দেবিদ্বারের স্কুল ছাত্রী ধর্ষনের অভিযোগে অবশেষে ইউপি চেয়ারম্যান ও আইনজীবির বিরুদ্ধে মামলা: বিচারের দাবীতে জাগো হিন্দু পরিষদের মানব বন্ধন

মোঃ আক্তার হোসেন :–

কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ৯নং গুনাইঘর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ খোরশেদ আলম ও কুমিল্লা জজ কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট হারুন-অর-রশীদ সবুজ’র বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের নবম শ্রেণীতে পড়–য়া এক স্কুল ছাত্রী (১৪)কে ধর্ষনের অভিযোগে কুমিল্লা কোতয়ালী থানায় মামলা দায়ের হয়েছে।
শনিবার রাতে ওই ধর্ষিতা স্কুল ছাত্রীর পিতা পিন্টু দাস বাদী হয়ে কুমিল্লা কোতয়ালী থানায় এ মামলা দায়ের করেন। মামলা নং-১২৮, তারিখ-২৭/১২/২০১৪। অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশ ভিক্টিমকে রোববার কুমেক হাসপাতালে ডাক্তারী পরীক্ষা সম্পন্ন ও ২২ ধারায় জবান বন্ধী রেকর্ড করা হয়েছে। দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবীতে জাগো হিন্দু পরিষদ নামের একটি সামাজিক সংগঠন রোববার দুপুরে কুমিল্লার কান্দিরপারে মানব বন্ধন করেন।
মামলার বাদী পিন্টু দাস তার অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করেন, তার স্ত্রী লিপিকা দাস গত ২৪ ডিসেম্বর বিকেল ৩টায় আমার অসুস্থ্য ছোট মেয়ে (প্রতিবন্দি) রিতু দাস(১০)কে নিয়ে কুমিল্লায় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায়, সাথে আমার বড় মেয়ে দেবিদ্বার মফিজ উদ্দিন আহমেদ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রী(১৪)ও ছিল। বাড়ি আসার পথে কুমিল্লা কান্দিরপাড় এলাকায় দেবিদ্বার উপজেলার ৯নং গুনাইঘর উত্তর ইউপি চেয়ারম্যান খোরশেদ আলমের সাথে দেখা হয়। তিনি ঢাকা যাবে বলে আমার স্ত্রীকে জানায়। তারা ওই দিন সন্ধ্যা ৬টায় বাড়ি আসার জন্য রিক্সায় উঠে, এসময় খোরশেদ চেয়ারম্যান বলেন, আমি আর ঢাকা যাবনা দেবিদ্বার চলে যাব। তোমরা কষ্ট করে এক রিক্সায় যেতে হবেনা। তোমার বড় মেয়ে আমার সাথে যাবে, আপত্তি জানালেও জোর করে আমার মেয়েকে রিক্সায় তোলে নেয়। আমার স্ত্রী ছোট মেয়েকে নিয়ে শাসনগাছা বাস ষ্ট্যাশনে আসে, সে আসার সময় পেছনে রিক্সা না দেখে ফোনে কথা বললে চেয়ারম্যান জানায় জ্যামে আটকা পড়ে আছি। আমার স্ত্রী শাসনগাছা বাস ষ্ট্যাশনে নেমে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। এর মধ্যে একাধিকবার ফোনে কথা হয়। এক পর্যায়ে চেয়ারম্যান তাদের বাড়ি চলে যেতে বলে, তারা পরের বাসে আসবে বলে জানায়। আমার স্ত্রী আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ফোনে কথা বলার চেষ্টা করে, তখন মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়ায় শাসনগাছা থেকে রিক্সায় আবারো তাদের খুঁজতে কান্দিরপাড় আসে। না পেয়ে দেবিদ্বারে চলে আসে। রাত ৮টায় আমার মেয়ে তার মা’কে ফোনে জানায়, ‘মা আমাকে বাঁচাও’ এসংবাদ পেয়ে আমার স্ত্রী কিছু লোকজন নিয়ে থানায় যান। থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ মিজানুর রহমানের নিকট ঘটনাটি জানায় এবং আমার মেয়েকে উদ্ধারের মৌখিক আবেদন জানায়। ওসি সাহেব তাৎক্ষনিক খোরশেদ চেয়ারম্যানের সাথে ফোনে কথা বলেন। ওই সময় চেয়ারম্যান ঘটনাটি অস্বীকার করে দেবিদ্বার উপজেলার ছেপাড়া গ্রামে একটি দরবারে আছে বলে জানায়। তাৎক্ষনিক আমার স্ত্রী ওসি সাহেবের কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে চেয়ারম্যানের কাছে মেয়ের খোঁজ নিলে সে জানায় তোমাকে আমি চিনিনা, তোমার মেয়েকেও চিনিনা বলে ফোন কেটে দেয়। পরে কুমিল্লা ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চে (ডিবি)র উপ-পরিদর্শক (এস,আই) শাহ্ কামাল আকন্দের সাথে যোগাযোগ করলে, তিনি মোবইল ট্রেক করে খোরশেদ চেয়ারম্যানের অবস্থান সনাক্ত করে বলেন, কুমিল্লা শহরের চকবাজার এলাকায় আছেন। রাতে আমার স্ত্রী আমাদের সম্প্রদায়ের কিছু লোকজন খোরশেদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা জানায় মেয়েকে পাঠিয়ে দেবে। আমার স্ত্রী অপেক্ষা করে আনুমানিক রাত সাড়ে ৩টায় দেবিদ্বার পৌর এলাকার ছোটআলমপুরের ভাড়া বাসায় এসে দেখে আমার মেয়ে বাসার সামনে অপেক্ষা করছে। আমার স্ত্রী মেয়ের সাথে কথা বলার পর মেয়ে তাকে জানায়, মেয়ে তার মায়ের সাথে কান্দিরপাড় থেকে আসার পথে খোরশেদ চেয়ারম্যান আমাকে জোর করে তার রিক্সায় তোলে নেয়। শাসনগাছা বাস ষ্ট্যাশনের দিকে না এসে রিক্সা ঘুরিয়ে চকবাজারের দিকে নিয়ে যায়। আমার মেয়ে আপত্তি করলেও তার কোন কথা শোনে নাই। এক পর্যায়ে শব্দ করলে মেয়েকে হত্যার হুমকী দিয়ে খোরশেদ আলম আমার মেয়েকে চরথাপ্পর মারতে থাকে। এসময় অপর অভিযুক্ত এডভোকেট মোঃ হারুন-অর-রশীদ সবুজ নামে এক লোককে ফোনে জানায়,- আমরা আসছি জায়গা ঠিক রেখো। রিক্সা থেকে নামিয়ে এডভোকেট মোঃ হারুন-অর-রশীদ সবুজ’র ভাড়াটিয়া বাসায় নিয়ে যায়। এডভোকেট সবুজ তাদের একটি কক্ষ দেখিয়ে বলে, এটাই তোমাদের কক্ষ। তখন খোরশেদ চেয়ারম্যান আমার মেয়েকে জোর করে ওই কক্ষে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। আমার মেয়ে কান্না কাটি শুরু করলে সে আমার মেয়েকে বেধরক মারধর করে। একপর্যায়ে আমার মেয়েকে ঝাপটে ধরে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পরনের কাপড়-চোপড় খুলে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের ফলে আমার মেয়ের যৌনাঙ্গে প্রচন্ড রক্তক্ষরণ হয়ে অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। এসময় খোরশেদ আলম একটি ফোন পেয়ে মেয়েকে ছেড়ে প্যান্ট-শার্ট পড়ে রোম থেকে বেড়িয়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় খোরশেদ চেয়ারম্যান এঘটনা কাউকে জানালে আমার মেয়েকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলার হুমকী দিয়ে যায়। খোরশেদ চেয়ারম্যান খারাপ প্রকৃতির লোক। তার বিরুদ্ধে খুণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগে একাধিক মামলা হয়েছে। আমার মেয়ে ভয়ে ধর্ষণের বিষয়টি গোপন রাখলেও পরবর্তীতে আমার নিকট তা প্রকাশ করে। খোরশেদ চেয়াম্যানের ভয়ে এলাকায় তার বিরুদ্ধে কোন লোক কথা বলতে সাহস পায়না। পরবর্তীতে অপর আসামী এডভোকেট মোঃ হারুন-অর-রশীদ সবুজ, অসুস্থ্য ও বিবস্ত্র অবস্থায় বিছানায় পড়ে থাকা আমার মেয়েকে বিছানা থেকে উঠিয়ে বের করে আনে এবং তার ভাড়াটিয়া বাড়ি থেকে ক্যান্টনমেন্টে এনে রাত অনুমান ১১টায় একটি রিজার্ভ সিএনজি চালিত অটো রিক্সায় উঠিয়ে দেয়। খোরশেদ আলম তার সঙ্গীয় অপর আসামী এডভোকেট মোঃ হারুন-অর-রশীদ সবুজ’র সহযোগীতায় আমার মেয়েকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করে। আমার মেয়েকে আহত অবস্থায় দেখে উল্লেখিত ঘটনা শোনে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দেই। আমার মেয়েকে উদ্ধারের পর আমার কোম্পানী থেকে ছুটি আনতে বিলম্ব হওয়ায় এবং আত্মীয় স্বজনদের সাথে পরামর্শ করে মামলা দায়ের করতে বিলম্ব হয়েছে।
ধর্ষিতার মা লিপিকা দাস জানান, ঘটনার পর থেকে খোরশেদ চেয়ারম্যান এবং তার সহযোগীরা এবিষয়ে মামলা দায়ের না করতে এবং বিষয়টি গোপন রাখতে পরামর্শ দেয়। না হলে আমার ও পরিবারের জান-মালের মারাত্মক ক্ষতি সাধনের হুমকী দেয়। এমনকি আমার মেয়েকে ধর্ষণ করার বিষয়টিও কাউকে না জানাতে বলে।
ধর্ষিতা স্কুল ছাত্রী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমি তার হাতে পায়ে ধরে নিজেকে রক্ষা করতে পারি নাই। আমাকে জোর পূর্বক ধর্ষণ শেষে বাতরোমে যাওয়ার সুযোগে বালিশের নিচ থেকে মোবইল ফোন নিয়ে মা’কে শুধু বলতে পেরেছি,-‘মা আমাকে বাঁচাও’। খোরশেদ আমাকে হুমকী দিয়ে বলে এঘটনা কাউকে বললে তোদের মেরে গুম করে ফেলব। প্রতি সপ্তাহে তোর মতো ৪/৫জনকে এনে মনরঞ্জন করি। কেউ মুখ খুলেনা। এসময় এডভোকেট সবুজ সব দেখে শোনে আমাকে উদ্ধার না করে তাকেই সহযোগীতা করেছে। পরবর্তীতে খোরশেদ ও তার সহযোগীরা আমাকে পরিবারের সবাইকে নিয়ে সিলেট চলে যেতে হুমকী দেয় ।
বর্বর ও দূর্ধর্ষ এ সন্ত্রাসী খোরশেদ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এখন এলাকাবাসী ক্ষোভে ফুসে উঠছে। স্থানীয়রা জানান, দেবিদ্বার উপজেলার ৯নং গুনাইঘর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ খোরশেদ আলম এখন একটি আতঙ্কের নাম। বিচার প্রত্যাশি ভোক্ত ভূগীদের আত্কে উঠার নাম। যার ভয়ে এলাকাবাসী তটস্ত। তার অপকর্মের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়না। মুখ খুললে হামলা-মামলা, অপবাদ- নির্যাতন, মিথ্যা মামলার শিকারই নয়, জীবণ বাঁচাতে পালিয়ে বেড়াতে হয়। খুন, ধর্ষণ, সংখ্যালঘুদের জমি দখল, সংখ্যালঘু পরিবারের গৃহবধূ ও মেয়েদের ধর্ষণ, নির্যতন নিত্যদিনের রুটিনে পরিনত করার অভিযোগ রয়েছে। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী লোকদের নিয়ে তার লালিত একটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে। ওই বাহিনীর সাথে থানা-পুলিশের ভূমিকায় নিজ ইউপি’র গ্রাম পুলিশও আদেশ তামিলে সর্বদা নতজানু। তার পালিত বাহিনী দালালদের সহযোগীতায় গ্রামে গ্রামে পারিবারিক, জমি সংক্রান্ত বিরোধ সৃষ্টি করে সালিসের নামে হয়রানী ও বিপুল অর্থ লুটে নিচ্ছে। বিভিন্ন অভিযোগের পাশাপাশি বেতার শিল্পী কালিপদ দেব হত্যা মামলারও আসামি ছিল খোরশেদ চেয়ারম্যান। পরবর্তীতে পারিবারিক ভাবে মামলাটি নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
অপর দিকে ধর্ষক মোঃ খোরশেদ আলম চেয়ারম্যান ও তার সহযোগি কুমিল্লা জজ কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট হারুন-অর-রশীদ সবুজ’র দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবীতে জাগো হিন্দু পরিষদ নামের একটি সামাজিক সংগঠন রোববার দুপুরে কুমিল্লার কান্দিরপারে মানব বন্ধন করেন।
এব্যাপারে মামলা তদন্ত কর্মকর্তা কোতয়ালী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সালাউদ্দিন জানান, শনিবার রাতেই মামলাটি নথিভূক্ত করা হয়েছে, রোববার দুপুরে ভিক্টিমের ডাক্তারী পরীক্ষা সম্পন্ন ও ২২ ধারায় জবান বন্ধী রেকর্ড করা হয়েছে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply