কুমিল্লার চিশতী টেক্সটাইল মিলস্’র ৪শ’ কোটি টাকার সম্পদ ৩৫ কোটি টাকায় বিক্রি : এলাকায় তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিনিধি :–

গোপন সমঝোতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান না করেই ১৬.৬৬ একর ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লার চিশতী টেক্সটাইল মিলস্’ অনেকটা পানির দামে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ উঠৈছে। প্রায় ৪শ’ কোটি টাকা মূল্যের সরকারের এ সম্পত্তি নামমাত্র মূল্য ধরে মাত্র ৩৫ কোটি টাকায় বিক্রি করে দেয়া হয়। বর্তমানে মিল এলাকায় হাউজিং স্থাপনের লক্ষ্যে প্লট করে বিক্রির পায়তারা চলছে বলে জানা গেছে। গত কয়েকদিন ধরে দিনে-রাতে দালানকোঠা ভেঙ্গে এসব স্থাপনার মূল্যবান মালামাল দিনে-রাতে সরিয়ে নেয়ার ঘটনায় কুমিল্লার সচেতন মহলে তোলপাড় চলছে। এদিকে মিলের ক্রেতাসহ একটি রাজনৈতিক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ওই নামমাত্র মূল্য পরিশোধ না করেই মিলের অভ্যন্তরের দালানকোঠা, গাছ-গাছালী, কারখানার যন্ত্রপাতিসহ কারখানার বিভিন্ন অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে বলে জানাগেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লা মহানগর ও কোটবাড়ির মধ্যবর্তী স্থানে দৌলতপুর এলাকায় সড়কের পার্শ্বে ১৬.৬৬ একর ভূমির ওপর ১৯৬৬ সালে ২৮ কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে সুতা উৎপাদনকারী ভারী শিল্প কারখানা হিসেবে ‘চিশতী টেক্সটাইল মিলস্’ স্থাপন করা হয়। দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে ১৯৭২ সালে মিলটি জাতীয়করণ করা হয়। তৎসময়ে এ মিলটি বৃহত্তর কুমিল্লার একমাত্র জাতীয়করণ ভারি শিল্প কারখানা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। ১৯৯৮ সালে গণহারে গোল্ডেন হ্যান্ডসেকে শ্রমিক বিদায়ের কারণে একপর্যায়ে মিলটিতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল কর্পোরেশন (বিটিএমসি) কর্তৃপক্ষ এ মিলটিতে উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় শুরু করে। ২০০৪ সালে লোকসানের কারণে মিলটিতে উৎপাদন কার্যক্রম একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। পরে এ মিলটি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন লিকুইডেশন সেলের তত্ত্বাবধানে নেয়া হয়। চারদিকে সীমানা প্রাচীর ঘেরা এ মিলে রয়েছে বিশাল আয়তনের একটি উৎপাদন সেল, প্রশাসনিক ভবন, সুতার গুদাম, শ্রম দফতর, ভান্ডার বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগ ও নিরাপত্তা বিভাগসহ বেশ কয়েকটি অফিস ভবন। এছাড়া উৎপাদন সেলে ৩৬টি জাপানী ও ৮টি চায়না রিং মেশিন, ৬টি সিমপ্লেক্স মেশিন, ব্লু-রুমে বড় ২টি মেশিন, রিলিং-ড্রইং-বান্ডেলিং মেশিন, যান্ত্রিক কক্ষ (ওয়ার্কসপ), বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, মান নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, কাটিং মেশিনসহ দেশি-বিদেশি মূল্যবান মেশিনারীজ পড়ে আছে, যার বেশিরভাগ মেশিন এখনো উৎপাদনসক্ষম বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে। আরো রয়েছে জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) বাংলো, স্টাফ কোয়ার্টারের ৪টি ভবন, প্রায় তিনশ’ শ্রমিকের বসবাসের মতো ২টি বড় দ্বিতল ভবন এবং একটি মসজিদ, একটি শ্রমিক ক্লাব ও ২টি বড় পুকুর। জিএম বাংলোয় গাড়ির গ্যারেজে একটি টয়োটা গাড়ি পড়ে আছে। বিগত সরকার মিলটি বিক্রির জন্য একাধিক বার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করেছিল। কিন্তু দরপত্রে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় মিলটি বিক্রির প্রক্রিয়া বন্ধ থাকে। আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান না করে সম্প্রতি সরকারের এ মূল্যবান সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সাথে যোগসাজসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেসার্স আমস্ ফারাজ কন্সট্রাকশনের মালিক ফারুক ইসলাম ভূঁইয়ার নিকট নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দেয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। কিন্তু সকল টাকা  পরিশোধ না করে বর্তমানে মিলের অভ্যন্তরের অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি ও ভাংচুর করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব ও মিলের লিকুইডেটর সাইফুদ্দিন আহমেদ মজুমদার জানান, ৩৫ কোটি টাকায় মিলটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেসার্স আমস্ ফারাজ কন্সট্রাকশনের মালিক ফারুক ইসলাম ভূঁইয়ার নিকট বিক্রি করা হয়েছে এবং এ পর্যন্ত ১৫ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ না করে মিলের অভ্যন্তরের অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রির বিষয়টি তিনি জানেন না বলে জানিয়েছেন। তবে সরকারের এ মূল্যবান সম্পত্তি সরকারের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোন প্রকল্পে ব্যবহার না করে মন্ত্রনালয়ের সাথে গোপন সমঝোতায় পানির দামে বিক্রির ঘটনায় কুমিল্লার সচেতন মহল থেকে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply