মতলব উত্তর মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের সিপাইকান্দি বরোপীট মৎস্যখামার ভরাট চলছে

শামসুজ্জামান ডলার :–

চাঁদপুরের মতলব উত্তরের মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পে একের পর এক জলাশয় ভরাট চলছে। মতলব উত্তরের গুরুত্বপূর্ণ অনেক দীঘি বা পুকুর এরই মধ্যে ভরাট হয়ে গেছে। ভরাটের তালিকায় যুক্ত হয়েছে সিপাইকান্দি বরোপীট মৎস্য খামার। গতবছর তারা বালি ভরাট করার চেষ্টা করলে এলাকাবাসীর প্রতিবাদের মুখে তার পিছু হটে। এনিয়ে ওই সময় মানববন্ধন ও পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন হয়েছিল। একববছর বালি ভরাট বন্ধ রেখে আবারো শুরু কয়েছে বালি ভরাট।
মতলব-ছেংগারচর রাস্তাার পাশে সিপাইকান্দি বরোপীটটির অবস্থান। ভূমিদস্যুরা জলাশয় ভরাট করে মার্কেট কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করার জন্য ড্রেজার দিয়ে বালি ফেলে ভরাট করছে। ক্ষতিগ্রস্থ ভূমির মালিক ও জলাশয় ব্যবহারকারীরা প্রতিবাদ করলেও কোনো লাভ হচ্ছে না। লিজগ্রহীতার কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে এলাকার প্রভাবশালীরা নীরব ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভরাট বন্ধ করতে বিজ্ঞ মতলব সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, চাঁদপুরের শরনাপন্ন হয়েছে বরোপীট তীরবর্তী ক্ষতিগ্রস্থ জমির মালিক ও মাছ চাষী দলের পক্ষে মো. সিরাজুল ইসলাম। আদালত বিবাদীদের বিরুদ্ধে সমন জারি করেছে। সমন জারি করার পর থেকে নেই বালি ভরাট।
আবেদন সূত্রে জানা যায়, সিপাইকান্দি বরোপীট ১৯৯৩-৯৪ সালে মত্স্যবিভাগীয় এফসিডিআই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৯৮ মেট্রিক টন গমের মাধ্যমে উন্নয়ন করার পর থেকে আজ পর্যন্ত ইজারা গ্রহণের মাধ্যমে মৎস্য বিভাগের তত্ত্বাবধানে মাছ চাষ করে আসছে। বর্তমানেও বরোপীটে মাছ মজুত ও চাষ রয়েছে। সিপাইকান্দি গ্রামের নুরুল হক প্রধানের স্ত্রী সেলিনা আক্তার ও দক্ষিণ ঠেটালিয়া গ্রামের আলমগীর হোসেনের স্ত্রী মমতাজ বেগম হ্যাপীর নামে দু’জনকে মাছ চাষ করা বরোপীট বনায়নের নামে মেঘনা ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী লিজ বন্দোবস্ত দেন। নির্বাহী প্রকৌশলী জলাশয়কে বনায়নের নামে অবৈধভাবে ২০১৯ সাল পর্যন্ত লিজ প্রদান করে, যা এফসিডিআই প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ ও বেআইনি।
৩১মার্চ ২০১৩ইং তারিখে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আদেশবলে টেন্ডার কমিটির সভায় চাঁদপুর জেলার এফসিডিআই প্রকল্পের টেন্ডার কমিটির সদস্য সচিব ইতিপূর্বে টেন্ডার কমিটির সভা ব্যতিত মাছ চাষ যোগ্য যে সকল বরোপীট নীতিমালা বহিঃর্ভূত ভাবে ইজারা দেওয়া হয়েছে এমন বরোপীটের ইজারা বাতিলের প্রস্তাব উপস্থাপন করেন এবং এরূপ ইজারা বাতিল করার ব্যাপারে সর্বসম্মতি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
আর এদিকে বরোপীট লিজ এনে লিজ গ্রহণকারীরা ড্রেজার দিয়ে বালি ফেলে বরোপীট ভরাট করা হচ্ছে। জলাশয়টি ভরাট হওয়ায় বরোপীট তীরবর্তী লোকজন শঙ্কা প্রকাশ করছে।
জলাশয় ভরাট হওয়ার কারণে অগ্নিনির্বাপণ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এসব জলাশয় এলাকার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে নানাভাবে ব্যবহার করে আসছিলেন। বিশেষ করে গোসল করা এবং কাপড়সহ অন্যান্য গৃহস্থালি জিনিসপত্র ধোয়ামোছার কাজে ব্যবহার করছিলেন। কিন্তু বর্তমানে দখল ভরাট এসব জলাশয় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। জলাশয় রক্ষা আইন থাকলেও তার কোনো প্রয়োগ নেই, যার কারণে একের পর এক দীঘি বা পুকুর ভরাট করার সুযোগ নিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বর্তমানে জলাধার সংরক্ষণ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিপাইকান্দি বরোপীট জলাশয় ভরাট করে ফেলা হচ্ছে।
জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ এবং সংশোধিত আইন ২০১০-এ জলাশয় ভরাটের শাস্তি হিসেবে জেল ও জরিমানা উভয় দন্ডই ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন সংশোধনী বিল ২০১০-এ সংশোধনী আইন প্রণীত হয়েছে। সংশোধনী আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, জলাশয়ের কোনো ধরনের শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না। বিধির ৪ ধারার উপধারা ‘চ’-এ বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক জলাধার, যেমন নদী, খাল, বিল, দীঘি, ঝরনা বা জলাশয় হিসেবে মাস্টারপ্ল্যানে চিহ্নিত বা সরকার, স্থানীয় সরকার বা কোনো সংস্থা কর্তৃক সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দিয়ে বন্যা, প্রবাহ এলাকা হিসেবে ঘোষিত কোনো জায়গা এবং সলল পানি এবং বৃষ্টির পানি ধারণ করে, এমন কোনো ভূমিও এ আইনের অন্তর্ভুক্ত হবে। জলাশয় ভরাটে ২ থেকে ১০ বছরের জেল, ১ থেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা ঘোষণা করা হয়েছে সংশোধনী ওই বিলে। ভরাটকারী ভূমি দস্যুদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি পুনরুদ্ধারে ব্যবস্থা নেয়া হোক, এটাই কামনা করছে স্থানীয় সচেতন মহল।

Check Also

যে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে : বিএনপি

চাঁদপুর প্রতিনিধি :– চাঁদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সাধারণ সভায় বক্তারা বলেছেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম ...

Leave a Reply