মুরাদনগরে ৬০/৮০ বছর উর্ধ্ব শিক্ষক, সাধারণ মানুষ জেল খাটছেন : নিষ্ঠুরতায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসি

মো: মোশাররফ হোসেন মনির, মুরাদনগর :–

কুমিল্লার মুরাদনগরের পান্তি গ্রামে বাড়ি মনির মাষ্টারের। বয়োবৃদ্ধ, বেশ সাদাসিদা, স্বভাবে নিরীহগোছের। নির্ভেজাল এই মানুষটি শিক্ষকতা করেই পার করেছেন পুরোটা জীবন। শিক্ষার আলো বিলিয়ে মানুষ করেছেন অনেককে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ! ৭৭ বছর বয়ষী মনির মাষ্টার আজ জেলের ভাত খাচ্ছেন। পরিবারের সবার চোখে পানি, গ্রামবাসি ব্যথিত। প্রশ্ন তাদের-কি অপরাধ ছিল এই মনির মাস্টারের ? বিএনপিকে ভালোবাসলে কি কেউ রেহাই পাবে না ?
গত বছরের ১৩ নভেম্বরের ঘটনা। মুরাদনগর উপজেলা সদরে বিএনপির মিছিলে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী মিলে হামলা চালায়। ওই হামলার পর পুলিশ বাদী হয়ে পাইকারিভাবে শত শত বিএনপি নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করে। বিস্ফোরক ও সন্ত্রাস দমন আইনে এসব মামলা করা হয়। নিরীহ মনির মাষ্টারও এসব মামলার আসামী। গত ৫ আগষ্ট কোর্টে হাজিরা দিতে গেলে তাকে জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
কেবল মনির মাষ্টার নয়, একইসাথে জেলে ঢুকানো হয় মুরাদনগরের বয়োবৃদ্ধ আরো তিন স্কুল মাষ্টার এবং ৬০ বছর উর্ধ্ব ১০/১২ জনসহ মোট ৮১ জনকে।
এদের মধ্যে আবু তাহের মাষ্টারের বাড়ি নবীপুরে। বয়ষ ৬৪ বছর পেরিয়ে গেছে। খোরশেদ মাষ্টারের বয়ষ ৬৭ বছর, বাড়ি কেউটি গ্রামে। শোলাপুকুরিয়ার শামসুল হক মাষ্টারের বয়ষ ৬৬ বছর। মনির মাষ্টারসহ এই চারজন প্রত্যেকে ৩৮ থেকে ৪০ বছর কাটিয়েছেন কেবল শিক্ষকতা করে। এলাকায় তাদের অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখেন সবাই।
৮১ জনের মধ্যে আরো প্রায় ১০ জন রয়েছেন, যাদের বয়ষ ৬০ পেরিয়ে গেছে। পাহাড়পুরের আব্দুল করিম, খুরুইলের লিয়াকত হোসেন, নবীপুরের আব্দুল মালেক আছেন এই দলে। এরকম বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষদের জেলে ঢুকানোয় এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ। বৃদ্ধ বয়সে এসে এদেরকে কারাগারে থাকতে হবে, কেউই তা মেনে নিতে পারছেন না। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এ জন্য স্থানীয় আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যকেই দায়ী করছেন। তারা বলেছেন, এলাকার পাঁচ পাঁচবারের সংসদ সদস্য, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের একনিষ্ঠ নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের দমন করতেই ওনার প্রতিপক্ষ ইউসুফ আব্দুল্লাহ হারুনের নির্দেশে বয়োবৃদ্ধ এসব মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাদেরকে জেলের ঘানি টানতে হচ্ছে।
কুমিল্লা বারের সাবেক সেক্রেটারী কামরুল হায়াত খান বলেন, আসামীদের আদালতে আত্মসমর্পনের দিনে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। সবাইকে জেলে পাঠানো হবে তা কী আগে খেকেই যান্তু ? আসামিরা এজলাসের ঢুকার পরেই কেন আদালতের সামনে প্রিজন ভ্যান প্রস্তুত রাখা হলো ? কেন আসামিদের এজলাসে ঢুকার আগেই প্রায় ১০০টি হ্যান্ডকাপ রাখা ছিল ? কেন এজলাসের দরজায় দাঁড়িয়ে সব আসামীকে ভিডিওতে ধারণ করেন ডিবি পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন ? আমরা কার কাছ থেকে এ প্রশ্ন গুলোর উত্তর পাব ? অথচ একই মামলায় জজ কোর্টে এর আগে ৪২ জনের জামিন দিয়েছে। আমরা আইনের প্রদি শ্রদ্ধাসিল আদালতে সুবিচার পাব সেটাই আমরা বিশ্বাস করি। জানা গেছে, আসামীদের মধ্যে এমন একজন এজাহার ও র্চাশিটে উল্লেখিত ঘটনার সময় হজ্জে ছিলেন।
জেলে থাকা আবু তাহের মাষ্টারের পরিবারের কয়েকজন সদস্য ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলেন, বয়ষ্ক মানুষটাকে মামলা/চার্র্শিট দিয়ে কি আওয়ামীলীগদের চলতো না ? যারা বাপ সমতুল্য ব্যক্তিকে সম্মান দেয় না, তারা আসলে অমানুষ।
খুরুইলের লিয়াকত হোসেনের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, এলাকার বর্তমান এমপিই এই ঘটনার মদদদাতা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি একটার পর এটা ষড়যন্ত্রের জাল বুনে চলছেন। যারাই কায়কোবাদকে ভালোবাসে, সবাই তার টার্গেটে পরিণত হয়।
এলাকার ব্যবসায়ী আরিফ মোল্লা বলেন, পাইকারীভাবে সবাইকে জেলে পাঠানো হয়েছে। বাদ যায়নি বৃদ্ধ শিক্ষক, ব্যবসায়ী, কৃষক, দোকানদার কেউই। আমরা অবিলম্বে এদের মুক্তি চাই। আর যারা এই ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করার আহবান জানাচ্ছি।
এলাকার প্রবীন শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, বয়োবৃদ্ধ শিক্ষকদের জেলে পাঠানোয় আমরা শিক্ষক সমাজ ক্ষুব্ধ, ব্যথিত। আমরা মনে করি, এই ঘটনার পিছনে যারা কলকাঠি নেড়েছেন, তারা সবাই সমাজের চিহ্নিত ব্যক্তি। আজকে যারা এই ঘৃণ্য পথ বেছে নিয়েছেন, অচিরে তাদেরকেও একই পথের পথিক হতে হবে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply