বুড়িচংয়ে ব্যবসায়ী মাসুদ হত্যার ৫ মাসেও রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ॥ গ্রেফতার হয়নি আসামী

মো. জাকির হোসেন :–

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কালাকচুয়া এলাকায় ব্যবসায়ী মাসুদ হত্যার ৫ মাস পেরিয়ে গেলেও হত্যার মূল রহস্য উদঘাটন ও আসামীদের গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। আসামীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ বলছে পলাতক। ফলে অবুঝ দু’টি শিশুকে নিয়ে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে নিহত মাসুদের স্ত্রী ও পরিবারের লোকজন।
মামলার বিবরণ, স্থানীয় একাধিক সূত্র ও নিহতের পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার মোকাম ইউনিয়নের কোরপাই গ্রামের মৃত হাজী শাহাদাত আলীর ৪ ছেলের মধ্যে মাসুদুল ইসলাম ছিল সবার ছোট। বড় ভাই মোঃ মফিজুল ইসলাম এলাকার সম্মানিত ব্যাক্তিদের মধ্যে একজন সিঙ্গাপুর ট্রেনিং করানোর মাধ্যমে লোক পাঠানোর ব্যবসা ছাড়াও তিনি ছাত্র জীবন থেকে বিএনপির রাজনীতির সাথে সক্রিয় ভাবে জড়িত। বড় ভাইয়ের দেখানো পথ ধরেই মাসুদ ছাত্র জীবন থেকে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়ে। ২০০৪ সালে ডিগ্রী পাশ করে বাবার অবর্তমানে পরিবারের হাল ধরতেই বড় ভাইয়ের ব্যবসার অংশিদার হয়। এর মধ্যে চলে যায় সিঙ্গাপুরে, দেড় বছর বিদেশে থাকার পর দেশে এসে পরিবারের সম্মতিক্রমে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার রাজেন্দ্রপুর এলাকায় বিয়ে করে। বিয়ের পর থেকে মাসুদ ব্যবসার দিকে আরো মনযোগী হয়ে উঠে। সিঙ্গাপুরে লোক পাঠানোর পাশাপাশি জমি ক্রয় বিক্রয় ব্যবসা আরাম্ভ করে দেয় মাসুদ। কুমিল্লার নাঙ্গলকোট এলাকার জালাল এর সাথে পার্টান হয়ে কোট বাড়ীর মটপুস্কুনী এলাকায় ৫ শতক জমি ক্রয় করে মাসুদ। এর মধ্যে মাসুদের সংসারে দু’টি সন্তারের জন্ম হয়। দু’বছর পূর্বে বড় মেয়েটিকে ভাল স্কুলে পড়ানোর জন্য কুমিল্লা শহরের ঝাউতলা এলাকায় ভাড়া বাসা নেয় মাসুদ। মেয়ে তাসনিয়া ইসলাম মাইশাকে ভর্তি করেন আর আর ইন্টার ন্যাশনার স্কুলে। বন্ধুত্ব প্রিয় মাসুদ কুমিল্লা শহরে বাসা নিলেও প্রায় প্রতিদিনই এলাকায় আসতো। দেখা করে যেত মা, ভাই আর বন্ধুদের সাথে। এভাবে ভালোই চলছিল মাসুদের জীবন। কিন্তু হঠাৎ এক ঝড়ো হাওয়ায় তছনছ হয়ে গেছে মাসুদের পরিবার, স্ত্রী হয়েছে বিধবা, দুই মেয়ে হয়েছে এতিম, আর জন্মদাত্রী মা হয়ে গেছে বাকরুদ্ধ। সেদিন ছিল ১ জুন রবিবার বিকেলে মাসুদ তার ব্যবহৃত পালসার মোটর সাইকেল (কুমিল্লা-ল- ১১-৪৬৯৪) নিয়ে বাড়ীতে আসেন। এলাকার বন্ধুদের সাথে দেখা করে সন্ধ্যায় বাড়ীতে যায়। সেখানে মা ও ভাইয়ের সাথে দীর্ঘক্ষন আলাপ শেষে মাসুদ বলেন আগামী ১০ দিনের মধ্যেই কুমিল্লার বাসা ছেড়ে বাড়ীতে চলে আসবে। এই বলে রাত্র ৯ টায় মোটরসাইকেল যোগে মাসুদ কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। মাসুদ বাড়ী থেকে প্রায় ৫ কিঃ মিঃ দূরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কালাকচুয়া গ্রামস্থ হাজী বাড়ী জামে মসজিদের উত্তর পার্শ্বে পৌঁছালে পূর্ব থেকে উৎপেতে থাকা ৫/৬ জনের একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ মাসুদের মোটর সাইকেলের গতিরোধ করে মোটর সাইকেল ও টাকা পয়সা লুট করে নেয়ার চেষ্ঠা করে। এসময় মাসুদ বাঁধা দিলে সন্ত্রাসীরা তার মুখে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ মারে ও তার পেটের বাম পার্শ্বে ছোরা দিয়ে ঘাই মেরে পেটের নাড়ি-ভূড়ি বের করে ফেলে। রাস্তার অন্য পার্শ্বে সিএনজিতে থাকা কালাকচুয়া গ্রামের মৃত আঃ হাকিমের ছেলে মোঃ মহসিন ঘটনাটি দেখে চিৎকার করে লোকজন একত্রিত করে সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করলে সন্ত্রাসীরা দু’টি মোটর সাইকেল দিয়ে কুমিল্লার দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্ঠা করে। এসময় স্থানীয়রা ধাওয়া করে একটি লাল রংয়ের নাম্বার বিহীন পালসার মোটরসাইকেলসহ এক ডাকাতকে আটক করে গনধোলাই দেয়। অন্যদিকে আহত মাসুদকে কাবিলা ইস্টান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষনা করে। মাসুদের মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী আটককৃত ডাকাতকে গন ধোলাই সহ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে। পরে খবর পেয়ে বুড়িচং থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আটককৃত ডাকাতকে উদ্ধারসহ নিহতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য কুমেক হাসপাতালে প্রেরণ করে। আটককৃত সন্ত্রাসী কোতয়ালী থানাধীন উত্তর বিষ্ণুপুর (ভাটপাড়া) এলাকার হারুনুর রশিদের পুত্র হানিফ মিয়া প্রকাশ্যে রিংকু (৩২) ওই দিন রাতে তার সঙ্গে থাকা বাকী ৪ সন্ত্রাসীর নাম প্রকাশ করে। পরদিন অর্থাৎ ২ জুন মাসুদের বড় ভাই মফিজুল ইসলাম বাদী হয়ে আটকৃত সন্ত্রাসীকে প্রধান আসামীসহ উত্তর বিষ্ণুপুর (ভাটপাড়া) এলাকার ফরিদ মোল্লার ছেলে হাবিব মিয়া (৩০), আঃ ছাত্তারের ছেলে আঃ কুদ্দুছ (৩০), কুদ্দুছ মিয়ার ছেলে টিটু মিয়া (৩২) ও অশোকতলা এলাকার হেলাল প্রকাশ্যে মোটা হেলালকে আসামী করে বুড়িচং থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেন বুড়িচং থানা অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) নেয়ামূল শাফী খান। কিন্তু ঘটনার ৫ মাস অতিবাহীত হয়ে গেলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত মামলার কোন অগ্রগতি কিংবা আর কোন আসামীকে গ্রেফতার করতে পারেনি। এদিকে সম্প্রতি কোরপাই এলাকায় একটি স্কুল ছাত্র হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। ওই হত্যার প্রধান আসামী সুমন, মূল পরিকল্পনাকারী বাশারকে গ্রেফতার করে ৬ দিনের মাথায় হত্যার মূল রহস্য উদঘাটন করে পুলিশ। স্থানীয় লোকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, খুন হওয়া মাসুদের মৃত্যুর আগে সুমনের সাথে জমি ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে মোটা অংকের টাকা পয়সার লেনদেন ছিল এবং মাসুদের ব্যবসা বাবদ বিভিন্ন স্থানে যে টাকা পাওনা ছিল তা সবকিছু জানত সুমন। তাই মাসুদ হত্যার সাথে সুমনের সংস্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মাসুদ ব্যবসা পরিচালনা করার সময় বিভিন্ন লোকজনের কাছে টাকা পাওনা থাকলেও তাঁর মৃত্যুরপর একটি টাকাও কোন ব্যাক্তি দিয়ে যায়নি। বরং কিছু পাওনাদার টাকা নিতে আসেছিল।
অন্যদিকে নিহত মাসুদের বড় ভাই মফিজুল ইসলাম বিএনপির রাজনীতির সাথে সক্রিয় ভাবে জড়িত। কোরপাই এলাকাসহ ওই ইউনিয়নে বিএনপির রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তাই প্রতিপক্ষ তাকে রাজনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করার জন্য এ হত্যাকান্ড ঘটতে পারে বলেও স্থানীয়দের ধারনা। সব মিলিয়ে দীর্ঘ ৫ মাসেও চাঞ্চ্যলকর এ হত্যাকান্ডের কোন প্রকার অগ্রগতি না হওয়ায় আইনের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। বরং মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে এপর্যন্ত মাসুদের পরিবারের প্রায় ৫০ হাজরের মত টাকা খরচ হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বুড়িচং থানা অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) মোঃ নেয়ামূল শাফী খানের সাথে মোবাইল ফোনে আলাপকালে তিনি জানান, হত্যাকান্ডের ঘটনাস্থল থেকে আটক হওয়া আসামী এখন পর্যন্ত জেল হাজতে আছে। তার স্বীকারোক্তি উপর ভিত্তি করে মামলার বাকী আসামীদের গ্রেফতারের চেষ্ঠা চলছে। তবে আসামীরা পলাতক হওয়ায় গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply