আজ ঐতিহাসিক শহীদ বেতিয়ারা দিবস : নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত

মোঃ বেলাল হোসাইন :–

চৌদ্দগ্রামের ইতিহাস ঐতিয্যের অন্যতম ধারক এবং বাহক বেতিয়ারা শহীদ দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক বাহিনীর আতর্কিত হামলায় মৃত্যুবরন করেন ন্যাপ কমিউনিষ্ট পার্টির ৯ জন কর্মী। এ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টির উদ্যোগে সোমবার বিকালে উপজেলার জগন্নাথদিঘী ইউনিয়নের বেতিয়ারা গ্রামে এক অনুষ্ঠান এবং স্মরন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কমিউনিষ্ট পার্টির উপদেষ্টা মঞ্জুরুল আহসান খাঁন। এছাড়া নানা শ্রেনী পেশার মানুষ, বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা দিবষটি উপলক্ষ্যে শহীদদের স্মরনে নির্মিত স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়।
১৯৭১ সালের এই দিনে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের জগন্নাথদীঘি ইউনিয়নের বেতিয়ারা গ্রামে ন্যাপ-কমিউনিস্টপার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনীর ৯ জন বীরযোদ্ধা পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের এই ইতিহাসকে সমুজ্জল রাখতে প্রতিবছর ১১ নভেম্বর পালিত হয়ে আসছে বেতিয়ারা শহীদ দিবস। বেতিয়ারা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি রক্ষা কমিটির কর্মকর্তা জিয়াউল হক জিবু ও আব্দুল মমিন ওস্তাদসহ স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রিয় মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার প্রত্যয়ে যৌথ গেরিলা বাহিনীর ৭৮ জন সদস্য ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে এসব গেরিলা যোদ্ধারা ভারতের বাইকোয়া বেইজ ক্যাম্প থেকে ১৯৭১ সালের১০ নভেম্বর রাত ৮টার দিকে চৌদ্দগ্রাম সীমান্তবর্তী ভৈরবনগর সাব ক্যাম্পে (চৌত্তাখোলা ক্যাম্পের শাখা) পৌঁছান। এ বাহিনীর পরিকল্পনা ছিল দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক শ্রমিক নেতা রুহুল আমিন কায়সারের সঙ্গে যোগাযোগ করে নোয়াখালীর সেনবাগ ও কাজীর হাট এলাকাকে নিয়ে একটি মুক্তাঞ্চল গড়ে তোলা। ভৈরবনগর সাব ক্যাম্পের দুজন মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের বিএসসি ও সামসুল আলম ১১ নভেম্বর রাতেই গেরিলা বাহিনীর ওই দলটিরব াংলাদেশে প্রবেশের নকশা প্রণয়ন করেন। প্রণীত নকশা অনুযায়ী সাব ক্যাম্পের ৩৮ জনগেরিলা মুক্তিযোদ্ধাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে বেতিয়ারা চৌধুরী বাড়ির দুইপাশে অ্যাম্বুশ পাতা হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক শত্রুমুক্ত কিনা পরীক্ষা করার জন্য স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কাদের ও আবদুল মন্নানকে ওই সড়কে পাঠানো হয়। সিগন্যালের দায়িত্বে থাকা কাদের ও মন্নান মহাসড়ক শত্রুমুক্ত বলে রাত ১২টায় মূল বাহিনীকে জানায়। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে যৌথ গেরিলা বাহিনীর ৩৮ জনের একটি দলটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অতিক্রমের জন্য এগিয়ে যায়। এ সময় সড়কের অপর (পশ্চিম) পাশে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর অতর্কিতভাবে ব্রাশ ফায়ার শুরু করে। এতে ৯ গেরিলা যোদ্ধা ঘটনাস্থলেই শহীদ হন এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। পরিবহনের সুবিধার্থে তাঁদের অনেকের অস্ত্র প্যাকেটে থাকায় শত্রু বাহিনীকে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি। যে কয়জনের হাতে অস্ত্র ছিল, তাঁরা পাল্টা হামলা চালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। হানাদার বাহিনী এ সময় দু’জন মুক্তিযোদ্ধাকে বন্দি করে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে তাঁদের কোনো সন্ধান বা লাশ পাওয়া যায়নি। এক সপ্তাহ পর স্থানীয় লোকজন ধানক্ষেত থেকে শহীদদের গলিত লাশগুলো উদ্ধারকরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে একটি গর্ত খুঁড়ে মাটি চাপা দেন। বীরমুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণপণ লড়াইয়ে ২৮ নভেম্বর চৌদ্দগ্রামের এ জগন্নাথ দীঘি অঞ্চল শত্রুমুক্ত হয়। পরদিন ২৯ নভেম্বর স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও মুক্তিযোদ্ধারা গর্ত থেকে লাশগুলো তুলে ইসলামি শরিয়া মোতাবেক জানাজার পর মহাসড়কের পশ্চিমপাশে দ্বিতীয়বার দাফন করেন। এরপর শহীদদের গণকবরের ওপর স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে পাশেই নির্মাণ করেন স্মৃতিস্তম্ভ। ১৯৯১ সালে মহাসড়ক পুনর্র্নিমাণকালে গণকবরটি পাকা করে পাশেই একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। ২০০৭ সালের নভেম্বরে তত্তাবধায়ক সরকার বেতিয়ারায় শহীদদের গণকবর ও স্মৃতিসৌধ স্থানান্তরসহ পুনর্র্নিমাণের উদ্যোগ গ্রহণ করলেও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় তা হয়ে ওঠেনি। মহাসড়কের সম্প্রসারিত অংশে অবহেলা ও অযতেœ পড়ে আছে শহীদদের গণকবর ও স্মৃতিসৌধ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ মর্যাদায় গণকবর ও স্মৃতিসৌধটি স্থানান্তরসহ সংরক্ষণের দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয় জনগনের ।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply