মাহে রমজানের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিক কথা

—এম. আবদুল হাই

যুগে যুগে বলি আর প্রতি বছর বলি মূলত আত্মশুদ্ধি, আল্লাহপ্রেম, সাম্য, সহমর্মিতা ও সহানুভূতির উদাত্ত আহ্বান নিয়ে প্রতিবছর মাহে রমযান আমাদের মাঝে ফিরে আসে। রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের প্রতীকস্বরূপ রমযানের চাঁদ পশ্চিম আকাশে আত্মপ্রকাশ করে। মিথ্যা, শঠতা, প্রবঞ্চনা, কলহ, হানাহানি, দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত মানুষদের ডেকে বলে- আর নয়, এবার ফিরে এসো সবাই তাকওয়ার দিকে, আল্লাহভীতিপূর্ণ সাবধানী জীবনের দিকে। অন্যায়, অনাচার, দুর্নীতি, অসাধুতায় কলুষিত অন্তরকে মাহে রমযানের কৃচ্ছ্রসাধনার দাবদাহ দ্বারা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ভস্ম করে দাও। অপরাধপ্রবণতার বাসায় আগুন ধরিয়ে তার সকল খুপড়ি কোঠরি পুড়িয়ে ফেলো। তার জায়গায় তাকওয়ার বীজ বপন করে নিজে সুখে থাকো, অপরকেও সুখে থাকতে দাও। মুমিন জীবনের পরম কামনা দীদার-এ-এলাহী লাভ ও তার আতিথেয়তার প্রত্যাশায় সিয়াম সাধনার আদর্শে গড়ে তোলো নিজের ব্যক্তি চরিত্র, পারিবারিক জীবন ও সামাজিক জীবন। এ মহৎ লক্ষ্যে অভিসারীদের নেই কোনো ব্যর্থতা, নেই পরাজয়। আত্মশুদ্ধির অনুশীলন দ্বারা তোমার চিত্ত শক্তিকে দৃঢ়তর করো। ‘সংযম মাসের’ এই প্রশিক্ষণ দ্বারা অন্যায়, লোভ-প্রলোভনের হাতছানিকে পদাঘাত করে দূরে নিক্ষেপ করো। তেমনি সিয়াম সাধনালব্ধ দুর্জয় মনের প্রচ-তা দিয়ে হটিয়ে দাও সত্য পথের সকল কাঁটা। আল-মুত্তাকীনের সমাজ গড়ে বিশ্বমানবতাকে তাগুতী শক্তির শোষণ-নিপীড়নের হাত থেকে উদ্ধার করো। দুনিয়ার ‘হাসানা’কে নিশ্চিত করে প্রতিদিনের জন্যে ঈদুল ফিতর ডেকে আনো।
সত্যিই মাহে রমযানের মাস যদি আল্লাহপ্রম, সাম্য ও সহানুভূতির মাস না হতো, তাহলে সারাদিন পানাহার, ইন্দ্রিয়তৃপ্তি, বাকশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণ ও চিন্তাশক্তি ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সংযত রেখে শ্রান্ত-ক্লান্ত দেহ নিয়ে দীর্ঘ রাত নামাযে দাঁড়ানো ইত্যাদির দ্বারা আল্লাহপ্রমের পরাকাষ্ঠা দেখানো সম্ভব হতো না। সম্ভব হতো না প্রাচুর্যে আকণ্ঠ ডুবে থাকা মানুষের পক্ষে ক্ষুধার্ত বুভুক্ষুদের জঠরজ্বালা উপলব্ধি করা। যাদের দারিদ্র্য ও ক্ষুধাক্লিষ্ট দেহের করুণ চাহনি কোনদিন একশ্রেণীর মানুষের অন্তরে স্নেহের উদ্রেক করতে পারেনি, মাহে রমযানের অসিলায় তাদের অন্তরও সহানুভূতির নির্মল স্পর্শে সিক্ত হয়ে ওঠে। দানের হাত সম্প্রসারিত হয়। একই কাতারে নামায আদায় করে বিত্তবান ও বিত্তহীন গরিব মিসকীন। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন : ‘আদম সন্তানদের প্রত্যেক নেক আমলের বদলে সওয়াবের পরিমাণ দশগুণ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু একমাত্র রোযাদার যিনি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের নিয়তে নিজের প্রবৃত্তিকে দমন রাখেন, পানাহার থেকে বিরত থাকেন, তার সওয়াব পরিমাণ বা সংখ্যাভিত্তিক নয় বরং খোদ আল্লাহ তা’আলাই এর পুরস্কার।’ অর্থাৎ আল্লাহ বান্দাকে ঐ দিন তাদের জীবনের পরম কামনা নিজের সাক্ষাৎ দান করে তাদের আতিথেয়তা করবেন।
অন্যায়, জুলুম, অবিচার ও লোভ-লালসাসহ সব পাপকাজ থেকে বিরত থাকার এক মহান শিক্ষা দেয় মাহে রমযান। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মুসলমান রমযান মাসে সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে আল্লাহ্ র নৈকট্য লাভের জন্য আত্মার পরিশুদ্ধির প্রশিক্ষণে নিয়োজিত হয়। সারা দিন সব ধরনের পানাহার থেকে মুক্ত হয়ে মোমিন মুসলমানরা আল্লাহ্ র সন্তুষ্টি অর্জন করেন। অন্যায়, জুলুম, অবিচার এবং লোভ লালসাসহ সব ধরনের পাপকাজ থেকে বিরত থাকার এক মহান শিক্ষা দেয় মাহে রমযান। এ শিক্ষাকে বুকে ধারণ করে নিজেদের পবিত্র মানুষ গড়ে তুলতে হবে। অনাচার, হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি পরিহার করে সমাজে শান্তি বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকা প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য।
রমযানের এ চিরায়ত আহ্বান বাংলাদেশে কতটুকু প্রতিপালিত হচ্ছে, বুকে হাত দিয়ে সবাইকে সে আত্ম-জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হওয়া দরকার। অন্যায়, জুলুম, অবিচার ও লোভ-লালসা এখানে সাপের মতো লকলকে জিহ্বা দিয়ে সবকিছু চেটে খাচ্ছে। সুইস ব্যাঙ্কে টাকা পাচারের কথা আলোচিত হচ্ছে। গুম-খুন-হামলা-মামলার মতো নির্মম জুলুম নির্যাতনের কথা উচ্চারিত হচ্ছে। মানুষের ছিনিয়ে নেয়া মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন আর ভোটের রাজনৈতিক অধিকারের প্রসঙ্গ বার বার ফিরে ফিরে আসছে আলোচনার টেবিলে। অতীতের মতো এ রমযানেও এসব কথা আলোচিত হচ্ছে। অন্যায়, জুলুম, অবিচার ও লোভ-লালসা-লুটপাটের বিরুদ্ধে রমযানের মহান আহ্বান সবাই শুনতে পায় কি-না, সেটাই এক বড় প্রশ্ন। বিশেষত, যারা কর্তা ব্যক্তি তারা কি সব করছেন, সে তথ্য-প্রমাণ তো চোখের সামনেই রয়েছে। পরিস্থিতি কেমন নিয়ন্ত্রণহীন, সেটা বিলক্ষণ অনুধাবন করা যায় বাজার-দরের দিকে লক্ষ্য করলে। অর্থাৎ খুন করে বা গুম করে সাত-খুন-মাফের মতো দাম বাড়িয়ে বা ভেজাল দিয়েও বেশ বহাল তবিয়তে থাকা সম্ভব হচ্ছে। মানে হলো, ওপর থেকে নীচে সুবিধা মতো যেমন পারো করতে থাকো। জনগণ আর নীতি-নৈতিকতার দিকে তাকানোর দরকার নেই। সাংবাৎসরিক এহেন অবক্ষয় আদর্শিক রমযানের সময়েও দেখতে পাওয়া যাবে, সেটা ভাবতেও কষ্ট হয়। সরকার যে সারা বছরের মতো পবিত্র মাহে রমযানের উদাসিন থাকবে, সেটা কে জানতো! উদাসিন না হলে ঠিক রমযানের আগে আগে দামের এতো লাভ কেন? বন্যা নেই, খরা নেই, কোনও উপযুক্ত কারণও নেই, তবুও দাম বেড়েছে কেন, তার উত্তরও অজানা। এসব উদাসীনতা ছাড়া আর কি!
সরকারকে এ কারণে উদাসীন বলা হয়েছে জনগণের পক্ষ থেকে এবং যারা মজুদদারি, মুনাফাখোরি করে কৃত্রিম দাম বাড়িয়ে অগাধ কালো টাকার মালিক হয়েছে, সেসব সরকারি-বেসরকারি দুর্নীতিবাজদের নিন্দাও করছে মানুষ। প্রকাশ্যে না পারলেও, গোপনে তো করছেই। বিশেষত কালো টাকার মালিক মজুদদার ও মুনাফাখোররা এক ঘৃণিত শ্রেণী। কিন্তু সরকারের বর্ষীয়ান অর্থমন্ত্রী কি বলছেন? তার সব কথা নিয়ে আলোচনা করলে ভিমরি খেতে হবে। তার সম্পর্কে প্রায়-সকলেই জানেন। শুধু এটুকুই উল্লেখ করা যথেষ্ট যে, তার উত্থাপিত ও প্রস্তাবিত আর্থিক বাজেটে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ থাকছে। তাহলে ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে কালো টাকা বানানো আর সেগুলোকে সাদা করার ব্যবস্থা থাকলে কালো টাকার চক্কর কি আদৌ বন্ধ হবে? অথচ পবিত্র মাহে রমযান সব ধরনের অন্যায়, অপকর্ম, পাপাচার বন্ধ করার মাধ্যমে মানুষকে আত্মশুদ্ধির ডাক দেয়। ইসলামের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ২য় হিজরীর শাবান মাসে মদীনায় রোজা ফরয সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হয়। আয়াতটি হলো- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরয করা হলো যেভাবে তা ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা সংযমী হও’ (সূরা বাকারা, আয়াত-১৮৩)। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ্ আরো বলেন- ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সেই মাসকে পায় সে যেন রোজা রাখে’ (সূরা বাকারা, আয়াত-১৮৫)। পবিত্র রমযানের ফযিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে হাদিসের কিতাবগুলোতে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্য থেকে কিছু হাদিস বর্ণিত হচ্ছে। প্রিয় নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, যখন রমযান মাস আসে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় ও দোজখের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়, আর শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। (বুখারী, মুসলিম)। অপর হাদিসে হযরত সাহ্ল ইবনে সা’দ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, বেহেশতের আটটি দরজা রয়েছে। তারমধ্যে একটি দরজার নাম রাইয়ান। রোজাদার ব্যতীত আর কেউ ওই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারী, মুসলিম)।
বিখ্যাত হাদিস বিশারদ সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের নিয়তে রমযান মাসের রোজা রাখবে তার পূর্বের গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হবে। যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের নিয়তে রমযান মাসের রাতে এবাদত করবে তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের নিয়তে কদরের রাত এবাদতে কাটাবে তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (বুখারী, মুসলিম)।
রোযার মূল লক্ষ্যকে সামনে রেখে রোযা রাখা না হলে মানব চরিত্রে তার সুফলসমূহ দেখা দেবে না। কেউ রোযা পালন করছে অপরদিকে মিথ্যাও বলছে, মানুষকে ঠকিয়ে হারামও খাচ্ছে, মাপে কম দিচ্ছে, জিনিসপত্রের দাম ন্যায্যমূল্যের অধিক রেখেছে, দুর্নীতি করছে, মদ ও ব্যভিচারে নিজেকে নিয়োজিত রাখছে, পরের হক নষ্ট করছে, পরচর্চা, পরনারী দর্শন ও অসৎ চিন্তা করছে, নামায তরক করছে, এহেন ব্যক্তির রোযা রাখা না রাখা সমান কথা। রোযার মূল লক্ষ্য তাকওয়া (আল্লাহভীতিপূর্ণ সাবধানতা বা পরহেজগারী)। নিজ চরিত্র সৃষ্টির ব্যাপারে সে ব্যর্থ হয়েছে। এজন্যই মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন : ‘যে ব্যক্তি রোযা রাখে কিন্তু অবাঞ্ছিত কথা ও কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে ব্যর্থ হয়, তার পানাহার ছেড়ে উপোস করাতে আল্লাহর কোনো দরকার নেই।’ মহানবী (সা.) আরো ইরশাদ করেছেন : ‘রমযানের শেষ দশ দিন একনিবিষ্ট চিত্তে যদি কোনো রোযাদার মসজিদে ইতিকাফ করে সে যেন দুটি হজ্জ এবং দুটি ওমরার সওয়াব অর্জন করলো।’
মাহে রমযানের গোটা কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি কাজই অধিক সওয়াবের। এই মাসেই একটি রাত রয়েছে, যাকে শবে কদর বলা হয়Ñ এ রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। অর্থাৎ কেউ এ রাতে জেগে ইবাদত করলে হাজার রাত জেগে ইবাদত করার চাইতেও অধিক সওয়াব পাবে। অবশ্য সেটা ‘মওসুমি সওয়াবপ্রার্থীদের জন্যে না হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ চাকরির বোনাস তো নিয়মিত কর্মচারীরাই পেয়ে থাকে। রমযানের রোযার এত কল্যাণকারিতা সত্ত্বেও যারা এর থেকে উপকার ভোগ করতে না পারবে, তাদের চাইতে কপালপোড়া আর কেউ হতে পারে না।
পবিত্র মাহে রমযানের মৌলিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাআলা আমাদের সকলকে যেন আত্মশুদ্ধি ও সততার সাথে মাহে রমযানের বৈষয়িক ও আধ্যাত্মিক সুফল লাভের সুযোগ দেন এবং মহানবী (সা.) যেব্যাপারে জিবরাঈ আমীন এর বদদোয়ার জবাবে আমীন বলেছেন, তা থেকে যে সতর্ক ও মুক্ত থাকার জন্য তাওফিক এনায়েত করেন।
==================
এম. আবদুল হাই
তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫।
০১৮১৫ ৮৬১৫৯০

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply