রণাঙ্গনের বীরঃ একটি পুস্তক পর্যালোচনা

—দেলোয়ার জাহিদ

একটি পুস্তক পর্যালোচনায় সাধারনতঃ বইয়ের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, এর উদ্দেশ্য, বিষয়বস্তু এবং লেখকের উপর ফোকাস করা হয়. আর যেকোন পেশাধারী পুস্তক পর্যালোচনায় এ বিষয়গুলো থাকা খুবই তাৎপর্য্যপূর্ণ। উপস্থাপিত এ পুস্তকটি পর্যালোচনায় ও সে বিষয়গুলোকে নিরিক্ষনের বিবেচনায় নেয়া হয়েছে, যেগুলো নিম্নরূপঃ
শিরোনাম – রণাঙ্গনের বীর
মুক্তিযুদ্ধে কুমিল্লা জেলার বীর সেনাদের সাক্ষাৎকার
লেখক- শাহজাদা এমরান
প্রকাশক- জাহেরা আক্তার, মনন প্রকাশনী, বাদুরতলা কুমিল্লা
প্রকাশক কাল- ২৬ মার্চ, ২০১৪
মুদ্রণ- নেটওয়ার্ক প্রিন্টার্স, বাদুরতলা কুমিল্লা
স্বত্ব- আবীর দিবা
প্রচ্ছদ- সুলতান শাহরিয়ার
মূল্য- দুইশত বিশ টাকা
পৃষ্টা- ১১২
আইএসবিএনঃ ৯৭৮-৯৮৪-৩৩-৬৬২৭-৬
মুখবন্ধ – নিবেদন –এ, বইটি লেখায় লেখকের উদ্দেশ্যের উপর গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য প্রদান করেছেন লেখক নিজে। লেখকের প্রত্যাশা এবং নিজের বইয়ের জন্য অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে কিছু বলার সুযোগ নিয়েছেন লেখক । পাঠকদের সাথে সরাসরি কথা বলার এ সুযোগটিকে আরো নিপুনভাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত কিছু সীমাবদ্ধতার কথা বাদ দিলে নিম্নলিখিত ধারনাগুলো এরমধ্যে স্পষ্ট ফুটে উঠে, যেমনঃ
•লেখক বই সম্পর্কে কিভাবে বা কেন এসেছেন তা আলোচনায় এসেছে. এটা বিস্তারিত লিখতে হয়নি কেন নির্দিষ্টভাবে এ বিষয়টিকেই তিনি বেছে নিয়েছেন? লেখকের প্রেরণার উৎস্য কী ছিল তাও এখানে প্রশ্নাতীত! বইয়ে কথাসাহিত্যের চেয়ে জীবনবোধ সঙ্গত কারনেই এতটা বেশী।
• বইয়ের থিম এ আরো কিছু বিবরণ দেয়া যেতো এবং এগুলোকে গুছালোভাবে পাঠকদের পড়ায় আরো আগ্রহী করে তোলা যেতো।
• বইয়ের উদ্দেশ্য, কথাসাহিত্যের চেয়ে অনেকটাই প্রতিবেদনধমী, তাই সাধারন পাঠকেরা তা উপলব্ধি করতে বেগ পেতে পারেন।
• লেখায় এর যাত্রার বর্ণনা ও এর মাধ্যমে বাস্তব জীবন পরিস্থিতিতে কোন অর্ন্তদৃষ্টি কাজ করেছে তা আরো ষ্পষ্ট হলে ভাল হতো. লিখনীর প্রক্রিয়ায় লেখক হিসাবে বা ব্যক্তি হিসেবে ধারাবাহিকতায় কিছু পরিবর্তন আনলে পুস্তক হিসেবে এর প্রকাশে আরো অনেক বেশী সার্থকতা পেতো .
• বইটির স্থাপত্য নিয়ে কিছু বিষয় আমার চোখ এড়ায়নি তাহলো বইয়ে লেখার সহায়কদের ধন্যবাদ দেয়ার পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকতা স্তরের উপর ভিত্তি করে, সহকর্মী থেকে পরিবারের সদস্যদের অবধি তা বিস্তৃত করা যেতো.
এ প্রকাশনা প্রকল্পের পুরা চিন্তা ও প্রচেষ্টার একটি ধারণা দিলে এবং যেহেতু এ বইয়ের বিশেষ কোন কাঠামো নেই সেহেতু তা পড়তে সে বিষয়ে কোন পরামর্শ অন্তর্ভুক্ত করলে আমার বিবেচনায় আরো ভাল হতো.
সংক্ষেপে বলতে গেলে বানান ও ব্যাকরণগত ত্রুটিমুক্ত রাখা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে লেখকের প্রচেষ্টা লক্ষণীয়।
সূচিপত্র -বই সংগঠিত হয় এর সূচিপত্রে, লেখক এর মূল ধারণা নির্ণয়ে তা অনেক সাহায্য করে. সুচিতে কিভাবে এগুলো বিকশিত হয় তার কিছু দিক নির্দেশনা থাকে যেমন– কালক্রম (chronology) ও প্রসঙ্গোচিত (topical) ভাবে এগুলো উপস্থাপন. সাধারণ ক্ষেত্র বা রীতি, এবং কিভাবে বইটির মধ্যে তা মাপসই করা যায় এর জন্য যদি প্রয়োজন হয় তাহলে, ক্ষেত্র বিশেষে পরিচিত সূত্রের বাইরেও অন্য কোন সূত্র ব্যবহার করলে লিখনী আরো সমৃদ্ধ হয়।
লেখকের স্টাইল কি? এটি আনুষ্ঠানিক নাকি অনানুষ্ঠানিক? কথাসাহিত্যে তা স্মরণ রাখা গুরুত্বপূর্ণ কাজ, সাহিত্যে কি কি ডিভাইস লেখক ব্যবহার করেন না এসব ধারণা সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা গেলে একজন ভাল লেখক হিসেবে নিজকে তৈরী করা যায় এ প্রচেষ্টা যেকোন লেখকের নিরন্তর . প্রাসঙ্গিক ভাবে বইয়ের বিন্যাস, বাঁধাই, লেখনী, চিত্রাঙ্কন সব কিছুই পর্যালোচনার আওতায় আসে। সেখানে বিষয় ভিত্তিক ম্যাপিং এর ও কিছু বিষয় রয়েছে.
লেখক সম্পর্কে তার সুনাম, যোগ্যতা, প্রভাব, ইত্যাদি – পর্যালোচনা করা হচ্ছে বই পর্যালোচনায় প্রাসঙ্গিক এবং যা লেখকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে. সাহিত্য সময়ের দাবি এবং ক্রিটিক্যাল তত্ত্ব জ্ঞান দ্বারা তা পর্যালোচনা পুস্তককে সমৃদ্ধ করতে সহায়ক হতে পারে.

বইয়ের সারসংক্ষেপঃ বত্রিশটি পৃথক পৃথক প্রতিবেদনে মুক্তিযোদ্ধাদের চাওয়া, পাওয়া, হতাশা, ক্ষোভ ও দুঃখ-বেদনা ভরা জীবন গাথা উঠে এসেছে তাদেরই নিজ নিজ জবানীতে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাহসকিতাপূর্ণ অবদানের জন্য, স্বাধীনতার পর তাদের স্বীকৃতি ও পদক বিতরণ নিয়ে নানাহ পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ ফুটে উঠেছে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর প্রকাশিত এ প্রতিবেদনগুলোতেও। দু’জন বীরাঙ্গনার হৃদয়স্পর্শী প্রতিবেদন কোন বিবেচনায় বইয়ের শেষে স্থান পেয়েছে তা অবশ্যই লেখকের কাছে জানার গভীর আগ্রহ থাকবে। সুলতান শাহরিয়ারের নিপুন তুলিতে আকা বইয়ের প্রচ্ছদ ও মলাট বেশ আকর্ষণীয় হয়েছে। স্থানাভাবে পুস্তকের প্রতিটি প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনার সুযোগ খুবই সীমিত তাই তা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চিত রইলো।
উপসংহারে যারা জীবন বাজি রেখে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়ে গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য ছিনিয়ে আনার পাশাপাশি পাকিস্থানী হানাদারদের কাছে ছিলেন একসময় সাক্ষাৎ যমদূত তাদের অনেকেই আজো কোন স্বীকৃতি পাননি। বয়সের ভারে আর অভাব অনটনে তারা আজ ক্লান্ত, শ্রান্ত ও বিধ্বস্ত প্রায়। আবার এমন অনেকেই আছেন যারা মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত তথ্য সরবরাহ করে নানাহ সুযোগ, সুবিধা বা ফায়দা লুটছেন। এমনতর অভিযোগ তুলেছেন খোদ জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূইয়া এমপি এর মতো সরকারী দলের লোকও। মুক্তিযোদ্ধাদের গ্যালান্টারি অ্যাওয়ার্ড বিতরণ নিয়ে বৈষম্য ও পক্ষপাতিত্বের এ অভিযোগগুলোকে বরাবরই খাট করে দেখা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। সাইফুল ইসলাম তালুকদারের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনেও মহান মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭২ সালের ১৫ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে গ্যালান্টারি অ্যাওয়ার্ড বা সাহসিকতা পদক বিতরণ নিয়ে চরম পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করা হয়েছে। এ পুস্তকে ও বিষয়গুলো নতুন আঙ্গিকে নতুনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এ কাজটি অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার, লেখক নিপুনভাবে তা তুলে ধরেছেন। লেখক আমাদের আরো আশাবাদী করেছেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বন্ধুপ্রীতিম ও ভাগ্নে সফিউল আহমেদ বাবুলের কথা তার নিবেদনে উল্লেখ করে। সে সাথে সহকলমযোদ্ধাদের কথা ও। আমি নিজে আমার ব্যক্তিগত সহানুভুতি জানিয়ে অনুজ প্রীতিম লেখক সাংবাদিক শাহজাদা এমরানের ভবিষ্যতে আরো সমৃদ্ধ ও সফল প্রকাশনা আশা করি। এ পুস্তক প্রকাশনার ফলে আমার বিশ্বাস শ্রেনী বৈষম্যের শিকার মুক্তিযোদ্ধাগণ অনেক উপকৃত হবেন।
লেখক: দেলোয়ার জাহিদ, রিচার্স ফেলো, সেন্ট পলস কলেজ, ইউনির্ভাসিটি অব ম্যানিটোভা, কানাডা, একজন মুক্তিযোদ্ধা। সম্পাদক, সমাজককন্ঠ এবং সভাপতি, বাংলাদেশ প্রেসক্লাব সেন্টার অব আলবার্টা (বিপিসিএ)।

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply