মুরাদনগরে ছেলেকে বাচাতে নিহত মেয়ের লাশ সনাক্ত করেনি পরিবার : পাঁচ মাসপর মিলল বেওয়ারিশ লাশের ওয়ারিশ!

মুরাদনগর (কুমিল্লা) প্রতিনিধি:–
কুমিল্লার মুরাদনগর এলখাল গ্রামের একটি পুকুর থেকে বি-বস্ত্র এক মেয়ের লাশ উদ্ধার করে থানা পুলিশ গত ২৮ নভেম্বর ২০১৩ ইং তারিখে। ঐ সময়ে লাশের কোন ওয়ারিশ না পেয়ে পুলিশ তার দাফন করে  বেওয়ারিশ হিসাবে। গত বুধবার পর্যন্ত  লাশের ওয়ারিশ, হত্যার  কারণ ও অপরাধীর সন্ধান এইসব বিষয় পুলিশের কাছে ছিল অজানা কাগজে-কলমে। হঠাৎ করে গত বৃহস্পতিবারে মিলল বেওয়ারিশ লাশের ওয়ারিশ।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, উপজেলার কুরবানপুর গ্রামের বাসিন্দা বজলু মিয়া তাঁর স্ত্রী সালেহা বেগমসহ তিন ছেলে ও এক মেয়ে ছিল।
মেয়েটির বিয়ের বয়স হলে, বিবাহ দিয়েছিলেন,পাশের বলীঘর গ্রামের রহিম মিয়ার ছেলে ইকবাল হোসেনের সঙ্গে।
সালেহা বেগম (লাকির মা) জানান, মেয়েটিকে বিবাহ দেয়ার কয়েক মাস পর আমরা জানতে পারি আমাদের মেয়ের জামাই নেশায় আশক্ত। রাত্রে বাড়িতে বন্ধুদেরকে নিয়ে নেশা ও জুয়ার আসর বসিয়ে রং-ঢং করতো। আর আমার মেয়েকে বলতো তার বন্ধুদের সময় দিতে। তাতে রাজি হতো না আমার মেয়ে, তাই প্রতিনিয়ত সে তাকে নির্যাতন করতো। তার নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেলেই মেয়ে আমার কাছে চলে আসতো। পরে বুঝিয়ে-শুনিয়ে তাকে আবার স্বামীর বাড়িতে পাঠাতাম। এভাবে কয়েক মাস চলতে থাকার পর এক পর্যায়ে ইকবালের অবস্থার চরম অবনতি দেখে, মেয়ে বাধ্য হয়ে তার সংসার থেকে চলে আসে। এর পর থেকেই বখাটে ইকবাল আমার মেয়েকে মোবাইল ফোনে হুমকি দিত। ভয় দেখাতো তোলে নিয়ে মেরে ফেলার। আর আমাদেরকে চোখ রাঙ্গাতো দেখে নিবে বলে। এভাবে কয়েক মাস অতিবাহিত হওয়ার পরে ছলে-বলে কৌশলে শেষ বারের মতো একটি সুযোগ দিলে ভাল হয়ে যাবে এই বলে, আমার মেয়েকে সে নিতে চাইল। পরে গত ২৮ নভেম্বর ২০১৩ ইং তারিখে, আমারই দেবরের ছেলে কবিরের মধ্যস্থতার মাধ্যমে লাকিকে নিয়ে যায় ইকবাল। আমার বাড়ি থেকে যাওয়ার এগার দিন পর (৯ ডিসেম্বর ২০১৩ ইং ) খবর আসে, আমার মেয়ে লাকির মৃত দেহ এলখাল গ্রামের একটি পুকুরের পানিতে বাসছে। এই বলেই সে মাটি চাপরি বিলাপ শুরু করলো।
লাকির ভাই আমির হোসেন জানান, বোনের মৃত সংবাদ শুনে আমরা ছুটে যাই। গিয়ে দেখি তার শ্বশুরবাড়ীর পাশেই একটি পুকুরে বি-বস্ত্র অবস্থায় তার মৃতদেহ। তার মৃত্যুর এই করুণ দৃশ্য দেখে এলাকায় ছিল শোকের আবহ , আর আমাদের পরিবারে ছিল শোকের মাতম। তাকে জড়িয়ে কান্না করতে পরলেও সৌভাগ্য হয়নি কাঁদে নিয়ে মাটি দেয়ার। ঘটনাস্থলে পুলিশ আসার আগেই, এই গ্রামের এক প্রভাবশালী ব্যাক্তি আমার মুঠো ফোনে ফোন করে বলেন, যে যাবার সে চলে গেছে। বাড়িতে চলে যা। এই নিয়ে পুলিশের কাছে মুখ খুললে পরিনাম ভাল হবে না। পুলিশ যদি জানতে পারে এই লাশ তোদের, তাহলে তোর ভাইকে হারাবি। তোর যেই ভাইকে  আমি মালোশিয়া পাঠাইছি তাকে সেখানেই শেষ করে দিব। এই বলে হুমকি দেয়। বাবা বৃদ্ধ, আমি বেকার, আরেকটি ভাই ছোট। একমাত্র উপার্জন কারী ভাইয়ের কথা চিন্ত করে মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। কারণ, তারা খুব ভয়ংকর প্রভাবশালী লোক। পরে জানতে পাড়ি, পুলিশ এসে আমার বোনের লাশটি নিয়ে যায় অজ্ঞাত পরিচয়ে। ঘটনার ঐ দিন থেকেই আমার দুলাই ইকবাল ছিল পলাতক।
আবারও কথা হয় লাকির মায়ের সাথে, ঘটনা ঘটে যাওয়ার এত দিন পরে কেন অভিযোগ করলেন? এমন প্রশ্নে, তিনি জানান, আমার ছেলে হারানোর ভয়ে এতদিন মুখ খুলিনাই। মালোশিয়ার যে জায়গায় আমার ছেলে কাজ করতো এখন আর সেখানে সে নেই। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, তাদের সাবাইকে চিনেন ? এমন প্রশ্নে, তিনি বলেন, ‘কবির ও ইকবালকে চিনি।
ঐ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বন কুমার শীব জানান, শুনেছি অনেক দিন আগে এলখাল গ্রামে পুকুর থেকে একটি মেয়ের লাশ পাওয়া গেছিল। তবে পরে তার কোন অভিবাবক না পেয়ে পুলিশ বেওয়ারিশ হিসাবে তাকে দাফন করেছিল।
মুরাদনগর থানার  ওসি নাজিম উদ্দিন জানান, এই বিষয়টি আমি এস আই কাদের কে তদন্তভার দিয়েছি। এই নিয়ে যাতে কেউ এলাকার নির্দোষ ব্যক্তি কে অহেতুক হয়রানি করতে না পারে , সে দিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি আছে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply