কুমিল্লায় যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে ‘ফুলবাড়ি গণঅভূত্থান দিবস’

এবিএম আতিকুর রহমান বাশার :–
‘শহীদের খুনে রাঙা পথে দালাল বেঈমানের ঠাঁই নাই।’ এ শ্লোগান নিয়ে কুমিল্লায় যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে ‘ফুলবাড়ি গণঅভূত্থান দিবস’। মঙ্গলবার বিকেলে কুমিল্লা টাউন হল বীরচন্দ্র মিলনায়তন’র প্রধান ফটকের সামনে উন্মুক্ত খনি নিষিদ্ধ ও লুটেরা সাম্রাজ্যবাদীদের শোষনের হাতিয়ার ‘এশিয়া এনার্জি’ বহিস্কার, ‘ফুলবাড়ি গণঅভূত্থানে শহীদদের রক্তের বিনীময়ে অর্জিত ‘ফুলবাড়ি ছয় দফা চুক্তি’ বাস্তবায়নের দাবীতে মানব বন্ধন, আলোচনা সভা ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে ‘তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা কমিটি’ কুমিল্লা জেলা শাখা।
তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা কমিটি’র কুমিল্লা জেলা আহবায়ক ন্যাপ কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ জাকির হোসেন’র সভাপতিত্বে এবং সদস্য সচিব নাছিরুল ইসলাম মজুমদার’র সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন জেলা তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা কমিটি’র সদস্য ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি কুমিল্লা জেলা কমিটির সভাপতি এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, জেলা তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা কমিটি’র অন্যতম সদস্য, ন্যাপ কুমিল্লা জেলা সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তালেব, জেলা তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা কমিটি’র যুগ্ম আহবায়ক ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি কুমিল্লা জেলা কমিটির সাধারন সম্পাদক পরেশ কর, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হোসেন, জেলা তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা কমিটি’র অন্যতম সদস্য সাম্যবাদী দল কুমিল্লা জেলা কমিটির সভাপতি আবু তাহের, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন কুমিল্লা জেলা সভাপতি একেএম মিজানুর রহমান কাউছার, কুমিল্লা শান্তি-সুনীতি পাঠাগার’র আহবায়ক মবিনুল ইসলাম তানভির। এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি কুমিল্লা জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি মফিজ উদ্দিন আহমেদ, বিকাশ দেব, সহিদুল ইসলাম, আব্দুস সালাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা সুজাত আলী, এডভোকেট অশোক কুমার দেব, রিপন আহমেদ প্রমূখ।
আলোচকরা বলেন, কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম নেতা দিনাজপুর‘র ওই আসন থেকে ১৯৪৬ সালের সংসদ নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতাকে পরাজিত করে কমিউনিস্ট পার্টির মনোনীত ও গরু গাড়ি প্রতিক নিয়ে বিজয়ী কমরেড রূপনারায়ন রায়‘র পূণ্যভূমি ‘ফুলবাড়ি’তে ২০০৬সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন লুটেরা সাম্রাজ্যবাদিদের কমিশন ভোগী দালালদের সহযোগীতায় ফুলবাড়ি কয়লা খনিকে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। সাম্রাজ্যবাদী এশিয়া এনার্জি’র সাথে ওই চুক্তির শর্তানুযায়ী উৎপাদিত কয়লার ৯৪ ভাগ নেবে এশিয়া এনার্জি, বাংলাদেশ পাবে মাত্র ৬ভাগ। এছাড়াও দিনাজপুরের ফুলবাড়ি থেকে মংলা বন্দর পর্যন্ত রেল লাইন’র উন্নয়ন খরচ বাংলাদেশ বহন করতে হবে। এই প্রকল্প অনুযায়ী ফুলবাড়ীসহ ছয় থানায় ৫ লক্ষাধিক মানুষ উচ্ছেদ করে, আবাদী জমি, ভূগর্ভস্থ ও নদীনালার পানি বিনাশ করে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের আয়োজন করেছিলো অনভিজ্ঞ ভুইফোঁড় কোম্পানি এশিয়া এনার্জি। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী মাত্র ৬ শতাংশ রয়্যালটির বিনিময়ে কোম্পানি পুরো খনির মালিকানা পেয়ে যেত এবং শতকরা ৮০ ভাগ বিদেশে রফতানির মাধ্যমে নিজেরা বিপুল মুনাফা লাভ করার সুযোগ পেতো। বাংলাদেশ হারাতো আবাদী জমি, বিনষ্ট হতো অমূল্য পানি সম্পদ, লক্ষ লক্ষ মানুষ উচ্ছেদ হতেন জীবিকা ও সমাজ থেকে, উপরন্তু কয়লা সম্পদতো আছেই। এই জালিয়াত কোম্পানি বহিষ্কার ও বিধ্বংসী এই প্রকল্প বাতিলের দাবিতে ফুলবাড়িতে ২০০৬সালের ২৬আগষ্ট দিনাজপুরের ৬থানার লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশে সরকারি বাহিনী টিয়ার গ্যাস ছোড়ে, গুলি চালায়। এতে তরিকুল, সালেকিন, আমিনুলসহ তিন বিপ্লবী তরুণ নিহত হন, গুলিবিদ্ধসহ আহত হন দুই শতাধিক। এরপর পুরো অঞ্চলের নারীপুরুষেরা গণঅভ্যুত্থানের এক অসাধারণ পর্ব তৈরি করেন, সারাদেশে তা ছড়িয়ে পড়ে। বক্তারা আরো বলেন, এক পরিসংখ্যানের হিসেবে ফুলবাড়িয়া উন্মোক্ত কয়লা খনি থেকে বাংলাদেশ ৩০বছরে ৯হাজার কোটি টাকা পেত, অথচ এই এলাকার মাটির উপর থেকে কৃষি, কৃষিপণ্য, রাজস্ব, গবাদীপশু পালন করে এক বছরে উৎপাদন হয় ১০হাজার কোটি টাকা এবং ৩০বছরে সে আয়ের পরিমান দাড়ায় ৩লাখ কোটি টাকায়।সালেকিন, আমিনুল, তরিকুল’র আত্মদানের মধ্য দিয়ে এক পর্যায়ে ৩০ আগষ্ট ২০০৬ চারদলীয় জোট সরকার জনগণের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। সারাদেশে উন্মুক্ত খনি নিষিদ্ধ ও এশিয়া এনার্জি বহিষ্কারের ধারাসহ এই চুক্তি ‘ফুলবাড়ী চুক্তি’ হিসেবে খ্যাত।
৪ সেপ্টেম্বর ২০০৬ ফুলবাড়ীসহ ৬ থানার মানুষদের অভিনন্দন জানিয়ে ফুলবাড়ী চুক্তির প্রতি পূর্ণ সংহতি জানান তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ক্ষমতায় গেলে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার করেছিলেন। চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিএনপি এবং প্রকাশ্য অঙ্গীকারের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এই চুক্তি বা¯তবায়নে দায়বদ্ধ। ফুলবাড়ী চুক্তি বাস্তবায়ন এখন তাই রাষ্ট্রের দায়। এর অন্যথা করার কোনো পথ নাই।
কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের দুই মেয়াদে ছয় বছর পার হলেও এখনও সেই চুক্তির মূলধারাগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি। কোন বৈধ অনুমোদন না পেলেও ফুলবাড়ীর কয়লা খনির ওপর লন্ডনে এখনও বেআইনীভাবে শেয়ার ব্যবসা করছে এশিয়া এনার্জি (জিসিএম)। শেয়ার ব্যবসার মুনাফার একাংশ ছড়িয়ে দেশে দালাল মন্ত্রী, এমপি, সাংবাদিক, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, কনসালট্যান্ট সৃষ্টি করা হয়েছে। বড়পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত খনি নিয়ে অতিতৎপরতা, পত্রপত্রিকা ও টিভিতে এর স্বপক্ষে মিথ্যাচার ও বিকৃত তথ্য মিশ্রিত অপপ্রচার এই জালেরই অংশ। চক্রান্ত চলছে কিন্তু জনপ্রতিরোধও জারি আছে। এবারের ফুলবাড়ী দিবসের মূল শ্লোগান তাই, ‘শহীদের খুনে রাঙা পথে দালাল বেঈমানের ঠাঁই নাই। ’আমরা বারবার বলেছি, জাতীয় সম্পদের ওপর শতভাগ জাতীয় মালিকানা, খনিজসম্পদ রফতানি নিষিদ্ধ করে শতভাগ দেশের কাজে লাগানো এবং জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের জন্য সামগ্রিক উদ্যোগই কেবল জনস্বার্থে দেশের সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। ফুলবাড়ি চুক্তি এপথেই অগ্রসর হতে হবে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply