যোগাযোগ মন্ত্রী দু’দফায় আসার কারনে ক্ষতিগ্রস্থ স্থানগুলো সংস্কারে দরপত্র আহবানে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে বরাদ্ধ হলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার অবরোধের অজুহাতে সংস্কার কাজ শুরু করছেননা বলে জানা যায়।
কবে নাগাদ এ দূর্ভোগ নিরসনে উদ্যোগ নেয়া হবে তারও কোন সঠিক দিক নির্দেশনা সংশ্লিষ্টরা দিতে পাছেননা।
2
মরণফাঁদখ্যাত ওই সড়কের পথে পথে মালবাহী ট্রাক উল্টে এবং এক্সেল ভেঙ্গে বিকল হওয়ার কারনে কয়েকশত যাত্রী ও মাল পরিবনকারী ট্রাক, বাস, ট্রলি আটকে পড়ায় দেবীদ্বার ও বুড়িচং উপজেলার ১০ কিলো মিটার এলাকা জানজটে পরিনত হয়। ফলে রোগী, নারী, শিশু, অফিস ও জরুরী কজে গমনকারীরা সীমাহীন দূর্ভোগে পড়েন। জরুরী গমনকারীরা ধূলাবালিতে অন্ধকারাচ্ছন্ন পথ পায়ে হেটে মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিতে এবং অনেককে ঘন্টার পর ঘন্টা গাড়িতে বসে অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়। অপর দিকে বিকল ট্রাকের মালামাল অন্য ট্রাকে লোড করতে ব্যস্ত ছিলেন অনেকে। মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টায় কুমিল্লা থেকে একটি রেকার আসলেও জানজটের কারনে এগুতে পারছিলনা।
বেলা পৌনে ২টায় মীরপুর হাইওয়ে পুলিশ ফারির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক(এসআই) আবু জাহেরের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ সুপারকে এগিয়ে দিতে এসে জানজটের কবলে পড়েন। বুধবার চট্রগ্রাম উপ-মহা পুলিশ পরিদর্শকের কার্যালয়ে একটি জরুরী বৈঠকে যোগদানের উদ্দেশ্যে পুলিশ সুপার রওয়ানা দেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। মীরপুর হাইওয়ে পুলিশ ফারির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক(এসআই) আবু জাহের বলেন, এসপি মহোদয়কে সামান্য জানজটের এলাকা পাড় করে দিতে সাড়ে ৩ঘন্টা সময় লেগেছে। পরে ফেরার পথে হাইওয়ে পুলিশের দলটি ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মীরপুর রোডে আসতে হয়েছে। ওই কর্মকর্তা আরো জানান, ১০/১২টি গাড়ি সড়কে বিকল হয়ে আছে। এদূর্ভোগ নিত্যদিনের। জনদূর্ভোগখ্যাত ‘কুমিল্লা- সিলেট (আঞ্চলিক) মহাসড়কটির বুড়িচং উপজেলার কংশনগর বাজার থেকে দেবিদ্বার উপজেলা সদর পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়ক ছোট বড় গর্ত সৃষ্টিসহ বিভিন্ন স্থানে পিচঢালা পথ বালিতে পরিনত হয়েছে। ফলে পরিবহনের যাত্রীরা আতঙ্ক নিয়ে সড়ক পারাপার হতে হচ্ছে। দূর্ভোগের স্থানগুলোতে গাড়ি পারাপারে মনে হয় এই বুঝি গাড়ি কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছে। এসব স্থানগুলো পারাপারে সবার মুখেই আল্লাহ ও ভগমানের নাম সজোরে উচ্চারন করতে শোনা যায়। পাশাপাশি সরকার, মন্ত্রী, এমপি এবং সাংবাদিকদেরও অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করতে শোনা যায়। ডিউটিরত পুলিশও গাল মন্দ থেকে রেহাই পাচ্ছেনা।
পরিবহন চালক ও যাত্রীরা ক্ষোভের সাথে জানান, সড়ক ও জণপদ বিভাগের গাফলতির কারনে কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের দেবিদ্বার উপজেলার নিউমার্কেট থেকে বুড়িচং উপজেলার কংশনগর বাজার পর্যন্ত প্রায় ১০কিলোমিটার সড়কের দেবিদ্বার নিউমার্কেট, বানিয়াপাড়া, বারেরা, বেগমাবাদ, কালিকাপুর, জাফরগঞ্জ, হাতিমারা, আজিজনগর, ছগুরা, কংশনগরসহ সড়কের বিভিন্ন স্থানে গতবর্ষায় তৈরী হওয়া ছোট বড় গর্তগুলো সংস্কার না করায় ওই স্থানগুলো বালিতে পরিনত হয়েছে। গর্ত ও বালুতে ট্রলি, ছোট-বড় ট্রাক, বাস, সিএনজি চালিত ও ব্যাটারী চালিত অটোরিকসাসহ অন্যান্য যানবাহন দুর্ঘটনার কবলে পরে জান-মালের ব্যাপক ক্ষতি সাধন ও ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে যাত্রীদের পোহাতে হচ্ছে চরম দূর্ভোগ। ফলে নারী-শিশু, রোগী, বৃদ্ধদের যাতায়াতে এক সীমাহীন দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তারপরও জীবনের প্রয়োজনে ‘কুমিল্লা সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়’কে ওই সব ঝুঁকিপূর্ণ গর্ত ও খানাখন্দের মধ্য দিয়েই প্রতিদিন ঢাকা-চট্রগ্রামসহ দেশের প্রত্যান্ত অঞ্চলে যাতায়তকারী শত শত যানবাহনে যাত্রী ও ট্রাকে মালামাল পরিবহন করা হচ্ছে। প্রতিদিনই মাল পরিবহন ও যাত্রীবাহী বাসের এক্সেল ভেঙ্গে বা বিভিন্ন যান্ত্রীক ত্রুটিতে যাজট সৃষ্টি এমনকি জান-মালের ক্ষতি সাধন হচ্ছে। যানজটের দূর্ভোগ পোহাচ্ছে সাধারন মানুষ। মহাসড়কে এ অবস্থার জন্য পরিবহন শ্রমিক এবং যাত্রীরা স্থানীয় সংসদ সদস্য, সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রী এবং সড়ক বিভাগের উদাসীনতাকে দায়ী করেছেন। জনদূর্ভোগখ্যাত ‘কুমিল্লা- সিলেট (আঞ্চলিক) মহাসড়কটি গত দু’বছর ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়লেও সংস্কারে নেই কোন উদ্যোগ। ইতিমধ্যে দু’বার সড়ক মন্ত্রী সরজমিনে দেখে সড়ক সংস্কারের আশ্বাস দিয়ে গেলেও সড়ক ও জণপদের পক্ষ থেকে কোন ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি কুমিল্লা জেলা সাধারন সম্পাদক কমরেড পরেশকর জানান, সড়ক সংস্কারের দাবীতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি দেবিদ্বার শাখার উদ্যোগে পোষ্টারিং, মাইকিং লিফলেটিং করে, বিক্ষোভ- সমাবেশ, মিছিল, স্মারক লিপি প্রদান করেছে, পাশাপাশি বাংলাদেশ রিক্সা শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি, বাংলাদেশ কৃষক সমিতি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন পৃথক পৃথক মিছিল, সমাবেশ, বিক্ষোভ ও মানব বন্ধন করলেও জণদূর্ভোগের এ বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়নি। এ সড়কে যাতায়ত কষ্ট থেকে রেহাই পেতে সম্প্রতি প্রধান বিচার পতি, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বিশেষ প্রয়োজনে বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া হয়ে যাতায়ত করেন। সাধারন মানুষের যাতায়তে এসড়কের বিকল্প নেই।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply