ইতিহাসের স্পর্ধিত অভিযাত্রী

—ড. আলী হোসেন চৌধুরী

ইতিহাস তার প্রিয় বিষয়। জীবিকার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন নিজের পথ। প্রকাশনা শিল্পে তিনি এক স্পধির্ত অভিযাত্রী, রুচি ও চিন্তার সাথে পেশার অপূর্ব সম্মিলন। যদিও এই ধরনের সংযোগ খুব কমই ঘটে মানুষের জীবনে। হয়তো কারো কারো বেলায় তা হয়। সিকদার আবুল বাশারের জীবন মিলেছে এইভাবে। এটা তারই একটি ঝুঁকিপূর্ণ সৃজনস্পৃহা। এই স্পৃহার যে আনন্দ-উত্তেজনা, যে প্রশান্তি, তার সাথে পাল্লা দিয়ে আসে ঝুঁকি। অর্থনৈতিক ঝুঁকি, ব্যবসায়িক ঝুঁকি। এই ঝুঁকিগুলি মাথায় নিয়েই তাকে নামতে হয়েছে ভালোবাসার টানে, নেশার টানে, ভালো লাগার টানে। মানুষের জীবনে কত রকম নেশাতো হয়, আর নেশার জন্য মানুষ কত কিছুইতো করে। আনন্দকে আপন করে নেবার নেশা মানবজীবনে চিরন্তন। সিকদার আবুল বাশারের নেশাটা ভিন্ন। তুমুল করতালি, পুষ্পার্ঘ্য কিংবা বিস্তৃত সম্মাননা পাবার জন্য নয়। আপনার মাঝে প্রশান্তির বৃক্ষ জন্ম দিয়েছেন তিনি পরিতৃপ্তির জন্য। এটাই তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করেছে। এটাই তার ভিন্নতা, এটাই তার অর্জন, তার বৈশিষ্ট্য। এমনি নেশা, এমনি ভালোবাসা, বিচিত্র বর্ণিল, ব্যতিক্রম। সিকদার বাশার প্রকাশক হয়েও প্রকাশনা শিল্পী হয়েছেন। ঋদ্ধ করেছেন নিজেকে, সমাজকে, মানুষকে।
আজ ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে করতে তিনি নিজেই যেন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন। ইতিহাসের বিষয় হয়েছে তার ‘গতিধারা’। গতিধারা ইতিহাসের নতুন ধারা। সে ধারায় বয়ে চলেছেন সিকদার আবুল বাশার। বাশার প্রকাশনা শিল্পী বলেই তার প্রকাশনার জগৎ রুচি ও মননের ছোঁয়ায় ভিন্নতর প্রেক্ষাপট গড়ে তুলেছেন যা শিল্পশৈলীর দিক থেকে, সৌন্দর্যের দিক থেকে অপূর্ব। গতিধারার ইতিহাসপ্রীতি শুধু যে সিকদার আবুল বাশারের শখ ও ভালোবাসার প্রতিফলন এ কথা বলেই শেষ করে দেয়া যায় না। কারণ এই ইতিহাসের মধ্যেই একটি জাতির শৌর্য, গৌরব,উজ্জ্বল অতীত যেমনভাবে গ্রন্থিত হয়, তেমনিভাবে কষ্ট, বেদনা, হতাশা ও পরাজয়ের গ্লানি বিধৃত থাকে। আর এটা বর্তমানের জন্য অত্যন্ত ফলদায়ক। কার্যকর কর্মপরিকল্পনা ও সম্মুখে এগোবার ভিত্তিভূমি তৈরি করেন। যেকোনো জাতির বর্তমান ভিত্তি তার অতীতে। সিকদার বাশার বাংলাদেশের বাঙালি জাতির অতীত ইতিহাসকে তুলে এনেছেন সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত যতেœর সাথে। যে জাতি তার অতীতকে ভুলে যায়, তার শেকড়কে ভুলে যায়, সে জাতি কখনোই এগোতে পারে না। তাই এদিক থেকে বাশারের ইতিহাসপ্রীতি শুধু শখ বা নেশা নয়, একটা বড় ধরনের জাতীয় দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে তার প্রকাশনীর মাধ্যমে সুযোগ ছিল এটা যে একটি বাণিজ্য প্রকল্প, সে কথা ভাবলে ভুল হবে। এখানে ভালোবাসাই প্রধান, দায়িত্ববোধটাই অগ্রগণ্য। মানুষের প্রয়োজন, জাতির প্রয়োজন, তার অতীত, তার ঐতিহ্য তার শেকড় এটা কম কথা নয়। সিকদার বাশার এতটা ধৈর্য, এতটা শ্রম এবং এত অর্থ ব্যয় করেছেন ভাবাই যায় না। আজকের সমাজ যেখানে লাভের হিসাব-নিকাশটাই আগে করে, আমার কি হবে? কতটুকু হবে, কি লোকসান হবে এ সকল প্রশ্ন যখন আগেই উঁকি দেয়, সেখানে সিকদার বাশারের এই প্রশ্ন আসেনি। তার অন্তরচেতনায় সে বোধটা হয়তো একবারও কাজ করেনি। এতটা বাণিজ্য ভাবনা তাকে আচ্ছন্ন করেনি। ধন্যবাদ এবং অভিনন্দন জানাতে হয় সেই লেখকদের, যাদের দীর্ঘ অন্বেষণ ও শ্রম, অধ্যবসায়ে সৃষ্টি হয়েছে এই সকল আকর গ্রন্থ। আজ তারাও ইতিহাসের অংশ। বাশার সাহেব তার স্বাভাবিক ব্যবসায়িক প্রকাশনা বজায় রেখেছেন। তেমনি পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন ইতিহাস প্রকাশনা। জেলায় জেলায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস একটি বিশাল আয়োজন। এই আয়োজনের উদ্দেশ্যটি বড় মহৎ। একটি জাতির এত বড় উত্থান, এত বড় সংগ্রাম, এত বড় ত্যাগ আর রক্তের ইতিহাস সে জাতির উঠে দাঁড়ানো র মধ্য দিয়েই তার আত্মপ্রকাশ। এ বড় শ্লাঘার বড় আত্মশক্তি ও আত্ম উন্মোচনের ইতিহাস। একাত্তরের এই উঠে দাঁড়ানোর ইতিহাস জাতিকে দিশা দিবে, নবজীবনের নতুন সড়কের, নতুন লক্ষ্যের। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে যাবে নতুন পথের ইঙ্গিতবাহী এই ধারা। বিপন্নতা ও সংকটে আমাদের এই ইতিহাস পরিষ্কার করে দেবে সমাধানের পথচলা। আবির্ভূত হবে সাহস ও শক্তিকেন্দ্র রূপে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে, চলার গতি দেবে, শীর্ষে অবস্থানের নির্দেশনা দেবে। এটাই আমাদের পরম পাওয়া। তাই কোনো রাজনীতি বা দলীয় বিবেচনায় নয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রতিটি বাঙালির ইতিহাস তার স্বর্ণোজ্জ্বল গৌরবের অতীত। একেই গ্রন্থিত, সংরক্ষিত করেছেন সিকদার আবুল বাশার। যে লেখকরা এই যজ্ঞ সম্পাদনা করেছেন, তারাও অপূর্ব এক ইতিহাসে নিজেদের সংযোজিত করেছেন। সিকদার আবুল বাশারের মতো জাতি তাদের কাছেও ঋণী হয়ে থাকবে। একটা উদ্যম, একটা মহৎ অভিপ্রায় কিভাবে সফল হয়, তার সত্যিকার উদাহরণ সিকদার আবুল বাশার। ভালো কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা মানুষের অভাব হয় না, গ্রন্থগুলোর লেখকরাই তার প্রমাণ বহন করে। হঠাৎ ঝোঁকে কিংবা আকস্মিক কোনো ঘটনা থেকে তার এই কর্ম উদ্দীপনার সূচনা বললে ভুল হবে। যতটুকু জানতে পেরেছি তার পরিবারটিও ঐতিহ্যের ধারক। ঝালকাঠি জেলার তারুলি গ্রামের সিকদার বাড়িতে ঐতিহ্যের সন্নিবেশ ঘটেছে বহু আগে থেকে। প্রফেসর ফজলুর রহমানসহ অনেক কীর্তিমান পুরুষের জন্ম এই সিকদার পরিবারে। সুতরাং বাশারের ইতিহাস চেতনা, ইতিহাস চর্চা, তার রুচিবোধ, মানসিকতা তার রক্তের মধ্যেই প্রবাহিত ছিল। তিনি ধারণ করেছেন নিবিষ্টচিত্তে। ‘সিকদার বাড়ির ইতিকথা’ গ্রন্থটি এই পরিবারের পূর্বপুরুর্ষে ইতিহাস ও এ পরিবারের ঐতিহ্য। গতিধারা স্বত্বাধিকারী সিকদার আবুল বাশার অন্য প্রকাশকদের চাইতে একেবারেই আলাদা। একটা অবয়ব গড়ে তুলেছেন তিনি তার আত্ম সচেতনতা, আত্মচর্চা ও আত্ম-উপলব্ধির মধ্য দিয়ে। তিনি দেশকে, জাতিকে, জাতিস্মরকে, জাতীয় চেতনাকে যেভাবে অনুভব করেছেন, তা অন্য অনেকেই করেননি। যে কথা আগেই বলেছি, এত অর্থ ব্যয়, এত ঝুঁকি নেবেন কেন তিনি? এত অর্থ বিনিয়োগ করেছেন ফিরে আসবে কিনা একথাও বলা যায় না। এখানেই আবেগ, এখানেই চেতনা, এখানেই দায়িত্ববোধ। তিনি বাংলাদেশের ৬৪ জেলার ইতিহাস প্রকাশ করেছেন, ৬৪ জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকাশ করেছেন স্ব-প্রণোদিত, স্ব-উদ্যোগে ও স্ব-অর্থ ব্যয়ে। এটা সত্যিই এক অভূতপূর্ব ব্যাপার। কৃতজ্ঞতায় তার কাছে আমাদের ঋণ জমে যায়। এত বড় মহৎ কাজ তিনি করেছেন আমাদের জন্য, আগামী প্রজন্মের জন্য। আগামী প্রজন্ম তার কাছে ঋণী থাকবে। একজন সৃজনশীল, উচ্চবোধ, উন্নত চিন্তার রুচিশীল মানুষ হিসেবে, একজন উদ্যোগী কর্মযজ্ঞের পুরোহিত হিসেবে জাতীয় দায়িত্ব পালনে ঐতিহ্যের মুখোমুখি হওয়া একজন নাগরিক হিসেবে জাতি তাকে মনে রাখবে। মনে রাখবে গতিধারাকে আর উল্লিখিত গ্রন্থের লেখকদের।

…………………………………………….
ড. আলী হোসেন চৌধুরী : কবি ও গবেষক।
অধ্যাপক (বাংলা বিভাগ), ওয়ার্ল্ড ইউনিভাসিটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply