কুমিল্লা উত্তরের ৫টি আসনে গাঁঢাকা দিয়েছেন বিএনপি নেতারা

মো.জাকির হোসেন :–

বিএনপি চেয়ারপার্সন ও ২০ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দেন গত ৫ জানুয়ারি। এরপর থেকে সারাদেশে একযোগে শুরু হয় কঠোর অবরোধ। অবরোধের পাশাপাশি জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে পালিত হয় হরতালসহ আলাদা আলাদা কর্মসূচী। কিন্তু ব্যতিক্রম কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপি। অবরোধের ২০দিনে কর্মসূচীতে নেই জেলার ৫টি সংসদীয় আসনের সাবেক এমপি ও দলীয় প্রার্থীরা। শুরুর দিকে মহাসড়কের মাত্র তিনটি পয়েন্ট- দাউদকান্দি, ইলিয়টগঞ্জ ও চান্দিনায় অবরোধের সমর্থনে ঝটিকা মিছিল হয়েছে ফটোসেশনের জন্য। অথচ এ জেলায় রয়েছেন ৩জন স্থায়ী কমিটির সদস্য ও একজন ভাইস চেয়ারম্যান। রয়েছেন ২০ দলীয় জোটের শরীক এলডিপির মহাসচিব। কুমিল্লা-০১, কুমিল্লা-০২, কুমিল্লা-০৩, কুমিল্লা-০৪ ও কুমিল্লা- ০৫ এই ৫টি সংসদীয় আসনের কোথাও মাঠে নেই আসনগুলো থেকে নির্বাচিত সাবেক এমপি ও আগামী নির্বাচনের প্রার্থীরা। নির্বাচন ঘনিয়ে আসলে দৌড়ঝাপ বাড়ানো এসব নেতারা এখন কোথায় তা নিয়ে রয়েছেন কর্মীদের নানান অভিযোগ।
বিএনপি নেতাকর্মীদের মতে সংসদীয় আসনের প্রার্থীরা যদি নিজ আসনের আন্দোলনের তত্বাবধান করতেন তবে দলের কর্মসূচীতে জনসম্পৃক্ততা বাড়তো কয়েকগুন। ছাত্রদলের কার্যক্রম থেমে থেমে দেখা গেলেও মাঠে নেই যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিকদল সহ বিএনপির অন্য সংগঠনগুলো। বলা হয়ে থাকে দাউদকান্দি আর চান্দিনায় কর্মসূচী সঠিকভাবে পালিত হলে এর প্রভাব ফেলতো ঢাকা এবং চট্টগ্রামে। বিএনপির জেলা কমিটির সাথে উপজেলাগুলোর সমন্বয়হীনতাকেও আন্দোলনের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন অনেকেই।
বিচ্ছিন্ন ঘটনায় পার্কিং করা গাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে চান্দিনায়। নেই পুলিশের এ্যাকশন, নেই মামলা। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাবার পথে কুমিল্লার প্রবেশদ্বার দাউদকান্দি। তাই মহাসড়কের দাউদকান্দি অংশ অবরোধের কর্মসূচীতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হলেও কোথাও কোন পিকেটিং নেই নেতা কর্মীদের। দাউদকান্দি বিএনপির অভিভাবক দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দূদকের মামলায় বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তার অবর্তমানে কুমিল্লা-০১ (দাউদকান্দি- মেঘনা)’র বিএনপির রাজনীতি দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন তার পূত্র ড. খন্দকার মারুফ হোসেন। অবরোধের শুরু থেকে যদিও কোন কর্মসূচিতে যাননি ড. মারুফ। মামলা বা আহতের সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা অহিংস কর্মসূচী পালন করছেন। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীর ফলে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে মামলা বা এ্যাকশনে যাচ্ছেনা।’
ছাত্রদলের সাথে সমন্বয় হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে বিএনপির উত্তর জেলা ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ড. মারুফ বলেন, ‘ছাত্রদল বা অঙ্গসংগঠনের কোন নেতাকর্মী তার কাছে সহযোগিতা চাননি।’ তবে আন্দোলনের বিষয়ে তিনিও বিএনপির জেলা সভাপতি বা ছাত্রদল নেতাদের সাথে যোগাযোগ করেননি বলে জানান।
চান্দিনায় রয়েছে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির কার্যালয়টি। মহাসড়কে দাউদকান্দির পরের অংশ এটি। কিন্তু অবরোধের শুরু থেকে ২০দল বা বিএনপির ব্যানারে হয়নি কোন মিছিল বা সমাবেশ। কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি খোরশেদ আলম গত সংসদে কুমিল্লা-০৭ (চান্দিনা) থেকে চার দলের প্রার্থী হয়েছিলেন। রাজপথের রাজনীতিতে বেশ সক্রিয় থাকলেও সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোতে তাকে তেমন দেখা যাচ্ছে না। জানা গেছে, এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমদের সাথে বিরোধ থাকায় তিনি কেন্দ্রের সমর্থন পাচ্ছেন না এমনকি কিছুদিন পূর্বে তাকে সভাপতির পদ থেকে সাময়িক বহিস্কারও করা হয়।পওে অবশ্য তাকে পুনরায় দলে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছিল। এদিকে চান্দিনায় ২০ দলের শরীক এলডিপির কোন কর্মসূচী ছিলনা অবরোধের শেষাবধি পর্যন্ত। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপির খোরশেদ আলম নাকি এলডিপির রেদোয়ান আহমদ, কে হচ্ছেন এই আসনের ২০দলীয় প্রার্থী তা নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে রয়েছে নানা সমীকরণ
নেতারা কেন মাঠে নেই এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপি ও এর অংগসংগঠন গুলোর মধ্যে। দলের অনেক নেতা কর্মীর অভিযোগ মামলা পরিচালনা ও আহতদের চিকিৎসায় নেতারা কোনরকম সহযোগিতা করছেন না। এ পর্যন্ত বিভিন্ন মামলায় আটক হয়েছেন প্রায় ২০জন আর পুলিশের সাথে বিক্ষিপ্ত ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় আহত অর্ধশতাধিক। কিন্তু জেলার অভিভাবকহীন আন্দোলনের পরিণতি কোন দিকে তা নিয়ে যথেষ্ট ক্ষোভ এখানকার নেতাকর্মীদের। এদিকে মামলা হামলার প্রতিবাদে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আহুত হরতালগুলোতে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির ছিলনা কোন প্রত্যক্ষ সমর্থন। এমনকি নেতা কর্মীরাও হরতালের দিনগুলোতে কোন ব্যানারে পিকেটিং করেনি মহাসড়কে।
কুমিল্লা-২ (হোমনা- তিতাস) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপি’র কেন্দ্রীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এম.কে আনোয়ার। এই আসনে মহাসড়ক না থাকলেও আঞ্চলিক সড়কে মাঝে মাঝেই তৎপর এখানকার নেতা কর্মীরা। জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মো. আক্তারুজ্জামান সরকার তার নিজ এলাকায় সময় দেন বলে জানা যায়।
উত্তর জেলা বিএনপির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কুমিল্লা সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক। দেবিদ্বার উপজেলার উপর দিয়ে এসড়কের দীর্ঘ পথে নেই অবরোধ। কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ্ব ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী। স্থানীয় রাজনীতিতে তিনি আলোচনায় থাকলেও বিএনপির কেন্দ্রীয় কোন কর্মসূচীতে কখনোই মাঠে দেখা যায়নি তাকে। গত ২০ দিনের অবরোধ আন্দোলনে দেবিদ্বারের উপজেলা বিএনপির কিছু তৎপরতা থাকলেও ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী বা তার ছেলে জেলা বিএনপি’র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার রিজভীউল আহসান মুন্সীকে দেখা যায়নি কোন কর্মসূচীতে। সারা উত্তর জেলা জুড়ে যখন নেতাদেও এই নিস্ক্রিয়তা,সেখানে মাঠ পর্যায়ের সাধারন কর্মীরা হতাশ । তারা এতটাই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে যে,এই মুহুর্তে নেতাদেও সমালোচনা করতেও পিছপা হচ্ছে না তারা।
আন্দোলন কর্মসূচীতে মুরাদনগর আলোচনায় থাকলেও এবার তার ব্যতিক্রম। কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসনের সাবেক এমপি ও বিএনপি’র কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আলহাজ্ব শাহ্ মোফাজ্জেল হোসেন কায়কোবাদ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার আসামী হয়ে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তিনি দেশের বাইরে। ফলে জেলার কর্মসূচিতে শারীরিক উপস্থিতি নেই তার। অবরোধের শুরুতে ইলিয়টগঞ্জে মহাসড়কে কিছু তৎপরতা থাকলেও পরবর্তীতে কখনও তাদের দেখা যায়নি। এমনকি রোববারের হরতালেও চোখে পড়েনি মুরাদনগর উপজেলা বিএনপির কোন পিকেটিং বা মিছিল। এই এলাকার সাবেক এমপি বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া ঢাকায় বেশ তৎপর থাকলেও এলাকায় তেমন একটা আসেননা। মতবিরোধ থাকায় কায়কোবাদের সাথে যৌথ কোন কর্মসূচীতেও দেখা যায় না তাকে। অন্যদিকে কায়কোবাদ পরিবারের রাজনীতিই মুরাদনগর বিএনপির কার্যক্রম বলে মনে করেন স্থানীয় বিএনপির অনেকে। ফলে উপজেলা বিএনপির কোন প্রভাব নেই দলীয় কর্মসূচীতে।
এব্যাপারে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপি’র সভাপতি আলহাজ্ব মো. খোরশেদ আলম জানান, বিভিন্ন উপজেলায় ও উত্তর জেলায় কর্মসূচী পালিত হয়েছে এবং হচ্ছে। জেলা বিএনপি’র শীর্ষ নেতাসহ উপজেলা পর্যায়ের ও সহযোগী সংগঠনের অসংখ্য নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এই কারণে বড় কর্মসূচি পালন করা যাচ্ছে না।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply