ছাত্রলীগ-যুবলীগকে কি সরকার আসলেই উস্কে দিচ্ছে?

——-মো. আলী আশরাফ খান

বেশ কিছুদিন যাবৎ ভাবছি, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ দেশব্যাপি যে ধ্বংসাত্মক কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে একটি লেখা তৈরি করবো। শারীরিক অসুস্থতা ও বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে সময় সুযোগ হয়ে ওঠেনি। যদিও ইতোপূর্বে এ বিষয়ে জাতীয় বেশ কয়েকটি দৈনিকসহ স্থানীয় সাপ্তাহিক ও একাধিক পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করেছি। শুধু তাই নয়, বিএনপি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও কোন কোন ব্যক্তি, দল-গোষ্ঠী বাদ যায়নি আমার গঠনমূলক সমালোচনার হাত থেকে। জানিয়ে রাখা ভাল যে, গঠনমূলক সমালোচনা লেখার জন্য বছর সাতেক আগে আমাকে দেশের স্বনাম ধন্য একটি জাতীয় দৈনিক সম্মাননা পদকেও ভূষিত করেছিলেন।
যাক সে কথা, এখন মূল প্রসঙ্গ নিয়ে দু’চার লাইন লেখার চেষ্টা করছি। গেল বারের মত এবারও আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করার পর থেকেই তাদের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন সব ন্যাক্কারজনক ও ঘৃণিত কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে-যা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। (উল্লেখ্য যে, এবার আওয়ামীলীগ জনগণের বৃহৎ একটি অংশকে বাদ দিয়ে অর্থাৎ জনসমর্থন ব্যতীত সরকার গঠন করছে, যা অগ্রহণ যোগ্য বলে অনেকেই মনে করছেন)। তারা শুধু বিএনপি-ছাত্রদল-যুবদল, জামায়াতে-ইসলামী-ছাত্রশিবিরই নয় নিজ দলের সদস্যদের মধ্যেও জঘন্য জঘন্য সব রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাধিয়ে জাতিকে চরম লজ্জায় ফেলে দিয়েছেন। আওয়ামীলীগের এ অঙ্গ সংগঠন দু’টি রীতিমত দেশবাসীকে হতাশ করেছে, করেছে হতবাক-এটা বলার কোন অপেক্ষা রাখে না। এককথায়, ছাত্র রাজনীতির ওপর থেকে সবশ্রেণীর মানুষের আস্থা এখন ওঠে গেছে। মানুষ এখন মনে করে, ছাত্র রাজনীতি মানেই দলীয় চরম কোন্দল, টেন্ডারবাজি, চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে মারপিট-খুনাখুনি, হল দখলের আদিপত্য বিস্তারে হিংস্রতা, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে তোয়াক্কা না করে যেনো তেনোভাবে অপস্বার্থ আদায়ে ধ্বংস আর ধ্বংস খেলা চালিয়ে যাওয়া।
জনগণ ভুলেনি আওয়মীলীগের গত মেয়াদের শাসন আমল। এ দলটির অতিপ্রয়োজনীয় অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ-যুবলীগ শতশত সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করেছে এ দেশে। নানান ছুঁতোয় অসংখ্য সন্ত্রাসী ঘটনার জন্ম দিয়েছে এ সংগঠন দু’টি। তখন এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে, তাদের রুখার শক্তি যেনো স্বয়ং সরকারেরও ছিল না। সরকার বলেছিল, এসব সন্ত্রাসী ঘটনায় দায়ভার তারা নেবেন না, ছাত্রলীগ বলতে তাদের কোনো সংগঠন নেই! এমন সব কথা বলে সরকার পার পাওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু দেশের মানুষ সব দেখেছে। বিদগ্ধজনরাও অনুধাবন করেছে তাদের পুরু মেয়াদ কাল। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, কোন পিতা-মাতার যদি তিনজন সন্তানের একজন ভ্রান্তপথে ধাবিত হয় বা দাগের বাইরে চলে যায়। অর্থাৎ এমনসব ঘৃণিত কর্মযজ্ঞ ধারাবাহিকভাবে চালায়, যা দেশ-জাতিকে চরম লজ্জায় পর্যবসিত করে, তাহলে কি পিতা-মাতা নিজ সন্তানকে সন্তান নয় বা তাকে ত্যাজ্য করার নাম করে রেহাই পেতে পারেন? না, তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বরং সেই বাবা-মা’র চরম হীনতা এবং অপারগতাই প্রতিয়মান হয় এতে। যা বরাবরই তাদের নিজেদের লজ্জা এবং ব্যর্থতাই প্রকাশ পায়।
মানুষজন জানে, ওই সময়ে অসংখ্য বর্ববর কর্মকা- ঘটিয়েছিল তারা। এরমধ্যে টাঙ্গাইলের সখীপুরে ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক হাবিবুল্ল¬াহ ইতিহাস ওরফে হাবীব উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা আরিফ আহমেদ গংদের সহযোগীতায় একটি নাবালিকাকে ধর্ষণ ও ধর্ষণচিত্র ভিডিও করে উল্লাসনৃত্য প্রদর্শণ করেছিল এবং মেয়েটির পরিবারকে অব্যাহত হুমকি দেওয়ার ঘটনায় সমগ্র জাতির উন্নত মস্তক অবনত হয়েছিল। চারদিকে ছিঃ ছিঃ রব ওঠেছিল। পরপর এমন সব সন্ত্রাসী কর্মকা- ঘটিয়েছিল ছাত্রলীগ যা জাতির জন্য অত্যন্ত হতাশা ও বেদনাদায়ক ছিল। শুধু তাই নয়, তাদের একেরপরএক এসব রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জাতি যখন ভীষণ ভাবিত তখন সরকার বলেছিল এর জন্য তারা দায়ি নয়। ছাত্রলীগ তাদের কেউ না, এব্যাপরে তাদের কিছু করার নেই। সরকারের এ বক্তব্য সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেয়ার একটি অপকৌশল বলে মনে করেছে অনেকে।
এরপর আসা যাক আওয়ামীলীগ সরকারের নতুন অত্যাশিত এ শাসন আমলের কথায়। জনগণকে এক রকম ধোঁকা দিয়ে এ দলটি যেভাবে সরকার গঠন করলো তা জাতির কাছে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে ইতিহাসের পাতায়। তারা সরকার গঠন করার পর থেকেই ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং মূল দলের বহু নেতা যাচ্ছেতাইভাবে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে চলছেন। হেনহীন কাজ নেই যা ছাত্রলীগ-যুবলীগ করছেন না এখন। শুধু অন্যান্য দলের নেতা-কর্মীদের উপরেই তারা চড়াও হচ্ছে তা কিন্তু নয়, নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্ধ, বিচার-ফয়সালার নামে অর্থের লেনদেন, খেলাধুলার নামে চাাঁদা আদায় এবং পদপদবীর বিষয়সহ নানা তুচ্ছ ঘটনা নিয়েও তারা লঙ্কাকা- ঘটিয়ে যাচ্ছেন দেশে একের পর এক। যা জাতিকে বারবার লজ্জার সাগরে ডুবিয়ে মারছে।
যদিও আওয়ামীলীগ তাদের বিগত সরকারের আমলে বলেছিল, ছাত্রলীগ সরকারের কেউ না বা কোনো যোগসূত্র নেই তাদের সঙ্গে। এসব কথা বলে তারা সরকারের দায়বদ্ধতা অস্বীকার করতে চেয়েছিল। দেশ পরিচালনায় ব্যর্থতাকে আড়াল করার অপচেষ্টা চালিয়ে ছিল। যার ফল যে বেশি একটা ভাল হয়নি তা আওয়ামীল বরাবরই বুঝতে পেরেছেন। এখন আমার প্রশ্ন, বিশেষ করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ দেশে ধারাবাহিক যে হলিখেলা শুরু করেছেন এ ব্যাপারে সরকারের কি কোন করণীয় নেই? আমরা কাকে বলবো তাদের অমানবিক ভয়াবহ এসব কর্মযজ্ঞের ব্যাপারে? কার কাছে এসমস্ত নৃশংতার বিচার চাইবো? সরকারের কি জনগণের প্রতি কোন দায়-দায়িত্ব নেই? তাহলে কি আমরা বলবো, জোর যার মুল্লুক তার নীতিতে সরকার যেমন দেশ চালাচ্ছে তেমনি তাদের সংগঠনের কর্মী-সমর্থকরাও দেশের বারোটা বাজাতে এই  হিং¯্রতার পথে হাঁটছেন।
আমি আওয়ামীলীগকে উদ্দেশ্য করে বলছি, বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে আপনারা ক্ষমতা এসেছেন, দেশ চালাচ্ছেন, জনগণের অধিকার হরণ করেছেন, এখন আবার আপনাদের দলীয় লোকেরা ভোট ডাকাতির পাশপাশি দেশে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে তা এক বড় ধনরের বিপদের ইঙ্গিত বহন করছে বলে আমি মনে করছি। কোন দল যদি নিজেদের কিংবা অঙ্গ সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারে, তাহলে তো বলতে হয় ওই দল অর্থাৎ ক্ষমতাসীন সরকার নিজেদেরকেই সামলানোর ক্ষমতা রাখেন না। তারা সমাজ সর্বোপরী দেশ-জাতি পরিচালনায় চরম র্ব্যথতার পরিচয় দেওয়া তো স্বাভাবিক ব্যাপার। আমরা মনে করি, ছাত্রলীগ, যুবলীগ তথা আওয়ামীলীগের লোকেরা যেসব বর্বর কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে এর দায়ভার সম্পূর্ণ সরকারকেই নিতে হবে। সরকারই এই বেশামাল পরিস্থিতির জন্য দায়ি। সরকারকেই দায়ি করবে জনগণ। সুতরাং সময় থাকতে বিশেষ করে ছাত্রলীগ-যুবলীগের মত এই নষ্ট-দুষ্টু ঘোড়ার লাগাম এথনই টেনে ধরতে হবে সরকারকে ভবিষ্যতের চিন্তা করে। আর নয়তো মানুষের মনে এই ভাবনা আসা স্বাভাবিক যে, ছাত্রলীগ-যুবলীগকে কি সরকার আসলেই উস্কে দিচ্ছে?

লেখক: মো.আলী আশরাফ খান
সদস্য সচিব
দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি
দাউদকান্দি উপজেলা, কুমিল্লা।
তারিখ:০৬-০৪-২০১৪

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply