তিতাসে যক্ষ্মা রোগীদের ভরসা ব্র্যাক স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি

নাজমুল করিম ফারুক :–
ব্র্যাকের স্বাস্থ্যকর্মী ও সেবিকাদের নিরলস ও নিরন্তর প্রয়াসে এক সময়ের আতংক যুক্ষ্মার প্রবাদ বদলে গেছে তিতাসের পল্লীর গ্রাম থেকে। যক্ষ্মা নিরাময়ে এখন ভরসা ব্র্যাক স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি।
তিতাস উপজেলায় ব্র্যাক ও সরকারের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচির স্বাস্থ্য সেবিকা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডটস পদ্ধতির সফলতায় এখন এমডিআর যক্ষ্মা রোগী পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। ওষুধ সরবরাহ, স্বাস্থ্যকর্মী, স্বাস্থ্যসেবিকা দিয়ে সেবা কার্যক্রম চালাচ্ছে ব্র্যাক আর ল্যাব সাপোর্ট দিচ্ছে সরকার। স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডটস কর্মসূচির আওতায় এ ল্যাব সাপোর্ট দেয়া হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিতাস উপজেলার ১৬০ জন স্বাস্থ্য সেবিকা প্রতিমাসে ২৮টি সেন্টারের মাধ্যমে সপ্তাহে দুই দিন সোম ও বুধবার কফ পরীক্ষাসহ ৭২০টি ফোরাম বৈঠকের মাধ্যমে অন্যান্য সেবা দেয়া হচ্ছে। এ বছর মার্চ পর্যন্ত তিতাস উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ব্র্যাকের সহায়তায় ৭৯৯ জনের কফ পরীক্ষা করা হয়েছে। যার মধ্যে যক্ষ্মা রোগী পাওয়া গেছে ৮১ জন। গত ২০১৩ সালে কফ পরীক্ষা করানো হয় ২ হাজার ৯৮৭ জনকে, যার মধ্যে যক্ষ্মা রোগী আক্রান্ত ছিল ৩৮১ জন। ২০১২ সালে কফ পরীক্ষা করানো হয় ১ হাজার ৯৯৪ জনকে, যার মধ্যে ২৪৬ জন যক্ষ্মা রোগী ধরা পড়ে। বর্তমানে এই উপজেলায় ১৬১ জন যক্ষ্মা রোগী ডটসের (চিকিৎসাধীন) আওতায় রয়েছে। ১৯৮৪ সালে প্রথম দেশের উপজেলাগুলোতে সমাজভিত্তিক যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি শুরু হলেও মুলত ২০০৬ সাল থেকে এ কার্যক্রম তিতাসে পরিচালিত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে দেশে বর্তমানে প্রতি লাখে ৪১১ জন মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রতি বছর নতুনভাবে আক্রান্ত হয় প্রতি লাখে ২৫ জন। তবে সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিয়ে শতকরা ৯০ ভাগ রোগীই সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন। ব্র্যাকের দেয়া তথ্যমতে, সারাদেশে সরকারিভাবে ৮৫০টি ডটস সেন্টার রয়েছে। সেন্টারগুলোতে প্রত্যেক রোগীর জন্য খরচ হয় প্রায় ৩২ হাজার টাকা। বাংলাদেশে যক্ষ্মার প্রার্দুভাব ও মৃত্যুহার ২০১৫ সালের মধ্যে অর্ধেকে নামিয়ে আনাই এ কর্মসূচির লক্ষ্য বলে জানা যায়।
উপজেলার বলরামপুর ইউনিয়নের ঐচারচর গ্রামের ডটস পদ্ধতিতে সেবা নেয়া সিদ্দিকুর রহমান জানান, হাড় ছাড়া শরীরে কিছুই ছিল না তার। কোন রোগও ধরতে পারছিলেন না চিকিৎসকরা। কর্মে অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন। অনেক টাকা নষ্ট করেছেন চিকিৎসা বাবদ। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে বিপদে পড়ে যান পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সিদ্দিক। তবে, খুব কাশি থাকায় স্থানীয় ব্র্যাকের স্বাস্থ্য সেবিকা রাহিমা বেগমের পরামর্শে কফ্ পরীক্ষা করান। পরে ধরা পরে যক্ষ্মার বিষয়টি। শুরু হয় সেবিকার মাধ্যমে ডটস পদ্ধতিতে চিকিৎসা সেবা। একটানা ৬ মাস কোন ধরনের বিরতি ছাড়াই সকালে স্বাস্থ্য সেবিকার বাড়িতে গিয়ে ওষুধ সেবন করেন। ২ মাস ডটস নেয়ার পরই জমিতে কাজ করার মতো শক্তি খুঁজে পান এবং সুস্থ হয়ে যান। সুস্থ হওয়ার পরও একবার কফ পরীক্ষা করেছেন। এর আগে চিকিৎসা চলাকালীন দুই বার পরীক্ষা করিয়েছিলেন। সিদ্দিকুর রহমানের নতুন জীবন দানে সহায়তা করার জন্য তিনি ব্র্যাক এবং স্বাস্থ্য সেবিকার প্রশংসা করেন। তিনি আরো বলেন, তার বাবা মৃত মোঃ হানিফ এবং ছোট ভাই সেলিমেও যক্ষ্মা ছিল তারা দু’জনেই ব্র্যাকের ডটস পদ্ধতিতে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে যান। বাবা সুস্থ হওয়ার কয়েকবছর পর মৃত্যুবরণ করেন। ছোট ভাই সেলিম এখন বিদেশে আছেন। তিনি সমাজের অন্যান্যদেরকে যক্ষ্মা সম্পর্কে সচেতন করছেন। ৩ সপ্তাহ বা তার বেশি সময় কাশি দেখা দিলেই ব্র্যাক সেন্টারে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
ব্র্যাকের স্বাস্থ্য সেবিকা রেহেনা বেগম জানান, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং অন্যদের চেয়ে একটু সচেতন বলেই এই কাজের সাথে জড়িত হয়েছি। বর্তমানে উপজেলার মজিদপুর ইউনিয়নের মৌটুপি গ্রামের ২০০টি খানার দায়িত্ব পালন করছি। এসব খানার লোকদের নিয়ে গঠিত স্বাস্থ্য ফোরাম-এর মাধ্যমে প্রসূতিসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, টিকা, স্যানিটেশন, পুষ্টিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতামূলক পরামর্শ এবং ওষুধ সরবরাহ করছি। বিশেষ করে যক্ষ্মা নিয়ে ফোরামের প্রতি বৈঠকে আলোচনা করা হয়। ‘কাউকে সচেতন করতে পারলে ভাল লাগে। যখন দেখি, কেউ আমার ছড়িয়ে দেয়া ‘মেসেজ’ অন্যের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। নিজেই বলতে পারছে কোন রোগের জন্য তাকে কি করতে হবে, তখন অনুভূতিটা হয় অন্যরকম-বললেন রেহেনা বেগম। প্রতি মাসে এভাবে ফোরাম করার কারণে মানুষ সচেতন হচ্ছে। যক্ষ্মা সম্পর্কে জানতে পারছে। কাশি-জ্বর-বুকে ব্যথা হলে কফ পরীক্ষা করতে আসছেন টডস সেন্টারে। অথচ আগে তাদের খুঁজে আমাদের যেতে হতো ঘরে ঘরে। একে কেউ আমলে নিতো না। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য পাল্টে গেছে। তিনদিনের বেশি কাশি হলে ব্র্যাক সেন্টারে গিয়ে সেবা নিচ্ছে।
ব্র্যাক স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচির উপজেলা ব্যবস্থাপক আব্দুর রহমান সিকদার জানান, ডটস কর্মসূচির আওতায় কোনো রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় না। একজন যক্ষ্মা রোগীকে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে সেবিকার বাড়িতে আসতে হয়। রোগী আসার পর স্বাস্থ্য সেবিকা তাকে সেবনবিধি অনুযায়ী ওষুধ খাইয়ে দেন। যদি কোনো কারণে রোগী সেবিকার বাড়িতে হাজির না হয়, তবে সেবিকা রোগীর বাড়িতে গিয়ে তাকে ওষুধ খাইয়ে দেন। তবে রোগীকে নিয়ে উদ্ভূত কোনো সমস্যার সমাধান সেবিকার পক্ষে দেয়া সম্ভব না হলে তিনি নিকটস্থ ব্র্যাক অফিস বা পিওকে অবহিত করেন। এছাড়া কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবর পাওয়া গেলে রোগীকে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যান।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, এক সময়ে মহামারী হিসেবে পরিচিত ছিল ‘যক্ষ্মা’ রোগ। প্রবাদ ছিল ‘যক্ষ্মা হলে রক্ষা নাই’ সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন নতুন ওষুধ উদ্ভাবনীর ফলে পরিবর্তন হয়েছে যক্ষ্মা রোগের এই প্রবাদ। বর্তমানে ‘যক্ষ্মা হলে রক্ষা নাই এই কথার ভিত্তি নাই’। তাই এখন আর যক্ষ্মা মহামারী নয়; নিয়মিত ওষুধ সেবন ও চিকিৎসকের পরামর্শেই এ রোগ থেকে মুক্তি মিলছে। যক্ষ্মা রোগ থেকে মুক্তির মিছিলের প্রধান ভূমিকায় রয়েছেন স্বাস্থ্য সেবিকারা। তারা ডটস পদ্ধতির মাধ্যমে যক্ষ্মা রোগীকে আরোগ্য করে তুলছেন। শুধু যক্ষ্মা রোগ থেকেই মুক্তি করাচ্ছে তা নয়, দিচ্ছে স্বাস্থ্য সমস্যার অন্যান্য পরামর্শ। এক কথায় স্বাস্থ্য সেবিকারা মানুষের দোড়গোরায় স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। সরকারের আন্তরিকতা ও ব্র্যাকের এ কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে শুধু তিতাস নয় সারা দেশ থেকে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ ও নিমূল হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Check Also

দাউদকান্দিতে গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু

হোসাইন মোহাম্মদ দিদার :কুমিল্লার দাউদকান্দিতে শান্তা বেগম (২৪) নামে এক গৃহবধুর রহস্যজনক মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। ...

Leave a Reply