ভেজাল জ্বালানি তেল দিয়ে চলছে তিতাস ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র ॥ যেকোনো সময় বিকল হতে পারে

নাজমুল করিম ফারুক :–
কুমিল্লার তিতাস উপজেলার ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভেজাল জ্বালানি তেল সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ অভিযোগে তেল বুঝে রাখা কমিটির এক সদস্য সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন। কেন্দ্রের যন্ত্র পরিচালনার সহযোগী প্রতিষ্ঠান চীন-বাংলাদেশ জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি ফুজিয়ানা অ্যান্ড সিসিসির অপারেশন ব্যবস্থাপক এক্সিজলিন লিঃ এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ২০১০ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিতাস ৫০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্লান্টের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ফুজিয়ানা অ্যান্ড সিসিসি ইস্টার্ন এটি নির্মাণ করে। ২০১১ সালের ৮ আগস্ট এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত অথবা চাহিদা অনুযায়ী এর চেয়ে বেশি সময়ে চালু রেখে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তিতাস ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে ছয়টি যন্ত্র দিয়ে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। কেন্দ্রের ছয়টি যন্ত্র চালাতে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় দুই হাজার ৪০০ লিটার জ্বালানি তেল প্রয়োজন হয়। যা লিটার প্রতি মূল্য ৭২ টাকা। এই তেল ক্রয় এবং ঠিকাদারের কাছ থেকে বুঝে রাখার জন্য চার সদ্যস্যের একটি কমিটি রয়েছে। এ কমিটির সভাপতি হলেন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক (নির্বাহী প্রকৌশলী) মো. আরিফুর রহমান। তিনি চলতি বছরের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাত কোটি টাকার ভেজাল তেল কেনেন।
কেন্দ্রের একটি সূত্র জানায়, আগে প্রতি ঘণ্টায় বর্জ্য বের হতো শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ। এখন প্রতি ঘণ্টায় প্রায় এক ভাগ বর্জ্য বের হচ্ছে। এই বর্জ্য গিয়ে মিশছে গোমতী নদীতে। এতে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। এর ফলে এই পানির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিরা নানা ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। জলজপ্রাণীদের উপর বিরুপ প্রভাব ফেলছে।
এদিকে তেলের মান অত্যন্ত নিম্ন হওয়ায় চীন-বাংলাদেশ জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি ফুজিয়ানা অ্যান্ড সিসিসির অপারেশন ব্যবস্থাপক এক্সিজলিন লিঃ গত ২৯ এপ্রিল অভিযোগপত্র দিয়েছেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, নিম্নমানের এই তেল দিয়ে কেন্দ্র চালালে ছয়টি যন্ত্র যেকোনো সময় বিকল হতে পারে। তাই দ্রুত নিম্নমানের তেল সরবরাহ বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়ে কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে একটি অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন।
সূত্র আরো জানায়, ভেজাল তেল গ্রহণ করায় গত ২৮ এপ্রিল তেল বুঝে নেওয়া কমিটির সদস্য ও কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল আমান পদত্যাগ করেন।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রচালক (অপারেটর) মো. সগির আহমেদ ভুঁইয়া বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ঠিকাদার থেকে যে সাত কোটি টাকার তেল বুঝে রেখেছেন সেই তেলের মধ্যে পানি, বালু, পাথর ও পোড়ামবিল রয়েছে। প্রতিদিন মেশিন চালানোর সময় ছাঁকনি দিয়ে তেল শোধন করা হয়। প্রতি ঘণ্টায় ১০০ লিটার পানি ও ১০০ লিটার অন্য বর্জ্য পাওয়া যায় বলে তিনি দাবী করেন। শুধু তাই নয়, আরিফুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই বিঘা বিদ্যুৎকেন্দ্রের পার্শ্ববর্তী খালি জমি থেকে প্রায় ছয় লাখ টাকার মাটি কোনো দরপত্র আহ্বায়ন ছাড়া বিক্রি করে দেন।
চীন-বাংলাদেশ জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি ফুজিয়ানা অ্যান্ড সিসিসির প্রতিনিধি প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন বলেন, বর্তমানে যে তেল দিয়ে মেশিন চালানো হয় তা দেখে মনে হয় নিম্নমানের। তবে এটা দেখার দায়িত্ব কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের।
এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক (নির্বাহী প্রকৌশলী) মো. আরিফুর রহমানের বক্তব্য নিতে গেলে তিনি সাংবাদিকদের সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে বলেন, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি নিয়ে আসেন, তারপর কথা বলব।
কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. আজিজুল হক বলেন, তেলে ভেজাল আছে কি না তা পরীক্ষা করার জন্য আমাদের যন্ত্রপাতি নেই। তবে তেল বুঝে রাখার জন্য ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজার (নির্বাহী প্রকৌশলী) মো. আরিফুর রহমানকে সভাপতি করে চার সদস্যের একটি কমিটি রয়েছে। এ কমিটি যদি সরবরাহ করা তেল রাখতে কোনো গাফিলতি করে, তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply