মহাপার্বণ বাংলা নববর্ষ

—মোঃ আলাউদ্দিন

বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশসহ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়। ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙ্গালীরাও এই মহা উৎসবে অংশ নেয়। সে হিসেবে এটি বাঙালি তথা আমাদের জন্য একটি সর্বজনীন উৎসব। একটা সময় বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। সূত্রমতে, ১৫৪৮ সালের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় ১৫৫৬ সাল থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, যা পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্টীর সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ হয়ে থাকে। কয়েকটি গ্রামের মিলিত এলাকায় কোনো খোলা মাঠে, নদীর ধারে অথবা বটতলায় বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। মেলাতে নানা রকম কুটির শিল্পজাত সামগ্রীসহ বিভিন্ন দ্রব্যাদির সমারোহ দেখা যায়। অনেকস্থানে ইলিশ মাছ ও মরিচ পোড়া দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার আয়োজনও করা হয়। এই দিনের আরেকটি সংস্কৃতি হলো- গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে নৌকা বাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তি খেলা অন্যতম। ঢাকা শহরের রমনায় বাংলা নববর্ষের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু ছায়ানটের গানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহ্বান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃত পক্ষে যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ তৈরী হয়ে সেটি বটগাছ নয়; অশ্বত্থ গাছ। বৈশাখী উৎসবে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি আবশ্যিক অঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয় রঙ তুলির পরশে। শোভাযাত্রায় সকল শ্রেণি পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশ নেয়। শোভাযাত্রার জন্য বানানো হয় রঙ-বেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি। ১৯৮৯সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা বাংলা নববর্ষ উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ। ঢাকার অদূরে সোনারগাঁয়ে বউমেলা নামে একটি ব্যতিক্রমধর্মী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ১শ বছর ধরে অনুষ্ঠিত পহেলা বৈশাখে শুরু হওয়া এই মেলা ৫দিন ব্যাপী পালিত হয়। এছাড়াও সোনারগাঁও থানার পেয়াব গ্রামের পাশে আরেকটি মেলা বসে। এটির নাম ঘোড়া মেলা। এ মেলার অন্যতম আকর্ষন হচ্ছে খিচুড়ী রান্না করে নৌকায় রাখা হয এবং আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবাই কলাপাতায় করে আনন্দের সঙ্গে তা ভোজন করে। সকাল থেকেই এ স্থানে লোকজনের আগমন ঘটতে থাকে।
বৈশাখ মানে লাল-সাদার এক অপরূপ সংমিশ্রণ। বৈশাখ শুধু লালকে ধারণ করেনা; বরং পুরো বিশ্বের কাছে আমাদের রঙিন হওয়ার ঐশ্বর্যকে তুলে ধরে। তাই বহুকাল ধরেই লাল-সাদার ধারবাহিকতায় এই বৈশাখেও নতুন প্রজন্মের জন্য বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটি হোক লালের সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল, লালের ঐশ্বর্যে আর লালের দ্বীপ্তিতে রঙিন। শুধু এই দিনটিতে নয়, বরং প্রাণের টানে আর নিজের ঐতিহ্যের গর্বে নিজস্ব চেতনায় আপনিও বাঙালিয়ানাকে ছড়িয়ে দিতে পারেন সারাবিশ্বে। সেই কামনাই করছি সবার কাছে।

===========================
লেখক- মোঃ আলাউদ্দিন
সাংবাদিক, লেখক ও সংগঠক
অনার্স (১ম বর্ষ), রসায়ন-বিভাগ
চৌমুহনী সরকারি এস এ কলেজ, বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী।
সাধারণ সম্পাদক- নাঙ্গলকোট লেখক ফোরাম
দপ্তর সম্পাদক- নাঙ্গলকোট প্রেস ক্লাব
নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা।

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply