মায়ের মতো আপন কেহ তিন ভুবনে নাই (আজ বিশ্ব মা দিবস)

—–আবদুর রহমান:
“মায়ের মতো আপন কেহ নাই। মা জননী নাইরে যাহার তিন ভুবনে তাহার কেহ নাই”। ডিজিটাল যুগে আজ মায়ের এমন দরধী-মরমী গানগুলো কালের গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সন্তানের প্রতি মায়ের অগাধ ভালবাসা পৃথিবী যতদিন থাকবে ততদিন অটুট থাকবে। তারপরও আমাদের বাংলাদেশে কয়েক বছর আগে স্কুলে পড়–য়া এক ছেলেকে পরকিয়া প্রেমিকার সহযোগীতায় নিষ্টুরভাবে গলা টিপে হত্যা করেছে মা জাতীর কলঙ্ক এক নারী। এমন নিষ্টুর মা দের জন্য গোটা মা জাতি আজ কলঙ্কিত। প্রতি বছর ইংরেজী মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্ব মা দিবস পালিত হয়। আজ রোববার ১১ মে বিশ্ব মা দিবস। পৃথিবীর নানা দেশে মাকে উপলক্ষ করে পালিত হয় দিবসটি। আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগেও অনেক জায়গায় পালিত হতো মা দিবস। তবে তখনকার মা দিবস এখনকার মতো ছিল না। তখন দেবীদের মা হিসেবে পূজা করা হতো। ১৬’শতকে ইংল্যান্ডে মা দিবস পালন করা হতো। প্রায় দেড়শ’ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে আনা মার্ভিস নামের এক নারী মায়েদের অনুপ্রাণিত করার মাধ্যমে গরিবদের স্বাস্থ্য সচেতন করে তুলতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। ১৮৭০ সালে আমেরিকার জুলিয়া ওয়ার্ড হাও নামের এক গীতিকার মা দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। ১৯০৫ সালে আনা মার্ভিস মারা গেলে তার মেয়ে আনা মারিয়া রিভ্স জার্ভিস মায়ের কাজকে স্মরণীয় করতে সচেষ্ট হন।  ১৯০৭ সালের মে মাসের দ্বিতীয় রোববার ছিল আন্নার মা আনা মারিয়া রিভ্স জার্ভিসের মৃত্যুবার্ষিকী। সেই দিনটিকে আন্না মা দিবস হিসেবে পালন করেন। এরপর তিনি এই দিবসটিকে মা দিবস ঘোষণা করার জন্য দেশের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সরকারের নিকট চিঠি লিখতে শুরু করেন। এরপর আন্নার একক প্রচেষ্টায় পেনসিলভেনিয়া ও ভার্জিনিয়ার কয়েকটি গির্জায় পালিত হয় মা দিবস। ১৯১৪ সালে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোব বারকে জাতীয় মা দিবসের মর্যাদা দেন। ১৯৬২ সাল থেকে দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে মা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। মা দিবসের পেছনের ইতিহাস যাই হোক না কেন, মায়ের জন্য দিনটিকে চাইলেই আপনি পালন করতে পারেন আলাদা ভাবে। ছোট থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি মা তাদের সন্তানের জন্য যে ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করেন, আমরা কি পারি মায়েদের যথাযথ মূল্য দিতে? কর্পোরেট দুনিয়ার হাতছানিতে অবিরাম ব্যস্ততায় হয়তো সময়ই দেয়া যায় না মাকে। অথচ প্রতিটি মা-ই চান তাদের নিজ নিজ সন্তান মুহুর্তের জন্য হলেও এসে পাশে বসুক। একটু সময় কথা বলুক।
তাই কবির ভাষায়—-
“নয়ন সম্মুখে তুমি নাই
নয়নের মাঝখানে নিয়েছো যে ঠাঁই।”
‘মা’ ছোট্ট একটি শব্দ। অথচ এর অর্থ ব্যাপক। সবচেয়ে আপন মানুষটিকে আরও বেশি ভালোবাসার, আরও বেশি করে মনে করার দিন। সন্তানের জন্য গর্ভধারিণীকে বিশেষভাবে ভালোবাসার আসনে কোনো বিশেষ দিন থাকে না। তারপরও নানা সূত্রে মায়ের অপার মহিমা তুলে ধরারও একটি দিন এসে গেছে। বিশ্বজুড়ে সন্তানরা আজ মাকে ভালোবাসবে প্রতিদিনের মতো। কিন্তু এই দিনটির কথা মাথায় থাকবে যাদের তাদের মধ্যে কাজ করবে মাকে ভালোবাসার ও তার কাছে ঋণের কথা ভেবে উদ্বেল হওয়ার বাড়তি এক প্রেরণা। মা তার মাতৃচর্চার কত স্নেহে, কত যতেœ লালন করে মানুষ নামের একটি ছোট্ট মাংসপিন্ডকে জন্ম দেয় এই সুন্দর পৃথিবীতে। মাকে ভালোবাসা শুধু মুখের কথার মধ্যে প্রকাশ করা নয়। তার প্রতিটি ইচ্ছা পূরণ করার চেষ্টা করা, তার কাজের মর্যাদা দিতে হবে। ‘মা’ তার সন্তানকে জন্ম থেকে শুরু করে আমরণ চিরন্তন সত্তাবোধে সন্তানের প্রতি মমত্ববোধ থেকে বিচ্যুৎ হন না। সর্বদা ভালোবাসা অক্ষুন্ন থাকে। তাই মাকে ভালোবাসার জন্য শুধু একটি দিন যথেষ্ট নয়। এ তো প্রত্যেক দিনের, চিরদিনের, চিরকালের। মাতৃঋণ কোনোভাবেই শোধ করার নয়। সন্তানের সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু মায়ের পর আর কেউ নয়। ‘মা’ পরিপূর্ণতা পায় তার সন্তানের কাছ থেকে। আজকের দিনে অনেক ভালোবাসা মায়ের জন্য। তাই কবির ভাষায় আমার এই পঙ্গতি—
‘জননী তোমার করুণ চরণ খানি,
হেরিনু আজি এ অরুণ কিরণ রূপে,
জননী, তোমার মনোহরণ বাণী।
নীরব গগনে ভরি উঠি চুপে চুপে।
তোমারি নমি হে সকল ভুবন মাঝে।
তোমারি নমিছে সকল জীবন কাজে।’
সুতরাং মা দিবসে অন্য দিনের তুলনায় একটু আলাদাভাবে সময় দিতে পারেন মাকে। (ক). মাকে নিয়ে কোথাও বেড়িয়ে আসতে পারেন, কাছেই কোথাও। (খ). মায়ের জন্য কিনতে পারেন তার পছন্দের কোনো জিনিস। (গ). আপনি যদি মেয়ে হন তাহলে মাকে তার নিত্যকাজ থেকে আজকের দিনের জন্য বিশ্রাম দিতে পারেন। করতে পারেন মায়ের পছন্দের কোনো খাবার রান্না। (ঘ). মাকে ছবি এঁকে উপহারও দেয়া যেতে পারে। (ঙ). সময় করে নিয়ে মায়ের কোনো প্রিয় গল্পের বই পড়ে শোনাতে পারেন তাকে। এতে আনন্দ পাবেন তিনি। (চ). আপনি মাকে ছেড়ে দূরে থাকলে অবশ্যই তাকে ফোন করতে ভুলবেন না। অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশিই সময় দিন এই দিবসটিকে ঘিরে। মায়ের জন্য শুধু একটি দিন নয়। আমাদের জীবনের প্রতিটি দিনই হোক মায়ের জন্য। মা দিবসে এই মূলমন্ত্র জাগরিত হোক সবার মনে। কারণ মা-ই যে প্রতিটি সন্তানের শেষ আশ্রয়। আমাদের সমাজে এমন অনেক মা রয়েছেন তাদের সন্তান নেই। কিন্তু সারা জীবন সংসার করেছেন কখনো দ্বিতীয় বিয়ের কথা চিন্তুও করেননি। নিঃসন্তান মাকে বাণী শুনানোর মতো কেউ নেই বিশ্ব মা দিবসে। ঘুম, খুন, অপহরণসহ যে মা সন্তান হারা এবং নিঃসন্তান মাকে শতকুটি ভক্তিপূর্ণ সালাম রহিল।

====================================
লেখকঃ সাবেক শিক্ষার্থী, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কোটবাড়ি, কুমিল্লা।
ই-মেইল : m.a.rahman33@gmail.com
মোবাইল : ০১৫৫২ ৪৬ ৩৬ ১১

Check Also

মিনি ওয়াক-ইন-সেন্টারের মাধ্যমে রবি’র গ্রাহক সেবা সম্প্রসারণ

ঢাকা :– গ্রাহক সেবাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মোবাইলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটা লিমিটেড সম্প্রতি মিনি ওয়াক ...

Leave a Reply