পুড়ে কিংবা গুলিতে মরতে চাই না, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই

—ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান

বাসে, ট্রাকে, ট্রেনে, লঞ্চে আগুন, পেট্টোল, বোমা, ককটেল।মানুষ ঝলসে যাচ্ছে, জ্বলে পুড়ে মরে যাচ্ছে।ঢাকা মেডিকেলসহ দেশের বিভিন্ন মেডিকেলের বার্ণ ইউনিটে চলছে মানুষের হৃদয়বিদারক আহাজারি ।অন্যদিকে র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির নির্বিচার গুলিতে কিংবা কথিত বন্দুকযুদ্ধে বিচারবহির্ভুতভাবে চলছে মানুষ হত্যার মহোতসব। এতে দেশে সর্বত্রই নাগরিকরা দিনাতিপাত করছেন অস্বাভাবিক মৃত্যুর এক আতঙ্কে। এই আতঙ্ক থেকে কোনো পেশার মানুষই মুক্ত নন।

পেট্রোল কিংবা বোমা-ককটেলের আগুনে পুড়ে হতাহতের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না স্কুলগামী শিশু, শিক্ষক থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া দিনমজুরও। এসব কিছু কিসের জন্য হচ্ছে তা আমাদের সবারই জানা। আমাদের দেশে মানুষ পুড়িয়ে কিংবা গুলি করে হত্যার এসব ঘটনা যে নতুন তা নয়, ইতোপূর্বেও আমরা তা দেখেছি। দেখেছি ক্ষমতার টিকে থাকা কিংবা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কথিত রাজনীতির নামে কীভাবে সাধারণ নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে।পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে। ভিটেমাটি ছাড়া করা হয়েছে।

জানি না, আমাদের মতো গরিব দেশের গদি বেশী আরামপদ কিনা! একবার কেউ গদিতে বসলে সেই গদি আর ছাড়তে চায় না। উন্নত, সভ্য, শিক্ষিত দেশের গদিতে এত আরাম নেই। এত দুর্নীতি, এত অরাজকতা, এত সন্ত্রাস করার সুযোগও ওইসব দেশে নেই। মন্ত্রী-এমপি হলেই কোটিপতি- সম্পদের পাহাড় গড়ার নজীরও নেই।

মানুষ আগুনে পুড়ে মরছে, ঝলসে হাসপাতালে আর্তনাত করছে। আর আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা একে অপরকে দোষারোপ করে চমকপদ বাক্যের বুলি উড়াচ্ছেন।বিশ্বে আর এমন কোনো দেশ খুজেঁ পাওয়া যাবে বলে আমার বিশ্বাস হয় না। যেখানে শিক্ষা দীক্ষা, চাকরি ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে মানুষ হত্যা করে দেশের সর্বনাশ করে রাজনীতিবিদরা এমন অপরাজনীতি করতে পারেন! যেখানে মুক্তচিন্তা, বাক স্বাধীনতা, মানুষের জানমালের কোনো নিরাপত্তা নেই, সেটা আবার কিসের গণতন্ত্র, কিসের রাজনীতি তা আমার বোধগম্য নয়।

নাগরিকদের ঠকিয়ে যে লোক নিজের পকেটে পয়সা ভরে, মানুষের টাকা লুট করে রাতারাতি কোটিপতি বনে, দুর্নীতি যাদের রোজগারের উৎস, তারাই তো আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ।বোমা-ককটেলের আগুনে মানুষ মরলে তাদের কষ্ট হয় না। বরং ওই পোড়া লাশটি নিয়েই চলে তাদের নতুন রাজনীতি। তারা মুখে যে নীতির কথা বলেন, নিজেদের জীবনে তা মানেন না।তা না হলে কী এমন খেলা খেলতে পারতেন!

আর বোমা-ককটেল কারা বানাচ্ছে, কারা সাধারণ মানুষের গায়ে মারছে, তা কী আমাদের অজানা? তারা একদিকে মানুষের অধিকারের কথা বলে মায়া কান্না করছেন, অন্যদিকে নিজেদের লোকজনকে বোমা-ককটেল বানাতে বলছেন, বলছেন গুলি করতে। চোখের সামনে মানুষকে আগুনে ঝলসে দেওয়া হচ্ছে, পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে, তারা কি কেঁদেছেন কারও জন্য? তারা কি অনুশোচনা করেছেন, দুঃখ করেছেন, বন্ধ করেছেন এই হত্যাযজ্ঞ? করেননি।

কারণ তারা জানেন এভাবেই মানুষ থেকে শুরু করে যা কিছু আছে সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে বেনিশ করলেই ক্ষমতায় টিকে থাকা কিংবা ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব। আমরা জানি, যে মানুষ আগুনবোমায় মারা গেছে, হাসপাতালে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন তাদের প্রায় সবাই গরিব-দু:খী, খেটে খাওয়া মানুষ। গরিব মরলে তাদের কিছু যায় আসে না। ওই লোকগুলো আমাদের কারও না কারও সন্তান। তাদের রোজগারেই হয়তো অনেকের সংসার চলতো। অনেকেই নির্ভর ছিল ওদের ওপর। ওদের মৃত্যুতে অনেকগুলো পরিবারের সর্বনাশ হয়েছে। পথে বসেছে অনেক পরিবার।

হাসপাতালে কাতরাচ্ছে শতাধিক দগ্ধ মানুষ। জ্বলে যাওয়া পুড়ে যাওয়া মানুষগুলো আর ফিরে পাবে না তাদের আগের স্বাভাবিক জীবন। হয়তো পঙ্গু হয়ে বাকি জীবন বেঁচে থাকতে হবে। এদের এই পরিণতির জন্য দায়ী কে? নিশ্চয়ই দায়ী আমাদের দেশের এই রাজনীতিবিদরাই। আর এভাবেই তারা অসহায় নিরাপরাধ মানুষকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে পঙ্গু করে মেরে গদিতে টিকে থাকতে কিংবা গতি দখল করতে চান। ফলে তাদের কাছে ক্ষমতা ছাড়া আর কারও জন্য কিছু যায় আসে না।

সরকার ও বিরোধী জোট চাইলেই পারে চলমান সংকটের সমাধান করতে। পারে উভয়পক্ষ একগুয়েমি পরিহার করে আলোচনার টেবিলে বসতে। পারে চলমান এই রাজনৈতিক সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে দেশবাসীকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি করতে।কিন্তু সেটা হচ্ছে না। এতে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ তাদের অপরাজনীতির শিকার হচ্ছি।

সবশেষে বলবো- আমরা এমন রাজনীতি চাই না। চাই না রাস্তাঘাটে আগুনে পুড়ে কিংবা গুলিতে মরতে। আমরা জানমালের নিরাপত্তা চাই। চাই স্বাভাবিক স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি।

============================
লেখক: শিক্ষা ও সমাজ বিষয়ক গবেষক।
ই-মেইল: sarderanis@gmail.com

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply