কোরবাণী করি প্রিয় বস্তু

–তিতাস রহমান

কোরবাণী অর্থ হল আত্বত্যাগ। শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে বিশেষ কয়েকটি দিনে বিশেষ পদ্ধতিতে কতিপয় চতুস্পদ প্রাণী জবেহ্ করাকে কোরবাণী বলা হয়। নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক বা যে ব্যক্তির উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব সে ব্যক্তির উপর কুরবাণী করা ওয়াজিব। জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ সকাল হতে ১২ তারিখ সুর্যাস্ত পর্যন্ত কোরবাণী করা যায়। কোরবাণী আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি অন্যতম পদ্ধতি। আর এটা আল্লাহ তায়ালার কাছে খুবই প্রিয়। তাইতো প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) বলেছেন- “কোরবাণীর পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা এক একটি নেকী দিয়ে থাকেন”।
কোরবাণীর ইতিহাস এটা কোন নতুন ইতিহাস নয়। বরং প্রাচীন কাল তথা পৃথিবীতে মানব পদার্পণের পর হতে এ কোরবাণীর প্রচলন শুরু হয় তবে অদ্ভুদ নিয়মের। তাদের কোরবাণীর ক্ষেত্রে যে কোন জিনিসই দিতে পারত এবং তাদের কোরবাণী কবুল হওয়া না হওয়া সবই ছিল প্রকাশ্য অর্থাৎ তাদের কোরবাণী গ্রহণযোগ্য হলে আকাশ হতে অগ্নি এসে তাকে ভস্মিভূত করে ফেলত। আর যদি অগ্রাহ্য হবে তবে এটা সেভাবেই পড়ে থাকত। পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম কোরবাণী করেছেন হাবীল ও কাবীল, তাদের কোরবাণীর কারণ ছিল একটি নারী। হযরত আদম(আ) শরীয়তে ভাই বোনের মধ্যে বিবাহ বৈধ ছিল। তখন মা হাওয়া(আ) এক সাথে দুটি নবজাতককে জন্ম দিতেন। যার একটি হত মেয়ে আর অপরটি ছেলে এবং হযরত আদম(আ) এর প্রথম জন্ম নেওয়া মেয়েকে দ্বিতীয়বার জন্ম নেওয়া ছেলের সাথে বিবাহ দিতেন। দ্বিতীয়বার জন্ম নেয়া মেয়েকে প্রথমবার জন্ম নেয়া ছেলের সাথে বিবাহ দিতেন। এই নিয়মেই চলতে লাগল বহুদিন। বাধ সাধল হাবীল ও কাবীলের বেলায়।
কাবীলের সাথে জন্ম গ্রহন কারীণি মেয়েটি ছিল খুব রুপবতী সুন্দরী, আর হাবীলের সাথে জন্ম গ্রহনকারী মেয়েটি ছিল খুব কুৎসিত ও কাল। তাদের বিবাহের সময় এগিয়ে আসলে হযরত আদম(আ) পূর্বের নিয়ম অনুসারে বিবাহ দেওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। কিন্তু কাবিল এতে অসম্মতি জ্ঞাপন করল ও জেদ করে ফেলল যে, সে তার নিজের বোনকে বিবাহ করবেন। এই দাবিতেই অটল, হযরত আদম(আ) তাদেরকে এই বিষয়ে মীমাংসা করার জন্য কোরবাণী করার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন যার কোরবাণী কবুল হবে তাকেই এ রুপবতী সুন্দরী পাত্রীর বিবাহ দেওয়া হবে। হাবিল ছিল মেষ পালক। সে তার মেষের পাল হতে সবচেয়ে উত্তম ও প্রিয় মেষটি আল্লাহর রাহে কোরবাণী করলেন। আর কাবিল ছিল কৃষিজীবি। সে কিছু শস্যদানা আল্লাহর রাহে কোরবাণী করলেন। দেখা গেল আকাশ হতে অগ্নি কাবিলের কোরবাণীকে ভস্মিভূত করে দিলেন। আর হাবিলের কোরবাণী এমনিতেই পড়ে থাকতে দেখে কাবিল হাবিলকে হত্যা করল এবং পৃথিবীর বুকে সর্ব প্রথম রক্তপাত এর সূচনা করল। তাইতো পৃথিবীতে যত হত্যাকান্ঠ সংঘটিত হবে তার একাংশ কাবিলের আমল নামায়ও লিপিবদ্ধ করা হবে। কোরবাণীর এ পদ্ধতি চলছিল বহু দিন। যুগ এল ইব্রাহীম খলীলুল্লাহর(আ), ইসমাঈল জীবহুল্লাহর(আ)। আর তাদের মাধ্যমেই প্রচলন হল বর্তমান যুগের এ কোরবাণী। তাদের মাধ্যমেই আল্লাহ্ তায়ালা রহিত করে দিলেন আদি যুগ হতে চলে আসা কোরবাণীর সে পুরনো রীতি। অবৈধ করা হল চতুস্পদ প্রাণী ছাড়া অন্য আর কোন জিনিস বা বস্তু কোরবাণী করা। আরও রহিত করা হল কোরবাণী কবুল হওয়া না হওয়ার চাক্ষুস রীতি নীতিকে। আর কার কোরবাণী কবুল হল আর কার কোরবাণী কবুল না হল তা একবারেই গোপন করে রাখা হল তাইতো পবিত্র কুরআন পাকে আল্লাহ্ তায়ালা ঘোষণা করেন-“লাইয়া না লাল্লাহা লুহুমুহা ওয়ালা দিমা ওয়া ওয়ালা ইয়ানালুহুত তাক্ওয়া মিনকুম” অর্থাৎ-আল্লাহর কাছে পৌঁছে না তোমাদের কোরবাণী কৃত বস্তুর গোশত্ বা রক্ত, তবে তোমাদের তাকওয়া বা খোদা ভীতিই আল্লাহর কাছে পৌঁছে।
হযরত ইব্রাহীম(আ)কে আল্লাহ্ তায়ালা বহুভাবে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করার পর খলীলুল্লাহ উপাধীতে ভূষিত করে ছিলেন। আর আমাদের প্রচলিত নিয়মের কোরবাণী চালু করার ক্ষেত্রেও তিনি এক মহা অগ্নি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন।
হযরত ইব্রাহীম(আ) আশি বছর বয়সে একটি সন্তান প্রাপ্ত হন। সোহাগ করে তার নাম রাখলেন ইসমাঈল। আনন্দে আহ্লাদে শিশু ইসমাঈলকে কোলে নিয়ে জীবনটা কাটাবেন ভাবছিলেন হযরত ইব্রাহীম(আ)। অমনিতেই ঐশী নির্দেশ এল তুমি তাকে তার মাসহ রেখে আস মক্কার জনমানবহীন বালুকাময় প্রান্তরে। ঐশী নির্দেশের তাবেদার, মাহ্বুবে ইলাহীর জন্য কোরবাণী হযরত ইব্রাহীম(আ) নির্দেশ পাওয়া মাত্রই অশ্রুসিক্ত নয়নে তাদেরকে নির্বাসনে রেখে আসলেন মক্কার বালুকাময় মরু প্রান্তরে। ধীরে ধীরে শিশু ইসমাঈল বড় হতে লাগলেন। বাবা মাঝে মধ্যে গিয়ে তাদেরকে এক নজর দেখে আসেন। এমনতিই কেটে গেল বহু দিন।
দিন যায় রাত আসে মাস যায় বছর আগমন করে। এমনিভাবে তের বছর অতিবাহিত হল। আল্লাহ্ তায়ালা হযরত ইব্রাহীম(আ) কে নির্দেশ দিলেন স্বীয় প্রিয় বস্তুকে কোরবাণী করতে। তিনি কোরবাণী করলেন একশত বকরী। কিন্তু কবুল হল না। আবারও একশত দুম্বা, কিন্তু এবারও নয়। পুনরায় খাবে নির্দেশ দেয়া হল কোরবাণী করার। তিনি এবার কোরবাণী করলেন একশত উট। এবারও হল না। বরং নির্দেশ এল তুমি তোমার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কুরবাণী কর! ঐশী প্রেমে উম্মাদ হযরত ইব্রাহীম(আ) এর আর বুঝতে বিলম্ব হল না। তিনি বুঝে ফেললেন আল্লাহ্ তায়ালা তার প্রিয় বস্তু কলিজার টুকরা ইসমাঈলকেই তার রাহে কোরবাণী করার আদেশ করেছেন। তিনি স্বীয় পুত্রকে সাজিয়ে নিয়ে রওয়ানা হলেন কোরবাণী গাহে। পথিমধ্যে শয়তান সাধুর বেশে হযরত ইব্রাহীম(আ) কে ধোকা দেওয়ার ফন্দি করল। একে একে তিনবার হযরত ইব্রাহীম(আ) শয়তানকে তাড়িয়ে দিলেন। যে স্থানে হযরত ইব্রাহীম(আ) শয়তানকে পাথর মেরেছেন তাইতো সে স্মৃতিকে উম্মতের জন্য আল্লাহ্ তায়ালা হাজীদের জন্য সেই স্থানে কংকর নিক্ষেপকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন। যা হোক তারা পৌঁছে গেলেন কোরবাণীর গাহে। এরপর আদর ¯েœহের পরশ বুলিয়ে প্রিয় সন্তানকে সকল ঘটনা খুলে বললেন। খলীলুল্লাহর সন্তান তো খলীলুল্লাহ্ই হবেন।
ঘটনা শ্রবণ মাত্রই বলে ফেললেন, আব্বা হুজুর, আপনি এতে বিচলিত হবেন না। আল্লাহ্ তায়ালার রাহে কোরবাণী হওয়াতো সৌভাগ্যের ব্যাপার। আপনি ধৈর্যশীলের পরিচয় দিয়ে আমাকে কোরবাণী করবেন।
হে আব্বা হুজুর! আমাকে ভালভাবে বেঁধে নিন যাতে আমার হাত-পা আপনার গায়ে না লাগে, রক্ত আপনার শরীরে না লাগে। আর আমার চোখ বেঁধে নিবেন যেন আমার চোখে তাকিয়ে আপনি মায়ার বশবর্তী হয়ে এ কাজ হতে বিরতও থেকে যেতে পারেন।
হযরত ইব্রাহীম(আ) পুত্রের কথাগুলো শুনে আল্লাহর সন্তুটি লাভের জন্য সকল কাজ সমাধা করে তাকে জবাই করার উদ্যোগ নিলেন। নিন্তু, ইসমাইঈল(আ) এর গলা কাটতে পারলেন না। একে একে তিনবার তিনি চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন। আর তখনই আকাশ হতে গাইবী আওয়াজ ভেসে এল হে-ইব্রাহীম!! তুমি তোমার পরীক্ষায় সফলতার সহিত উত্তীর্ণ হয়েছ। তুমি তোমার আদরের দুলালকে আমার রাহে কোরবাণী করার মানসে ছুরি চালালে কিন্তু তাকে হত্যার অভিপ্রায় তো ছিল কেবল হযরত ইব্রাহীম(আ) কে পরীক্ষা করা মাত্র, তুমি তোমার সন্তানকে বুকে তুলে নাও। আর সন্তানের বিনিময়ে বেহেশত হতে প্রেরিত দুম্বাকে তুমি জবেহ্ কর। আর তোমার পরবর্তী উম্মদের জন্য এই হুকুমকে (কোরবাণী) কে অবধারিত করলাম আর সে থেকেই কোরবাণীর এই প্রচলন চলে আসছে, যাহা কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ লাকবে। আল্লাহ্ তায়ালা যেন আমাদের সকল মুসলিম জাতীকে সহি শুদ্ধভাবে কোরবাণীর নেক আমলগুলি পালন করা তৌফিক দান করেন। আমীন!!

================================
লেখকঃ তিতাস রহমান, গবেষক ও কলামিষ্ট।
E-mail : titas_rahman80@yahoo.com
তারিখ : ০৭ জিলহজ্জ-১৪৩৫ হিজরী
১৮আশি^ন১৪২১ বাংলা
০৩নভেম্বর-২০১৪ ইং।

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply