নতুন জীবন

——মোঃ আলাউদ্দিন

শাওন ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। বিনয়ী, নম্র এবং ক্লাসের ফার্স্ট বয় হিসেবে শিক্ষকরা তাকে অতন্ত্য স্নেহ করে। শাওনকে নিয়ে তার পিতা-মাতারও অনেক স্বপ্ন। একজন গৃহশিক্ষকসহ আরও দু’জন শিক্ষক শাওনকে সপ্তাহে তিনদিন করে পড়ান। শুধুমাত্র তাকে স্কুলে আনা-নেয়ার জন্য রহিম নামে একজন ড্র্রাইভার আছে। মোস্তফা সাহেবের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও ড্রাইভার মাঝে মাঝে বস্তির পাশ্ববর্তী রাস্তা দিয়ে শাওনকে আনা-নেয়া করে। শাওনের পিতা মোস্তফা সাহেবের কথা বস্তির ছেলে-মেয়েদের দেখলে শাওনের মন ও মেধা বিকাশে বাধা সৃষ্টি হবে। তাই কোন ভাবেই তাকে বস্তির পাশ্ববর্তী রাস্তা দিয়ে স্কুলে আনা-নেয়া করা যাবেনা । গত ক’দিন ধরে রাস্তায় কাজ করার কারণে পথে যানজট লেগেই থাকত। তাই বিকল্প রাস্তা হিসেবে বস্তির পাশ্ববর্তী রাস্তা দিয়ে শাওনকে আনা-নেয়া করে ড্রাইভার রহিম। বস্তির রাস্তা দিয়ে আসা-যাওয়ার সময় শাওন ক’দিন থেকে লক্ষ করে তার গাড়ির আওয়াজ শুনে তারই বয়সী বস্তির একটি ছেলে কাজ (ইটভাঙ্গা) ছেড়ে উদাসভাবে গাড়িটি চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে থাকে।
শাহাদাত স্যার ক্লাসে পড়াচ্ছেন। কিন্তু শাওন ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছেনা। চোখের সামনে বস্তির সেই ছেলেটির উদাস জ্বল জ্বল চোখ দু’টি ভেসে ওঠে। সে ভাবে, আমি যে রকম বাবা-মায়ের আদরের সন্তান, সেও তো এরকম কারো আদরের সন্তান। এই বয়সে সেও তো আমার মতো ড্রেস পরে স্কুলে থাকার কথা। শিক্ষক এসে তাকে পড়ানোর কথা। আমার মতো তাকেও তো একজন ড্রাইভার এসে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার কথা। তাহলে তফাৎ কোথায়? তবে কি কোন গরিব পিতার সন্তান বলে তার কোন অধিকার নেই। শাওন আর ভাবতে পারে না। তবুও সে ভাবে, ধনী-গরিব কেন এত তফাৎ? না, এটা হতে পারেনা। আজ স্কুল থেকে এসে ড্রেস খুলেই বেডরুমে চলে গেল শাওন। তার মা শেফালী বেগম কাজের বুয়া সখিনাকে ডেকে শাওনকে নাস্তা দিতে বলল। সখিনা নাস্তা নিয়ে এলে শাওন জানাল তার ক্ষিধে নেই। কিছুক্ষণ পরই শেফলী বেগম ছেলের রুমে এলেন। শাওন, আব্বু আমার, তোমার শরীর কি খারাফ লাগছে?
– না আম্মু। আমার শরীর ঠিক আছে।
তারপরও শেফালী বেগম ফোন করে শাওনের আব্বু মোস্তফা সাহেবকে তাড়াতাড়ি ডাক্তার নিয়ে আসতে বলল। শেফালী বেগম বারবার ছেলের মাথায় হাত বুলাচ্ছে আর শরীর কেমন লাগছে সেটা জিজ্ঞেস করছে। শাওন বলল- আম্মু, তুমি শুধু শুধু আব্বুকে ডাক্তার আনতে বলেছ। আমার শরীরতো ঠিকই আছে। ক্ষিধে নেই, তাই খাচ্ছি না। ডাক্তার এসে শাওনকে দেখে-শুনে বললেন, কোন সমস্যা নেই, ওকে একটু বিশ্রাম করতে দিন। শাওন আবার ভাবে, নাস্তা খাব না বলার সাথে সাথে ডাক্তার চলে এলো। আর হয়তো বহু খাটুনির পরও দু’বেলা দু’মুঠো ভাত ভালোভাবে খেতে পারে না বস্তির ছেলেটি। সমাজে কেন এত বৈষম্য? বুঝতে পারেনা শাওন।
পরদিন স্কুল ছুটি হলে শাওন বস্তির পাশ্ববর্তী রাস্তা দিয়ে যেতে ড্রাইভারকে বলে দিল। শাওনের আজ দারুণ আনন্দ, সে আজ বস্তির ছেলেটির সাথে পরিচিত হবে এবং তার মনের কথা জানবে! শাওন পৌঁছে গেল ছেলেটির বস্তির পাশে। আজও ছেলেটি একই দৃষ্টিতে শাওনের গাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। গাড়ি থামাতে বললে ড্রাইভার গাড়ি থামালে গাড়ি থেকে নেমে বস্তির ছেলেটির দিকে এগিয়ে যায় শাওন। বস্তির ছেলেটি ভাবে, বড় লোকের গাড়ির দিকে তাকানো বুঝি অপরাধ। গাড়ির ছেলেটি হয়তো তাকে ধমক দিতে আসছে। না, শাওন ধমক দিতে আসেনি। শাওন বিনয়ের সাথে বলল, ভাইয়া! তুমি কেমন আছ? তোমার নাম কী? বস্তির ছেলেটি বিস্মিত হয়ে বলল, আমার নাম আকাশ।
-খুব সুন্দর নামতো! আকাশ তুমি পড়ালেখা কর?
-গরিবের আবার পড়ালেখা, খাওনের টাহা জোগাইতে পারিনা, পড়ালেখার টাহা পামু কই?
-শাওন বলল- আচ্ছা আকাশ, আমি যদি তোমার পড়ালেখার ব্যবস্থা করি, তুমি কি পড়ালেখা করবে?
আকাশের চোখ থেকে অশ্র“ গড়িয়ে পড়ে। সে আর কিছু বলতে পারে না।
-শাওন আবার জিজ্ঞেস করল- আকাশ, তোমার পরিবারে কে কে আছে?
-আকাশ বলতে থাকে তার পরিবারের করুণ চিত্র। আকাশের পিতা শফিক আহমেদ রিকশা চালাতো। তার পিতার আয়ে মোটামুটি দু’বেলা দু’মুঠো খেতে পারতো আকাশের পরিবার। আকাশ তখন বস্তির পাশ্ববর্তী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। কিন্তু একদিন তাদের এই সুখী জীবনে নেমে আসে অন্ধকারের কালো ছায়া। দু’বছর পূর্বে সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায় তার পিতা শফিক আহমেদ। শফিক আহমেদ মারা যাওয়ার সময় আকাশ, আকাশের মা আয়েশা এবং রুবি ও রুনা নামে ছোট দু’বোনকে রেখে যান। পিতার মৃত্যুর পর থেকেই আকাশের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। এখন দু’বেলা খাবার জোগাড় করতে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি করতে হয় আকাশকে। তার মাও বাসায় বাসায় ঝি- এর কাজ করে। এর মধ্যে কিভাবে হবে তার পড়ালেখা?
চোখ ভরা অশ্র“ নিয়ে বাসায় ফিরল শাওন। গতকাল থেকে আজ আরও বিষন্ন দেখাচ্ছে তাকে। আকাশকে কথা দিয়ে এসেছে শাওন। সুতরাং তার জন্য কিছু করতেই হবে। শাওন তার মাকে জানালো, আকাশ নামে তার এক বন্ধু আছে। অত্যন্ত মেধাবী, টাকার অভাবে পড়ালেখার খরচ চালাতে পারেনা। অথচ আমাদের ঘরে প্রতিদিন যা কিছু নষ্ট হয় এবং আমি খেলনা কিনে অযথা যে টাকা নষ্ট করি, একটু সতর্ক হলে এ টাকা দিয়ে আকাশের পড়ালেখার খরচ ও তাদের ছোট পরিবারটির খরচ চালাতে কোন কষ্টই হবেনা।
শাওনের কথায় একমত হলো তার মা শেফালী বেগম। পরের দিন শাওন ও তার আম্মু গিয়ে আকাশ, তার মা আয়েশা এবং ছোট বোন রুবি ও রুনাকে তাদের বাসায় নিয়ে এলো।
আজ শাওনের কি যে আনন্দ! বন্ধু হিসেবে আকাশের জন্য কিছু করতে পেরে তার মিশন আজ সার্থক হয়েছে। আকাশের চোখে-মুখেও আজ ফুটে উঠেছে কৃতজ্ঞতার হাসি। আবার সে মাতিয়ে তুলবে স্কুল। সে ফিরে পেয়েছে এক “নতুন জীবন”।

——————-
লেখকঃ- মোঃ আলাউদ্দিন
অনার্স (১ম বর্ষ),রসায়ন বিভাগ,
চৌমুহনী সরকারি এস এ কলেজ
নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা।
মোবাইলঃ- ০১৯১১৫৩৮০৭৯।
prodipnews@gmail.com

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply