গজারিয়ার মেঘনায় লঞ্চডুবিতে ৩১ লাশ উদ্ধার : উদ্ধাকাজের ধীরগতিতে স্বজনদের ক্ষোভ

শামসুজ্জামান ডলার :–

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে গজারিয়ার মেঘনা নদীতে ডুবে যাওয়া লঞ্চ শুক্রবার রাত ৮টা পর্যন্ত করতে পারেনি। উদ্ধার কাজের ধীরগতির কারনে স্বজনদের বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে।  এমভি মিরাজ-৪ লঞ্চডুবিতে ইতিমধ্যে ৩১ লাশের সন্ধান মিললেও এখনো নিখোঁজ রয়েছে দেড় শতাধিক।

বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান শাসছুদ্দোহা জানান, মেঘনার তলদেশে স্রোত, দমকা হাওয়া কারণে উদ্ধার কাজ ব্যহত হচ্ছে। যদিও আগে মনে করা হয়েছিলো সন্ধ্যা নাগাদ উদ্ধার কাজ শেষ করা যাবে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে শেষ হতে মধ্যরাত পর্যন্ত লাগতে পারে। তিনি আরো জানান, উদ্ধারকারী দলের ডুবুরিরা প্রথমে লঞ্চটি থেকে মালামাল সরিয়ে কিছুটা হালকা করবে। এতে উদ্ধার কাজ অনেকটা সহজ হবে। যদি ভেতরে কোনো লাশ থাকে সেগুলোকে অক্ষত অবস্থায় স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিতে খুব ধীর ধীরে টেনে আনা হচ্ছে লঞ্চটিকে। গতকাল শুক্রবার লঞ্চটি টেনে তোলার চেষ্টা করার একপর্যায়ে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে একপাশের রশি ছিড়ে লঞ্চটি আবার সম্পূর্ণ তলিয়ে যায়। লঞ্চটির উদ্ধার কাজ দেরী হওয়ার এটিও অন্যতম কারন। উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয়কে সহযোগীতা করছে দুর্বার ও দুরন্ত। রাত ৮টা পর্যন্ত লঞ্চটি উল্টো অবস্থায় থাকার কারনে উদ্ধার কাজ বিলম্ভিত হচ্ছে। কেননা, লঞ্চটি উল্টো অবস্থায় থাকার কারনে এর দরজা-জানালা সবই বন্ধ আছে। লঞ্চটির ওজন প্রায় ১২৭ টন হলেও উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয়ের ধারণ ক্ষমতা রয়েছে ২৫০ টন।
গত বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে গজারিয়া উপজেলার দৌলতপুর গ্রাম সংলগ্ন মেঘনা নদীতে এ লঞ্চডুবির ঘটনায় ইতিমধ্যে ৩১টি লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এরমধ্যে ২৬ জনের লাশ শনাক্ত শেষে তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দু’জনের লাশ হাসপাতালের মর্গে ও অপর একজনের লাশ উদ্ধার করে মেঘনা পাড়ে রাখা হয়েছে।
লাশের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে অর্ধশতাধিক।

নিহতরা হলেন- জামাল শিকদার (৫০) ও তার ছেলে আবির (১১), সেতারা বেগম (৫৫), টুম্পা বেগম (২৬), শিশু মাহি, শিশু সুমনা, জলিল মালত (৫০), মানিক (১৪), আব্দুল্লাহ আল-রেদওয়ান (৪০), রাফিয়া বেগম (৬০), খোরশেদ আলম খোন্দকার (৭৫), ওসমান গণি মোল্লা (৭০), ইসমাইল ফকির (৬০), কৃষ্ণ কমল দাস (৫০), আব্দুল জলিল (৫৫), তাসলিমা আক্তার রিয়া (২৫), রাশিদা বেগম (৫৬), লাইলী বেগম (৫৫), ঋতু (২৪), আব্দুল মান্নান দেওয়ান (৬৫), লক্ষী রানী দাস (৮৫), রজিয়া (৩২), শিশু রুমান, আব্দুল জলিল খান (৭০), মিন্টু সুখানী (৪০), মাসুম (৩৮), রিমা আক্তার(৩২)সহ  সর্বমোট ২৯ জন।
এদের সবারই বাড়ি শরীয়তপুরের বিভিন্ন এলাকায় হলেও এদের অধিকাংশই ঐ জেলার নড়িয়া থানার বাসিন্দা। এরমধ্যে মিন্টু সুকানী(৪০)এরবাড়ী মতলবের দামদর্দি এলাকায়। গতকাল বাদ আসর মতলব উত্তর উপজেলার চরকালিয়া ঈদগাঁহ মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নিহত টুম্পার স্বামী লিটনও ওই লঞ্চে ছিলেন। তিনি জানান, তার ৮ বছরের মেয়ে সুমনা ও ৬ বছরের ছেলে মাহিম এখনো নিখোঁজ রয়েছে। খোজ-খবর নিয়ে জানা যায়, এ লঞ্চটি এর আগেও ২বার দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল।

                                                                                ওরা ক’জন বন্ধু মিলে
খোরশেদ, সাইদুর, মহসিন, নাজমুল, মাহবুবসহ ওরা ১০/১২ জন বন্ধু মিলে দেখিয়ে দিলেন যে মানুষ মানুষেরই জন্যে। নিজ নিজ পকেট থেকে কিছু টাকা একত্রিত করে তারা স্থানীয় (৩কিলো দূর) দৌলতপুর বাজার থেকে বেশকিছু শুকনো খাবার নিয়ে চলে এলেন লঞ্চডুবির ঘটনাস্থলে।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে উদ্ধার কাজ চলছে আর লঞ্চডুবিতে নিখোঁজদের অপেক্ষায় মেঘনা তীরে অপেক্ষা করছেন শত শত স্বজন। যারা এসেছেন এক কাপড়েই। কারো পকেটে টাকা নেই অথবা থাকলেও কিনে আনার মানসিক অবস্থা নেই। আশেপাশে দোকানপাট থাকলেও তবু কেউ কিনে খেতে পারতেন। এখানে সেই সুযোগও নেই। কেননা, দোকান-পাট সেতো অনেক দূর। কেনা খাবার অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের মধ্যে এসব খাবার ও পানি বিতরণ করলেন তারা।

                                                                 অসুস্থ মাকে দেখে বাড়ি ফেরা হলো না টুম্পার
সদর ঘাট থেকে শরীয়তপুর ফেরার পথে লঞ্চ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে অকাল মৃতূ টুম্পা বেগমের। লঞ্চ দুর্ঘটনার পর টুম্পার লাশ স্থানীয় গ্রামবাসীর সহায়তায় উদ্ধার করা গেলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছে তার মেয়ে সুমনা (৮) ও ছেলে মানিহ (৬)।
স্ত্রী টুম্পা বেগমের লাশের পাশে বসে স্ত্রী ও সন্তানকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে রয়েছেন স্বামী কাজী লিটন।

অনেক কষ্টে লিটনের সাথে কথাহলে কান্না জড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, অসুস্থ্য শ্বশুড়িকে দেখতে ঢাকায় যাওয়া হয়েছিল। তাকে দেখে স্ত্রী টুম্পা বেগম, মেয়ে সুমনা ও ছেলে মানিহকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলেন তারা। এসময় ঝড়ে আকস্মিক লঞ্চ ডুবে স্ত্রী টুম্পা বেগম মারা গেলে স্থানীয় গ্রামবাসী তার লাশ উদ্ধার করেছে। এখনও দুই সন্তানকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। লিটন এখন তার ছেলে মেয়ের লাশ পাওয়া আশায় মেঘনার বুকে নির্বাক চেয়ে রয়েছেন।

                                                                     লঞ্চেই উত্থান, লঞ্চেই মরন
লঞ্চ ব্যবসায়ী আনোয়ার ঢালী। বয়স যার (৪৫)। দীর্ঘ্যদিন ইতালীতেও ছিলেন তিনি। এমভি রিয়াজ-২ নামক লঞ্চটিসহ তার মোট লঞ্চ রয়েছে ৬টি। লঞ্চ ব্যবসায়ী আনোয়ার ঢালী নিয়তির লিলা খেলায় গত বৃহস্পতিবারের মেঘনায় ডুবে যাওয়া এমভি মিরাজ-৪ লঞ্চের যাত্রী হয়ে উঠে সেই লঞ্চেই মারা গেলেন।

এমভি মিরাজ নামক লঞ্চের চার নম্বর কেবিনের যাত্রী ছিলেন এই আনোয়ার ঢালী। ব্যবসায়িক কাজে ঢাকায় গিয়েছিলেন। বাড়ি ফেরার আগে কথা হয়েছে শ্বশুর ইদ্রিস ব্যাপারির সঙ্গে। কিন্তু একবারও হয়তো ভাবতে পারেনি যে লঞ্চ ব্যবসার মাধ্যমে জীবনের উত্থান সেই লঞ্চেই জীবনের চূড়ান্ত পতন মৃতূনেমে আসবে।

Check Also

কুমিল্লায় তিন গৃহহীন নতুন ঘর পেল

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ– কুমিল্লা সদর উপজেলায় গ্রামীণ উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে ৪নং আমড়াতলী ইউনিয়নের গৃহহীন নুরজাহান বেগম, ...

Leave a Reply