কুমিল্লার কৃতি সন্তান ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মন্ত্রী কবি আনিল সরকার আর নেই

আব্দুল সাত্তার, আগরতলা :–

চলে গেলেন বাংলাদেশের বংশোদ্ভোত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের যোজনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান তথা ত্রিশ বছরের মন্ত্রী কবি অনিল সরকার । সোমবার ভারতীয় সময় সন্ধ্যা সাতটা চল্লিশ মিনিটে দিল্লীর এইমস হাসপাতালে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যু কালে তাঁর বয়স হয়েছিল ছিয়াত্তর বছর । ১৯৩৯ খৃষ্টাব্দে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৫৬ সাল থেকে তিনি কমিউনিষ্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন । তার মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত ত্রিপুরা রাজ্যের অগণিত মানুষ। প্রয়াত কবি মন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মঙ্গলবার রাজ্যের সমস্ত স্কুল কলেজ অফিসে একদিনের ছুটি ঘোষণা করেছে ত্রিপুরা সরকার। ধর্ম, জাত পাতের বাঁধ ভেঙ্গে শুধু মানবতার জন্যই তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন । ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশের মধ্যে নতুন করে সেতু বন্ধনে প্রয়াত মন্ত্রী অনিল সরকারের বিশেষ অবদান রয়েছে।

অনিল সরকার ত্রিপুরা রাজ্যের এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা কিংবা মন্ত্রী হিসাবে নয়, তার আদর্শ ভাবধারা ছিল শুধু মানুষকে মানুষ হিসাবে মূল্যায়ন করার । জাত পাতের বিষয়টি তার মনে গভীর ভাবে আঘাত করতো। ধর্মের বেড়াজাল ভেঙ্গে সমস্ত মানুষকে তিনি একই স্রোতে চলার আহ্বান জানিয়ে ছিলেন। হিন্দু মুসলমান ছেলে মেয়েদের বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়ে তিনি কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। জাতপাতের উপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে কৈলাশহরে হিন্দুদের গোমাংস খাওয়ার কথা বলে দলের মধ্যেই তিনি সমালোচিত হন । বাংলাদেশে গিয়েও তার ভাবধারা প্রচার করতে গিয়ে ক্ষোভের মধ্যে পড়েছিলেন এই কবি মন্ত্রী । তার এই ভাবধারা সমাজে গৃহীত না হলেও ত্রিপুরা রাজ্যের মানুষের কাছে ব্যক্তিগতভাবে তার গ্রহণ যোগ্যতা ছিল। ১৯৭২ সনে প্রথম বারের মতো তিনি ভারতের কমিউনিষ্ট দলের পক্ষ থেকে ত্রিপুরা বিধান সভা নির্বাচনে তেলিয়ামুড়া কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দিতা করে ১৬১১ ভোটে জয়ী হন। সে বার অবশ্য তার দল ক্ষমতায় আসেনি । ১৯৭৭ সন থেকে তিনি প্রতাপগড় কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দিতা করে ধারাবাহিকভাবে ২০১৩ সাল পর্যন্ত জয়ী হন। মাঝের পাঁচ বছর বাদে ১৯৭৭ সন থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের মন্ত্রী সভার সদস্য ছিলেন । মন্ত্রী হিসাবে দীর্ঘ ত্রিশ বছরে তিনি উচ্চ শিক্ষা, বিদ্যালয় শিক্ষা, তথ্য, সংস্কৃতি ও পর্যটন দপ্তরের গুরত্বপুর্ন দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সনে জয়ী হয়েও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি মন্ত্রী সভায় যান নি । তাকে দেওয়া হয়েছিল ত্রিপুরা রাজ্যের যোজনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়ীত্ব ।
শুধু মন্ত্রী হিসাবেই নয়, ত্রিপুরা রাজ্যের বর্তমান শাসক দল কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ স্থানীয় প্রবীণ নেতাদের মধ্যেও অন্যতম ছিলেন অনিল সরকার। মাত্র সতের বছর বয়সেই ১৯৫৬ সালে তিনি কুমিল্লায় অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন।তার পর ১৯৬১ সনে বাংলা বিষয় নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাষ্টার ডিগ্রী পড়তে গিয়ে কমিউনিষ্ট আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যান। তার আগেই অবশ্য মাতৃভূমি ছেড়ে বাবা মহেশ সরাকারের সঙ্গে তিনি ত্রিপুরায় চলে আসেন । ১৯৬৩ সনে মাষ্টার ডিগ্রী শেষ করে ত্রিপুরায় ফিরে কমিউনিষ্ট আন্দোলন শুরু করেন ।
photo   Deadbody of  Anil sarkar  has been reached at Agartala Air port .Copy
রাজনৈতিক সংগ্রাম,দীর্ঘ দিনের মন্ত্রিত্ব,প্রশাসনিক কাজ কর্মের পাশাপাশি জাত পাত, ধর্মের বেড়া ভেঙ্গে গোটা মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্যও তিনি সংগ্রাম করেন । মানবতাই ছিল তার ধর্ম । সমাজের উঁচু জাতের বিরুদ্ধে ছিল তার জিহাদ । বাবা সাহেব আম্বেদকর ছিলেন তাঁর আদর্শ মহাপুরুষ । পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, মৌলবাদ, কুসংস্কার, শোষণ, অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে তিনি কলম ধরেছেন। বহু কবিতা লিখেছেন মানুষের জন্য। মাতৃভাষা বাংলার জন্য ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ । দেশ ছেড়ে এলেও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি তার হৃদয়ের অনুভূতি ছিল প্রবল। মাতৃভূমির কথা মনে পড়লেই তিনি ছুটে যেতেন বাংলাদেশে । তাঁর উদ্যোগেই ভারত বাংলা সীমান্তে যৌথভাবে শুরু হয় একুশের ভাষা দিবসে বিশেষ অনুষ্ঠান। তাঁর চেষ্টাতেই সংস্কৃতির আদান প্রদানের জন্য ভারত বাংলাদেশের মধ্যে পদ্মা মেঘনা গোমতী নামে একটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সংস্থা গঠিত হয়। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়নে তিনি সদা সর্বদাই ছিলেন আন্তরিক । বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি তার ছিল গভীর শ্রদ্ধা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় শাহবাগ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে কবি মন্ত্রী অনিল সরকার লিখেন-
‘একুশ তুমি রক্ত শ্রাবণ রাজাকারের ফাঁসি , ধর্ষিতা বোন, অশ্রু নদী আগুন রাশি রাশি, একুশ অমর জয়ধ্বনি কর্ণফুলীর বান, উথাল পাতাল উজানি নাও দুরন্ত সাম্পান, আজ একুশ, কাল একুশ, একুশ বারো মাস, একুশ শুধু রক্তকমল শহীদ ভাইয়ের লাশ,একুশ এবার রাজীব হায়দার শাহবাগের ফুল , ফিরে ফিরে রক্তনদী ঝড়ের উপকূল, একুশ আমার ঝাড়ের বাঁশি স্বাধীনতার গান, একুশ আমার সোনার বাংলা- শেখ মুজিবুর রহমান।’

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply