জীবন-যুদ্ধ

—–মোঃ জালাল উদ্দিন

“আজ হাটের দিন। খোরাকীর টাকা দিবেন না স্যার? নইলে যে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে উপোস থাকতে হবে স্যার” বলেই উৎসুক দৃষ্টিতে কালো লোকটা আমির হোসেনের মুখের দিকে তাকিয়ে রহিল। আমির হোসেন আশ্বাস দিয়ে পাশের অফিস কক্ষে ফিরে এলো।

কিছুক্ষণ সে অলসভাবে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রহিল। “স্যার” কথাটি আজ তার জীবনের ভুলে যাওয়া সব দুঃখকে স্মরণ করিয়ে দিলো। জীবনে তার বড় সাধ ছিলো । সে অনেক লেখা-পড়া করবে, একদিন শিক্ষক হবে; ছাত্ররা তাকে “স্যার” বলে ডাকবে। কিন্তু কলেজ জীবনেই পিতা বিদায় নিলেন চির-বাসস্থানের সন্ধানে। তাঁর অকষ্মাৎ বিদায় তার জীবনের সকল আশা-আকাঙ্খাকে চিরতরে নস্যাৎ করে দিলো। বৃদ্ধ পিতা জীবনের শেষ মূহুর্তটা পর্যন্ত দিন-মজুরী করে তাকে অতটুকু পর্যন্ত লেখা-পড়া করিয়েছেন; সে তার প্রতিদান কিছুই তাকে দিতে পারেনি। এটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনা।

সংসারে তার অনেক দায়িত্ব রয়েছে। সংসারে সবার বড়। চাকুরী তার ভীষণ প্রয়োজন। কিন্তু সরকারী নিয়োগ বন্ধ দু দু‘টি বছর। তাই বেকারত্ব আর সংসারের দায়িত্বের বোঝা তাকে আরো ভারাক্রান্ত করে তুললো। কিছুদিন টিউশনী করলো। অবশেষে কন্ট্রাক্টরের আন্ডারে আজকের এই চাকুরী পেলো। দায়িত্ব সাইটের মালামাল ও শ্রমিকদের কাজ দেখা-শুনা করা, শ্রমিকদের দ্বারা ইট-পাথর ভাঙ্গানো, হিসেব রাখা এবং প্রয়োজনে অন্যত্র মালামাল পাঠানো ইত্যাদি, ইত্যাদি।

তাই সে আজ “স্যার” হতে পারে না। যিনি সত্যিই স্যার, তিনি উপযুক্ত সম্মান পান না। কারো আন্ডারে কাজ করলে তাকে “স্যার” বলতে হবে, নতুবা তাদের কাজ থাকবে না; উপরন্তু জেল-হাজতে দিন কাটাতে হবে। এ শিক্ষাটুকু এ সকল নিরীহ, নিস্পাপ মানুষগুলো এ সমাজ থেকেই শিখেছে। বিশ্ব বিদ্যালয়ের জনৈক ছাত্র উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে স্যার না বলে ভাই বলায় যে একদিন হাজতে বাস করেছিলো, তাতো জাতীয় দৈনিক পত্রিকাই সাক্ষ্য দিয়েছে। এক সময় তার ইচ্ছে হয় প্রতিবাদ করতে। “আপনারা আমাকে ‘স্যার’ বলে ডাকবেন না। আমি ‘স্যার’ হতে পারিনি। আমি আপনাদের ভাই, আপনাদের সন্তান।”

এমনি হাজারো ভাবনা আর অপ্রকাশ্য এক বেদনা তার হৃদয়ে বিশাল সমুদ্র-তরঙ্গের মত আছাড় খেয়ে পড়তেছে। সে ভাবে কী দুঃসহ এই জৈষ্ঠ্যের খর-রোদ্রে বসে লোকগুলো পাথর ভাঙ্গে! পরক্ষণেই আবার বৃষ্টিতে ভিজে , কার্গো আনলোড করে। শিশু-যুবা, বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাও বাঁচার তাগিদে এই কঠোরতম সংগ্রামেরত। লেখা-পড়া করার মত কচি হাতগুলোতে ফোস্কা পড়ে জল-বসন্তের মত জল্ জল্ করছে। কারো হাতগুলো কড় পড়ে একবারে পাথর গয়ে গেছে। আবার কারো হাত কিংবা পা ছেঁচে যায় হাতুড়ী আর পাথরের আঘাতে। কখনো বা পাথর খন্ড কিংবা হাতুড়ী ভাঙ্গার ক্ষুদ্র লৌহ টুকরো বুলেটের মত শরীরের কোন এক স্থান বিদ্ধ করে দেয়। তখন রক্ত ঝরে পড়ে পাষাণ পাথরের গায়ে। হায়রে, পাথুরে জীবন! দুঃখ আর কাকে বলে!! এ রকম রক্ত-ঝরা পয়সাও আবার মেরে দেয় কোন কোন পাষাণ হৃদয়। তাই আমির আজ নিজের কাছে নিজে অপরাধী। কারণ, এ রকমই এক শোষক শ্রেণীর আন্ডারে চাকুরী করে সে। আর এ অপরাধ বোধটুকুই আজ তাকে অহরহ কুড়েঁ কুড়েঁ খায়Ñ জীবনের অবসর মূহুর্তগুলোকেও বিষন্নতায় ভরে দেয়।
কিছুক্ষণ পর লোকটা অফিসে আসল। “স্যার, টাকার জন্যে আসলাম। আজ কিছু টাকা বাড়িয়ে দেন স্যার। ছোট্ট বাচ্চাটার অসুখ ঔষধ নিতে হবে। আগামী হাটে না হয় কম নেব।” লোকটার কথায় হঠাৎ আমিরের চিন্তায় ছেদ পড়ে। কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর নির্বাক থেকেই তাকে কিছু টাকা দিয়ে তার হাতের নোট বুকে টুকে দেয়। লোকটা টাকা নিয়ে চলে গেলো।

লোকটার নাম মানিক। তবে ইহা তার আসল নাম নয়। আমিরের নামে নামে লোকটার নাম। মুখ-মন্ডল গোলাকার। বয়স আমিরের চেয়ে ১০/১২ বছরের বড় হবে। ছিপছিপে শরীর। চুলগুলো কোকঁড়ানো। বাড়ি বরিশাল। পাশেই পাথর ভাঙ্গছে তার স্ত্রী রেহানা আক্তার। বর্তমানে সে তিন তিনটে ছেলেমেয়ের মা। এই কচি মুখগুলোতে এক মুঠো অন্ন তুলে দেবার জন্যেই আজ দাউদকান্দি ঘাটে পাথর ভাঙ্গছে স্বামী-স্ত্রী দুজনে। উভয়ের চেহারায় বিষন্নতার ছাপ সুস্পষ্ট। বর্ষার আকাশের মত নীরব-নিস্তব্ধ দুটি প্রাণ। অন্যান্য শ্রমিকদের মত অপ্রয়োজনে কোন কথা বলতে আমির কখনো দেখেনি দেখেছে শুধু নীরবতা। এই নীরবতার মাঝে পাথরে আঘাতের প্রতিটি শব্দ যেন আজ তাদের হৃদয়ের অব্যক্ত বেদনাই প্রকাশ করছে।

যেদিন নীরবতার সব রহস্য উম্মোচিত হলো, সেদিন আমিরের অন্তরটা দুঃখে-বেদনায়-ক্ষোভে হঠাৎ কেঁপে উঠলো। ঐ দু‘টি নাম যখন সে তার হিসেবের খাতায় শ্রমিকদের নামের তালিকায় লিপিবদ্ধ করে, তখন তার লেখনীটা র্থ র্থ করে কেঁপে উঠে। অনেক সময় কয়েক ফোঁটা অশ্র“ নীরবে তার গন্ড বেয়ে পড়ে।

মানিক অশিক্ষিত নয়, এমনকি তার স্ত্রীও নয়। আজ থেকে প্রায় ৭/৮ বছর পূর্বেই বি,এ পাশ করে সে সরকারী চাকুরী পেয়েছিলো। কিন্তু আজকের এই সমাজে সৎ থেকে চাকুরী বাঁচানো বড়ই কষ্টকর। তাই তার বেলায়ও ব্যতিক্রম হয়নি। সততাই তার চাকুরীচ্যূতির প্রধান কারণ। তারপর এই শোষক সমাজে কোথাও তার কর্মসংস্থান হলো না। বর্তমানে সহায়-সম্পত্তি বলতে যা বুঝায়, তা শূণ্যের কোঠায়। এককালে যৎসামান্য যা ছিলো, তা তার পেছনেই ব্যয় করে গেছেন তার পরলোকগত পিতামাতা। তার স্ত্রী রেহানার স্বর্ণালঙ্কার যা কিছু ছিলো, তা-ও সে হাতছাড়া করে ফেলেছে। অবশেষে অন্যোন্যপায় হয়ে আজ সে এই পথ বেছে নিয়েছে।

সারাদিন হাড়-ভাঙ্গা খাটুনী আর রাত্রে দু একটি টিউশনী করেই মানিকের দিনরাত কেটে যায়। আজ তার ভবিষ্যত বলতে কিছু নেইÑআছে শুধু তিন তিনটে ছেলেমেয়েকে মানুষ করার স্বপ্ন। রেহানাও বসে নেই। সে স্বামীর সঙ্গিনী হয়ে কোমল হাতে হাতুড়ী তুলে নিয়েছে। সে সুখে-দুঃখে সব সময় স্বামীর সঙ্গিনী ছিলো, আজও আছে। এতে মানিকের দুঃখটা অনেকটা হাল্কা হয়। যেমন স্বামী, তেমন স্ত্রীÑ একেবারে সোনায়-সোহাগা।

আমির ভাবে রেহানা এই শোষক সমাজের নারী নয়। সে ধৈর্য্যশীলা, বিনয়িনী, স্বামীভক্তা এক মহিয়ষী রমনী। নইলে সে আজ সবকিছু বিসর্জন দিয়ে জীবনের এই কঠোরতম পথে স্বামী সঙ্গিনী হতো না। তাই এদিক দিয়ে মানিক সুখী। কোন দুঃখ-কষ্টই আজ তাকে বিভ্রান্ত করতে পারে না। জীবনের সব পরাজয়কে ওঁরা নীরবে বরণ করে নিয়েছে।

আমির মানিকের জীবনের মাঝে তার জীবনের সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছে। তাই সে মাঝে মাঝে ভেবে ব্যাকুল হয়। তখন সে বারবার কেসেট ঘুরিয়ে ওই গানটা শুনেÑ “জীবন তো কিছু নয় বন্ধু, জন্ম নেয়াই যেন অপরাধ………”

আমিরের যন্ত্রণাটা তখন অনেকটা লঘু হয়। এইভাবে দিন যায়, রাত আসেÑ রাত যায়, আবার দিন আসে। হয়তঃ একদিন পরাজয়ের গ্লানি নিয়েই এই নিরীহ, নিস্পাপ, শোষিত মানব-মানবীগুলো প্রকৃতির কোলে ঘুমিয়ে যাবে।

=========================================
লেখক : মোঃ জালাল উদ্দিন
গ্রাম : বড়ইয়াকুড়ি, পোঃ জাহাপুর
উপজেলা : মুরাদনগর, জেলা : কুমিল্লা।
মোবাইল নম্বর : ০১৮১৯-৬০৩৮০২
ই-মেইল : jalal307@gmail.com

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply