আজও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি স্কুল শিক্ষক মোবারক উল্লাহ

আকবর হোসেন :–

মনোহরগঞ্জ উপজেলার হাসনাবাদ ইউনিয়নের রামদেবপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৫০ সালের ১০ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোবারক উল্লাহ বি.কম, বি.এড। তিনি রামদেবপুর পাটোয়ারী বাড়ির মৃত এবাদ উল্লাহর পুত্র। একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে সুনামের সাথে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশকে স্বাধীন করেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি আজও পাননি এই অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক।
তিনি ১৯৬৬ সালে মনোহরগঞ্জের পোমগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পাশ করেছেন। ১৯৬৮ সালে নোয়াখালীর চাটখিল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেছেন। ওই সময় চাটখিল সরকারি কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন তিনি। এরপর ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.কম পাশ করেন এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৬-৭৭ সেশনে বি.এড করেন।
এদিকে তিনি ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে হাসনাবাদের আলীনকিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ৮ বছর সুনামের সাথে শিক্ষকতা করেন। ১৯৭৯ সাল থেকে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। তারপর ১৯৮৩ এর শেষের দিক থেকে ২০১০ সালের ৯ আগস্ট পর্যন্ত সুনামের সাথে প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়াও বর্ধিত চাকরিতে ছিলেন পরবর্তী সময় থেকে ৬ আগস্ট ২০১৩ সাল পর্যন্ত। একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে নিজের দায়িত্ব পালন ও একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ সম্পর্কে কিছুদিন আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোবারক উল্লাহর সাথে কথা বললে তিনি মনোহরগঞ্জ বার্তাকে জানান, আমি একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও স্বীকৃতি পাইনি। ১৯৭১ সালে আমি তৎকালীন লাকসাম উপজেলার ২ নং সেক্টরের হাসনাবাদের জহিরুল হক পাটোয়ারী ও বিএম কলিমুল্লার নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। এরপর দেশরক্ষা বিভাগ স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদ দেন আমাকে। সে সময় অধিনায়ক আতাউল গনী ওসমানী আমার হাতে এই সনদ তুলে দেন। তারপর তৎকালীন সাপ্তাহিক মুক্তিবার্তা পত্রিকার তৃতীয় বর্ষের ৪৫তম সংখ্যায় ৭ অক্টোবর ২০০০ সালে, বাংলা ১৪০৭ খ্রিষ্টাব্দের আশ্বিন মাসের ২২ তারিখ শনিবার আমার নাম ও সিরিয়াল প্রকাশিত হয়, যার নং- ০২০৪০৭০৫০৪। আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও আমাকে কর্মঠ দেখে বাংলাদেশ গণপরিষদ থেকে এএম আহম্মদ খালেক এমসিএ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করায় একটি সার্টিফিকেট দেন। এছাড়াও তিনি আমার কার্যক্রম ভালো দেখে আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে ইংরেজিতে একটি চিঠি দেন আমার ঠিকানায়। সেগুলোর সকল কাগজপত্র আমার কাছে প্রমাণ হিসেবে আছে। আমি শিক্ষকতার পেশায় নিযুক্ত থাকায় ২০০৪ সালের এইচ.এস.সি পরীক্ষার কেন্দ্রের হল সুপারের দায়িত্ব পালন করার কারণে যেদিন লাকসামে মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাইকরণ মিটিং হয়েছিল আমি সেদিন যেতে পারিনি। সেসময় আমি তাদেরকে খবর পাঠিয়েছি যে আমি পরীক্ষার দায়িত্বে থাকার কারণে আসতে পারছি না। কিন্তু গেজেটে অনুপস্থিত দেখিয়ে আমাকে কোনো সার্টিফিকেট দেয়া হয়নি। এরপর যে যেভাবে বলেছে আমি সেভাবে শুনেছি। যেখানে যেতে বলেছে সেখানে গিয়েছি। অনেক টাকা খরচ করেছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট ও ভাতা পাইনি। বর্তমানে শিক্ষকতার পেশা থেকে অবসরে চলে এসেছি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যুদ্ধ করে শত্র“দেরকে হারিয়ে জীবন যুদ্ধে আমি পরাজিত। সার্টিফিকেট না থাকায় সরকারি ভাতা পাই না। বর্তমানে আমি আমার পরিবার পরিজন নিয়ে এক প্রকার মানবেতর জীবনযাপন করছি।
শিক্ষকতা ও স্কুল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান অনেক কষ্ট করে অনেক মানুষের কাছে গিয়ে তাদের আন্তরিকতা ও সহযোগিতায় আলীনকিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য সম্পত্তি ক্রয় করেছি। আমি আমার কর্মজীবনে কোনো ছাত্রছাত্রীর ক্ষতি করিনি। এই বিদ্যালয়ের সুখ-দুঃখের সাথী ছিলাম। একটানা অনেক বছর এবিদ্যালয়ে চাকরি করেছি। অনেক স্মৃতি মনে করলে চোখে পানি চলে আসে। শিক্ষক হচ্ছে আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগর। আমার হাতের উপর দিয়ে অনেক ছাত্রছাত্রী মানুষ করেছি। আমার কর্মজীবনে যারা সহকারী শিক্ষক ছিল তারা সবাই আমাকে যেকোনো ব্যাপারে সর্বোচ্চ সহযোগিতা ও আন্তরিকতা দেখাতেন। বর্তমানে আমাকে স্কুলে কোনো কাজে ডাকলে আমি তাদের ডাকে সাড়া দেই, সুপরামর্শ ও সহযোগিতা করি। আমি সব সময় ছাত্রছাত্রীদের বলতাম ‘নিজের জন্য যে কাজ তুমি করবে না, সেটা অন্যের জন্যও তুমি করবে না।’ সব সময় সৎ আদর্শ ও ন্যায়ের পথে থাকতে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা দিয়েছি।
২০১২ সালে কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ড থেকে মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখার জন্য সুবর্ণ জয়ন্তীতে সম্মাননা স্মারক পেয়েছি। আমার একান্ত ইচ্ছা ছিল আলীনকিপুর উচ্চ বিদ্যালয়কে একটি কলেজে রূপান্তরিত করার। এখন যারা দায়িত্ব আছেন তারা যদি সকলে চেষ্টা করেন তাহলে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। কলেজ হলে আমার মনের আশা পূর্ণ হবে।
আমি বর্তমানে এ হাকিম দাখিল মাদ্রাসার সভাপতির দায়িত্বে আছি। আমি একসময় ছাত্রলীগ করেছি, বর্তমানে আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত আছি। বীরমুক্তিযোদ্ধা মাস্টার মোবারক উল্লাহর ব্যাপারে কথা বললে মনোহরগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল আজিজ জানান, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হলেও গেজেটে নাম না থাকায় অনেকে সরকারি ভাতা পাচ্ছেন না। গেজেটভুক্ত হওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে তাদের আবেদন করার জন্য বলা হয়েছে। আবার যাচাই-বাছাই করার পর গেজেটভুক্ত হলে তারা ভাতা পাবেন।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply