স্বপ্নে দেখা বাংলাদেশ

—–মোঃ আলাউদ্দিন

ত্রিশ লক্ষ শহীদের বুকের তাজা রক্তে ভেজা এই মাটি। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে আমরা পেয়েছি আমাদের এই বাংলাদেশ। অনেক মূল্যে পাওয়া স্বপ্নের বাংলাদেশের কাছে আমাদের প্রত্যাশাও সীমাহীন। যে শাসন-শোষণ আর অবিচার থেকে মুক্তির জন্য সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে এ দেশের জন্ম সেই শোষন-বঞ্চনাহীন ও সমাজ আমার স্বপ্নের প্রথম সোপান।
আমি একজন ছাত্র। তারুণ্যের আবেগ আমাকে নিরন্তর সুন্দরের সাধনা শেখায়। ১৯৫২ সালের অমর একুশের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এক দীর্ঘ সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাস। সেই ইতিহাস আমাকে আপ্লুত করে। প্রেরণায় উজ্জীবিত করে। ইতিহাসের একটি বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে আছে বহু আত্মত্যাগের কাহিনী। আমার প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল এক সু-মহান আর্দশ। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে যে স্বাধিকার চেতনা তাই স্বাধীনতায় উত্তীর্ণ হয়েছে সময়ের দাবিতে। লক্ষ লক্ষ পাকিস্তানী শাসন, শোষণ, বৈষম্য, সামরিক একনায়কত্ব, আমলাতন্ত্র, অবিচার, দুর্নীতি থেকে মুক্ত হয়ে বাঙ্গালী জাতি তার আপন ভাগ্য আপনি গড়ে তুলবে। স্বাধীন সার্বভৌম দেশে সুখী সমৃদ্ধ এক কাঙ্খিত সমাজ গড়ে উঠবে। ইতিহাসে উচ্চারিত সেই স্বপ্ন এখনো স্বপ্নই হয়ে আছে। বাস্তবে এখনো পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসনামলের অপছায়া রয়ে গেছে সমাজের গনতন্ত্র বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে স্বাধীনতা লাভের অল্প কিছু কালের মধ্যেই। তারপর একের পর এক সামরিক শাসন, স্বৈরশাসন, ঘুষ-দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, কুলষিত রাজনীতি, ক্ষমতার লোভ, হানাহানি, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ইত্যাদি ঔপনিবেশিক শাসনামলের অপকর্মগুলো নতুন আঙ্গিকে মাথাছাড়া দিয়ে উঠেছে গোটা দেশ জুড়ে। দীর্ঘ ৯’বছর স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি অর্থাৎ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের পর আবার বহু প্রাণ বলি দিয়ে পাওয়া গেল গণতন্ত্র। কিন্তু সে গণতন্ত্র পূর্ণ বিকাশের সুযোগ পেল না। সমাজে অস্থিরতা বাড়ছে, বাড়ছে দারিদ্রতা আর অনন্তোষ। তবু আজও আমরা আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখি। যতদিন পরেই হোক না কেন, আমরা আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলবোই ইনশাল্লাহ। সে বাংলাদেশের সমাজ হবে শোষণমুক্ত, সকলের মৌলিক অধিকার রক্ষা পাবে। কাম্য জন্যসংখ্যা থাকবে সম্পূর্ণ নিরক্ষর মুক্ত। আইনের শাসন বিরাজ করবে সমাজের সর্বত্র এবং প্রবাহিত হবে ইতিবাচক রাজনীতি। আমার স্বপ্নের বাংলাদেশে সরকার এবং জনগণের মধ্যে থাকবে পরস্পর নিবিড় সম্পর্ক। শাসক শাসিতের উপর শোষণের স্টিম রুলার চালাবে না। জনগণ তাদের নায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না। সরকার কেবল জনগণের সেবার মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করবে। অথনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য গ্রাম ও শহরের উন্নয়ন একই সময় সমভাবে চালু থাকবে। এখানে ধনী কেবল ধনী হবে, দরিদ্র আরও দরিদ্র হবে- এমন একপেশে ও অমানবিক অর্থনৈতিক বৈষম্য থাকবেনা। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠবে একটি শোষণমুক্ত সমাজ। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানসহ মৌলিক মানবাধিকার সমূহ নিশ্চিত করার জন্য বর্তমান আমলাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তে আমার স্বপ্নের বাংলাদেশে থাকবে সৎ, যৌগ্য ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন। চালু থাকবে জনপ্রতিনিধিত্বশীল প্রশাসনিক কাঠামো। প্রশাসন থাকবে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত। কারণ এ সর্বনাশা সামাজিক ব্যাধির মরণ ছোবলে বর্তমান সমাজ আজ জর্জরিত। দেশের প্রশাসন, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সর্বত্র চলছে দুর্নীতি। যার করাল গ্রাসে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের ভবিষৎ ক্রমশ হয়ে উঠছে অনিশ্চিত ও অনুজ্জ্বল। আমার স্বপ্নের বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধে থাকবে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইন ও তার সফল প্রয়োগ। বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি দরিদ্র রাষ্ট্র। এর অন্যতম কারণ জনসংখ্যার আধিক্য এবং নিরক্ষতার অভিশাপ। আমার স্বপ্নের বাংলাদেশের প্রতিটি জনগণ হবে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত, সৎ, সচেতন ও কর্মঠ। আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের প্রতিটি জনগন হবে জনসম্পদ। আমার স্বপ্নের বাংলাদেশে একটি নিরক্ষর লোকও থাকবে না। স্বনির্ভর গ্রাম-বাংলার মানুষগুলো থাকবে অনাবিল সুখ ও শান্তিতে। আমাদের দেশে একটি কথা প্রচলিত আছে- কাজীর গরু কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই। অর্থাৎ এ দেশে আইন আছে কিন্তু তার সঠিক প্রয়োগ নেই। এদেশে আইন শুধু গরিব ও দুর্বলের জন্য। সবল বা প্রভাবশালীরা সবসময় আইনের ধরাছোয়ার বাইরে থাকে। আমার স্বপ্নের বাংলাদেশে কখনোই এমনটি হবে না। দেশে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত থাকবে। আইনের মারপ্যাচে সাধারণ জনগণ কখনো হয়রানির শিকার হবে না। সমাজের সর্বস্তরে আইনের সু-শাসন কায়েম থাকবে। আইনের উর্ধ্বে কেউ থাকবে না। রাজনৈতিক দলগুলো দেশের মূল চালিকা শক্তি। অথচ রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই এ দেশের জনগণ চরম প্রতারণার শিকার। রাজনৈতিক নেতা ও দলগুলোর বিভিন্ন অপকর্ম এ দেশের বর্তমানে রাজনৈতিক ট্রাডিশন হিসেবে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আমার স্বপ্নের বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে কোন ধরনের লোভ-লালসা থাকবে না। কাজে, কর্মে ও চিন্তায় সৎ প্রকৃত দেশ প্রেমিকরা হবে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রক। নীতিতে অটল, সেবায় একনিষ্ট, শাসনে নির্ভীক দেশ প্রেমিকেরাই থাকবে ক্ষমতার শীর্ষে।
হাজারো সমস্যার আবর্তে নিমজ্জিত আমার সোনার বাংলার মলন বদন দেখে থেকে থেকেই এ হৃদয়ে কাঁপন লাগে। অনিশ্চিত আগামীর দিকে ধেয়ে চলা প্রজন্ম নীড় হারা পাখির মত ঝাপটে নিরাপদ ও নিশ্চিত আশ্রয় খোঁজে। কিন্তু সে আশ্রয় কোথায়? কোথায় আমার গীতিময় সুখের আলোয়- আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ?

=================================
লেখকঃ- মোঃ আলাউদ্দিন
সাধারণ সম্পাদক- নাঙ্গলকোট লেখক ফোরাম
দপ্তর সম্পাদকঃ- নাঙ্গলকোট প্রেস ক্লাব
নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা।
সম্মান (১ম বর্ষ), রসায়ন বিভাগ, চৌমুহনী সরকারি এস এ কলেজ।
prodipnews@gmail.com

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply