দেবিদ্বারে ইউপি চেয়ারম্যানের কান্ড!

মোঃ আক্তার হোসেন :–

কুমিল্লার দেবিদ্বারে চুরির অভিযোগে প্রতিবেশী এক যুবককে অমানবিক শারিরীক নির্যাতন শেষে মাথা ন্যাড়া করে পুলিশে সোপর্দ করেছে এক ইউপি চেয়ারম্যান। ঘটনাটি ঘটে বুধবার বিকেলে দেবিদ্বার উপজেলার ৯নং গুনাইঘর উত্তর ইউনিয়ন’র গুনাইঘর গ্রামে চেয়ারম্যানের অস্থায়ী কার্যালয়ে।
স্থানীয়রা জানান, বুধবার বিকালে উপজেলার গুনাইঘর গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম’র পুত্র মনিরুল ইসলাম(২৮) দেবিদ্বার পৌরসভার অফিস সংলগ্ন গুনাইঘর ইউপি চেয়ারম্যান’র অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে দিয়ে যাওয়ার পথে ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ খোরশেদ আলম’র নির্দেশে চৌকিদার জাহাঙ্গীর আলম ওই যুবককে চুরির অভিযোগে আটক করে এবং চেয়ারম্যানের অস্থায়ী কার্যালয় নিয়ে যায়। ওখানে চেয়ারের সাথে হাত-পা বেঁেধ তার উপর মধ্যযুগীয় কায়দায় চলে অমানবিক শারিরীক নির্যাতন। অস্থায়ী কার্যালয়ের পাশেই রয়েছে রোজ গার্ডেন স্কুল।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, স্কুলটিকে দির্ঘদিন যাবত চেয়াম্যান তার টর্চার সেল হিসেবে ব্যাবহার করে আসছে। এলাকার যে কোন ধরনের সালিস/ বৈঠকের রায়ে অপরাধীদের শাস্তি ওই স্কুলে কার্যকর করা হয়ে থাকে। প্রভাবশালী ওই চেয়ারম্যানের এসব কর্মকান্ডের প্রতিবাদের সাহস কেউ না করায় নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। স্থানীয় একাধিক ব্যাক্তি জানান মনিরুল এক জন ছিচকে চোর।
বর্বরোচিত ওই নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরতে যেয়ে চুরির অভিযোগে আটক মনিরুল ইসলামের দাদী সাজিয়া বেগম(৬৫) জানান, তার নাতীকে একটি চেয়ারের সাথে দু’হাত বেঁধে, বাঁশ দিয়ে পায়ের উপর চাঁপ দিয়ে লাঠি পেটায় মারাত্মক আহত করে। শারিরীক নির্যাতনের এক পর্যায়ে চেয়ারম্যান খোরশেদ আলমের নির্দেশে তার মাথা ন্যাড়া করে কোমরে রশি বেঁেধ জনসম্মুখে ঘুরিয়ে চৌকিদার জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে কয়েকজন চৌকিদার দিয়ে মনিরুলকে থানায় সোপর্দ করেন। দাদী আরো জানান, চেয়ারম্যানের পায়ে ধরে নির্যাতন বন্ধ করতে অনুরোধ করলে উল্টো পরিবারের সবাইকে চুরির মামলায় আসামী করার হুমকী দেন। তিনি জানান, মনিরুলের হাতের আঙ্গুল ছেচে দেয়াই নয়, ব্লেড দিয়ে মাথার বিভিন্ন অংশ কেটে দেয়।
পুলিশ আহত মনিরুল ইসলামের শারিরীক অবস্থার অবনতি দেখে রাতেই দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন। বৃহস্পতিবার সকালে থানায় নাপিত ডেকে এনে তার এলো মেলো ও বিকৃত অর্ধ ন্যাড়া মাথার পুরোটার চুল পরিস্কার করিয়ে দেন।
এলাকার লোকজন চেয়ারম্যানের একচ্ছত্র আধিপত্ব ও নির্যাতনে ক্ষুব্ধ হলেও মুখ খুলতে সাহস পাননা কেউ। কারন, যে তার বিরুদ্ধে যাবে তাকেই নির্যাতন ভোগই নয়, মিথ্যা মামলায়ও হয়রানীর শিকার হতে হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার একাধিক ব্যাক্তি জানান, টর্চার সেলে লোকজন ধরে এনে মারধোর, পারিবারিক বা জমিসংক্রান্ত বিরোধসহ নানা কারনে অভিযুক্তদের সালিসের মাধ্যমে জরিমানা, শারিরীক নির্যাতন এমনকি নারীদের দেহভোগ সহ নানা অনৈতিক কাজ করা হয়। জরিমামার টাকাও ভোক্তভোগীদের না দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। এছাড়াও সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক পরিবারের জমি দখল করারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমান রোজ গার্ডেন স্কুল ও তার অস্থায়ী অফিস কার্যালয়’র জমি ও মার্কেট হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছ থেকে জোর পূর্বক বেদখল করে নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির তদন্তেই সব সত্য বেড়িয়ে আসবে।
এব্যপারে উপজেলার ৯নং গুনাইঘর উত্তর ইউনিয়ন’র চেয়ারম্যান মোঃ খোরশেদ আলম’র সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমার কোন টর্চার সেল নেই, অপরাধ দমনে কাজ করি তাই প্রতিপক্ষ ঈর্ষান্বিত হয়ে আমার বিরুদ্ধাচারণ করছে। আমি অভিযুক্ত চোর মনিরুল ইসলামকে ধরে এনে শাস্তি দেই নাই, তাকে গ্রামবাসীরা চুরির অভিযোগে গণপিটুনি দিয়ে এবং মাথা ন্যাড়া করে আমার কাছে হাজির করেছে। আমি তাকে চৌকিদার দিয়ে থানায় পাঠাই, তার শারিরীক অবস্থার অবনতি দেখে থানায় রাখতে চায়নি, আমি ওসিকে বলে রেখেছি। এর আগে মনিরুলের সীমাহীন চুরির অবিযোগে গ্রামবাসী অতিষ্ট হয়ে উঠে। মনিরুলকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য ৫হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষনাও দিয়েছিলাম।
অভিযুক্ত মোঃ মনিরুল ইসলাম জানান, আমি কোম্পানীগঞ্জ বাজারে চটপটি ব্যবসা করি সকালে যাই রাতে আসি। চেয়াম্যান অফিসের সামনে দিয়েই আমার যাতায়াত। আমাকে ধরার জন্য ৫হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষনা দেয়ার বিষয়টি সাজানো।
দেবিদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি) মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, চোর ধরলে কিংবা চোরের শাস্তি নিশ্চিত করনে পুলিশ প্রশাসন ও বিচার বিভাগ রয়েছে,অন্য কারোর নয়। মাথা ন্যাড়া করে দেয়ার বিষয়টি মানবাধিকার লঙ্ঘিত কাজ। আটককৃত মনিরুলকে বৃহস্পতিবার বিকেলে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।

এব্যাপারে দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হোসেন জানান, বিষয়টি নিয়ে কেউ অভিযোগ করেনি। চোরের বিচার আইনানুগ ভাবেই হবে। তার জন্য প্রশাসন রয়েছে। মাথা ন্যাড়া করে কোমড়ে রশি বেঁেধ প্রকাশে জনসম্মূখে ঘুড়িয়ে শাস্তি দেয়া মানবাধিকারের লঙ্ঘন। বিষয়টি তদন্ত স্বাপেক্ষে আইনানুগ ব্যাবস্থা নেবেন বলেও তিনি জানান।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply