এসো নিজস্ব সংস্কৃতিকে হৃদয়ে লালন করি

—-মো. আলী আশরাফ খান
মানুষ এই পৃথিবীতে জন্ম লাভের পর থেকেই সমাজ গোত্র ভেদে নিজ নিজ সংস্কৃতিকে লালন করে চলছে। যদিও সময় ও পরিবেশ পরিবর্তনের ফলে সংস্কৃতিরও বেশ সংযোজন ও বিয়োজন আমরা লক্ষ্য করে থাকি। তারপরেও প্রত্যেক জাতি গোষ্ঠীরই জন্ম ইতিকথার মধ্যে নিহিত থাকে স্ব-স্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি। প্রত্যেকেই স্বভাবসিদ্ধভাবে স্ব-জাতীয় বৈশিষ্ট্যকে সমুজ্জ্বল রাখতে নিরন্তর চেষ্টায় ব্রত হবে এটাই স্বাভাবিক। আর যদি এর ব্যতিক্রম হয়ে অন্য জাতি-গোষ্ঠীর আচার-আচরণ ও কৃষ্টির চর্চায়, কোনো ব্যক্তি-গোষ্ঠী-জাতি অনুশীলন শুরু করে কিংবা অতি উৎসাহি হয়, তাহলে সেই ব্যক্তির-গোষ্ঠীর-জাতির নিজস্ব কোনো ভীত বা নিজস্ব কোনো স্বকীয়তা বলতে কিছু বজায় থাকে না। কাজেই নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি ব্যতীত কোনো জাতি-গোষ্ঠীর গর্ব করার মত কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। অথবা সেই জাতি বুক ফুলিয়ে বলতে পারে না-আমরা বড়, আমরা সভ্যতার সঠিক চর্চা করছি ইত্যাদি ইত্যাদি।
তেমনি আমাদের বাঙালিদেরও রয়েছে সর্বক্ষেত্রে স্বকীয়তা-ঐশ্বর্যতা। যা উজ্জ্বল অতি উজ্জ্বল হয়ে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে স্ব-গৌরবে স্ব-মহিমায়। আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়-আমরা বাঙালি। এই বাঙালিত্বেরও রয়েছে এক সু-দীর্ঘ ইতিহাস। যে ইতিহাস বলে দেয় যে, আমরা কোনো ঠুনকো জাতি নই যে ইচ্ছে করলেই অন্য কোনো জাতির কৃষ্টির চর্চায় ধন্য হবো, উন্নত হবো। বরং নিঃসন্দেহে বলা যায়, অন্য সংস্কৃতির চর্চায় আমরা অন্ধকারে পতিত হবো। এককথায়, আজ বাঙালির প্রাণের দাবি, আর নয় বিজাতীয় সংস্কৃতির চর্চা, আর নয় পরগাছা হয়ে বেঁচে থাকা, বাঙালিত্ব হৃদয়ে লালন করে গড়তে হবে এক নির্জলা বাঙালি সমাজ। আর এতে করে আমরা প্রকৃতই উন্নত হবো। অন্য কোনো মন্ত্র-তন্ত্র অথবা অন্য কোনো সংস্কৃতির অনুকরণ-অনুসরণ আমাদেরকে কখনই উন্নত করতে পারবে না-এটা আমাদের বুঝতে হবে।
আমাদেরকে সামগ্রীকভাবে উন্নতির পথে এগোতে হলে সর্বাগ্রে জানতে হবে, নিজস্ব সংস্কৃতি তথা উৎপত্তির ইতিকথা। জানতে হবে, আমাদের বাঙালি কৃষ্টি-সংস্কৃতি, বাংলা সন ও ইতিহাস। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক দেশ-জাতি-গোষ্ঠিরই নিজস্ব এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকে, যার গবেষণা লব্দ নির্যাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম চর্চার মধ্য দিয়ে জাতির আর্থ-সামাজিক উন্নতি লাভের পথকে সুগম করে; জাতি সামগ্রিকভাবে বড় হয়ে ওঠে; শিক্ষা-দীক্ষায় আলোকিত হয়ে বিশ্ব নের্তৃত্বভার গ্রহণ অতঃপর উচ্চাসনে নিজেদেরকে অধিষ্ঠিত করে। পুরু জাতি সম্মানিত বোধ করে তখন নিজস্ব অর্জনের বিষয়সমূহ নিয়ে। তেমনি আমাদের বাঙালিদেরও রয়েছে স্বর্ণজ্জ্বোল ইতিহাস-ঐতিহ্য। এর মধ্যে বাংলা সনই হচ্ছে আমাদের মূল ঐতিহ্যের  ভা-ার।
অনেকেরই জানার কথা, বাংলা বছরের জন্ম হয়েছিল মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে। সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রচলন শুরু করেছিলেন হিজরী ৯৬৩ সন মোতাবেক ১৫৫৬ খৃস্টাব্দ থেকে। ওই হিজরী সনকেই বাংলা সালের মূল ভিত্তি বা জন্মসাল ধরা হয়। যদিও আজ আমাদের জীবনধারায় বিজাতীয়-ইংরেজী সন যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে চলছে, তারপরেও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদেরও রয়েছে নিজস্ব সন-নিজস্ব সত্তা ও নিজস্ব সংস্কৃতি-কৃষ্টি। যে সত্তা বা সংস্কৃতির মূল শিকড়ের সন্ধানে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে বাংলা তথা হিজরী সনের কাছেই।
ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা লক্ষ্য করি, বাঙালির ইতিহাসের মতো বাংলা সনের ইতিহাসেও রয়েছে অস্পষ্টতা। কারণ, যথাযথ সংরক্ষণ কিংবা লিপিবদ্ধতার খামখেয়ালীপনাকেই দায়ী করতে এর জন্য। তারপরও বিশিষ্ট ইতিহাসবিদদের মতে, সম্রাট আকবরই ছিলেন বাংলা সনের প্রবর্তক। ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোঘল সাম্রাজ্যের সীমানার মধ্যে বা নিকটবর্তী ভূখ-ে ৫৯৩-৯৪ বা এর কাছাকাছি সময় থেকে গণনীয় বেশ কয়েকটি অব্দের উৎস সম্রাট আকবরের ফসলি (সৌর হিজরী) সনের সঙ্গে সম্পর্র্কিত বা বাংলা সনের মতো পৃথক অব্দ হিসেবে সৃষ্ট বলে ধরা হয়। এর মধ্যে উত্তর পশ্চিমের ফসলি সন (বান্দ্র সৌর) (৫৯২-৯৩), পশ্চিমবাংলার বিলায়েতি অব্দ (৫৯২-৯৩ খ্রীস্টাব্দ) মল¬াব্দ (৬৯৪ খ্রীস্টাব্দ) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে বিজ্ঞানী ড.মেঘনাদ সাহা ও অন্যজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন সম্রাট আকবরকেই বাংলা সনের প্রবর্তক বলে মনে করেন। ড. মেঘনাদ সাহার ব্যাখ্যা-বিশ্লে¬ষণ থেকে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ সম্পর্কে এক তথ্যে জানা যায়, সম্রাট আকবর কর্তৃক ১৫৮৪ সাল মোতাবেক ৯৬৯ হিজরীকে সৌর সন হিসেবে যে নতুন তারিখ-ই-ইলাহি বা ইলাহি সন প্রবর্তন করেন এবং সম্রাটের সিংহাসন আরোহণের বছর অথ্যাৎ ১৫৫৬ খৃস্টাব্দ মোতাবেক ৯৬৩ হিজরীতে যা কার্যকর হয়েছে বলে ধরা হয়, তা বাংলা সনেরও উৎস।
অপরদিকে অর্থ-বিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বলেন, ‘মহামতী আকবর যে শ্রেষ্ঠত্বের অভিধায় ভূষিত, তার মূল কারণ সুশাসন হলেও সম্মুখমুখী বহুমাত্রিক চিন্তা-ভাবনার জন্যও তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। একটি সহস্রাব্দকে সামনে রেখে তিনি ভারতীয় সন সংস্কারে পরিকল্পনা করেছিলেন, এটা ভাবা অমূলক নয়’। সুতরাং এখানে নির্দ্বিধায় বলা যায়, সম্রাট আকবরই বাংলা সনের প্রবর্তক।
অবশ্য কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, সম্রাট আকবর তার রাজ্যাভিষেকের ২৯ বছর পরে কেন হিজরী সনের সঙ্গে মিল রেখে বাংলা সন প্রবর্তন করলেন? এমন প্রশ্নে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। এর উত্তর রাজ্যাভিষেকের সময়ে সম্রাটের বয়স ছিল খুব কম; ওইসময়ে রাজ্যশাসন, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও কল্পনাসমৃদ্ধ নব-উদ্ভাবনাময় পরিকল্পনা প্রণয়নের বোধ-বিবেচনা ততটা প্রখর কিংবা পর্যাপ্ত চিন্তার বিকাশও তার তখন পর্যপ্ত প্রস্ফুটিত হয়তো হয়ে ওঠেনি। সঠিক সময় ও বয়সে নানা বিষয়ে তার মেধা ও দূরদৃষ্টির পরিচয় সু-উজ্জ্বল হয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। এমনি করে অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত ইতিহাসকার মনে করেন, সম্রাট আকবরই বাংলা সন তথা বঙ্গাব্দ-এর প্রবর্তক।
অতএব বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ-এর প্রচলন প্রথমে কে কখন শুরু করেছিলেন, তা নিয়ে আজ বির্তকে জড়ানোর কোনো হেতু নেই। বরং আমাদের প্রয়োজন, বাঙালির চাওয়াÑবাংলাকে-বাংলা সন বা বঙ্গাব্দকে ভালোবেসে অগ্রগন্য ভেবে বাঙালি-নিজস্ব সংস্কৃতিকে হৃদযে লালনের মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। এবং দৃঢ়প্রত্যয়ে দেশকে সুখী ও সমৃদ্ধশালী জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁঁচু করে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে হৃদয়ে স্বপ্নের বীজ বপন করা।

==========================
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply