আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামত পানি

মো. আলী আশরাফ খান:–
আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন সৃষ্টি জগতের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত হিসাবে পানিকে দান করেছেন। পানির গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও হাদিস শরীফে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। পানির উপস্থিতির কারণেই এই ধরাধামে প্রাণী ও উদ্ভিদের অবস্থান, বংশ বৃদ্ধি এবং টিকে আছে আমাদের অস্তিত্ব। এককথায়, পানি ছাড়া জীবজগৎ এক মূহুর্তও টিকে থাকতে পারেনা। আধুনিক বিজ্ঞান পানিকে প্রাণের উৎপত্তি হিসেবে বর্ণনা অতঃপর এ নিয়ে গবেষণা করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। পদার্থের দিক দিয়ে পানি সবচে’ মূল্যবান। স্রষ্টা প্রদত্ত প্রাকৃতিক ও খনিজ পদার্থের মধ্যে স্বর্ণ ও প্লাটিনাম ধাতু এবং হীরা অতি মূল্যবান হলেও এসব পদার্থ নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত। এদের ব্যবহার অতি সীমিতই বলা চলে পানির তুলনায়। পানি এমনই এক ধরনের পদার্থ যার কোন স্বাদ, গন্ধ ও রং নেই অথচ এর ব্যবহার ব্যাপকভিত্তিক। পানি সহজলভ্য এবং এর সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয় না। প্রাণের অস্তীত্বের সঙ্গে পানির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। পানি আছে বলেই সৃষ্ট জগত সচল রয়েছে-তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
পানির সাময়িক সংকট প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, সৌরজগতের একমাত্র গ্রহ ‘পৃথিবী’তেই পানির অস্তিত্ব বিদ্যমান। অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহে পৃথিবীর মতো পানির সহজলভ্যতা বজায় না থাকার কারণেই তাতে স্বাভাবিক জীবন প্রণালী সম্ভব নয়।। আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যেখানে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত পানির সু-ব্যবস্থা রয়েছে। তাই পৃথিবী মানুষের বসবাসের ক্ষেত্রে সর্বাধিক উপযোগী। কারণ মানুষের বসবাসের সঙ্গে অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদের সহাবস্থান সম্পর্কযুক্ত। মহান সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীকেই একমাত্র মানুষের আবাসস্থল ও তাতে পানির গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কালামে পাক কুরানুল কারীমে উল্লেখ করেন, ‘তিনিই পৃথিবীকে করেছেন বসবাস উপযোগী এবং এর মাঝে প্রবাহিত করেছেন নদী-নালা (সূরা নমল, আয়াত ৬১)।
কুরআনে আরও উল্লেখ রয়েছে যে, ‘তুমি কি দেখ না আল্লাহ পাক আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, তারপর ভূমিতে স্রোতরূপে তা প্রবাহিত করেন এবং তা দিয়ে বিচিত্র বর্ণের ফসল উৎপাদন করেন? (সূরা যুমার, আয়াত-২১)। আল্লাহ তায়ালা সমন্ত পৃথিবীর ৭০ ভাগ পানিতে পূর্ণ করে রেখেছেন যা কখনও হ্রাস পায় না। পানি বিষয়ে আরেকটি আয়াত নিম্নরূপ-‘আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি পরিমিতভাবে তারপর আমি সেই পানি মাটিতে সংরক্ষণ করি, আমি সেই পানি অপসারিত করতেও সক্ষম’ (সূরা মুমিনুন, আয়াত-১৮)। সাগরের মাধ্যমে তিনি পানি সংরক্ষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছেন এবং তা থেকে বৃষ্টি আকারে পানি পরিশোধন করে পরিমিতভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মজুদ করে রাখেন। আল্লাহ্ল পাক যে পানি কুদরত হিসেবে আমাদের দান করেছেন তার সংরক্ষণ ও বিতরণ ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই হাতে। তিনি ইচ্ছা করলে পানি আমাদের নাগালের বাইরে নিয়ে যেতে পারেন। আবার সমস্ত পানিকে লবণাক্ত করে দিতে পারেন। যা আমাদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপ্রতুল্য হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আল্লাহ পাক পানিকে করেছেন অবারিত ও সহজলভ্য।
মহান সৃষ্টিকর্তা পানি সম্পর্কে আমাদের চিন্তা করতে বলেছেন এবং এই মহামূল্যবান পানি প্রাপ্তিতে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কথা বলেছেন। পানি বিষয়ক আরেকটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি বৃষ্টি গর্ভ বায়ু প্রেরণ করি, তারপর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি এবং তা তোমাদের পান করতেই দেই। পানির ভানর তোমাদের নিকট নেই’ (সূরা হিজর, আয়াত-২২)। কুরআন পাকের আরেকটি আয়াতে উল্লেখ আছে যে, ‘বল, তোমরা চিন্তা করে দেখেছ কি পানি ভূগর্তে তোমাদের নাগালের বাইরে চলে যায়, কে তোমাদেরকে এনে দিবে প্রবাহমান পানি ?’ (সূরা মূলক, আয়াত-৬৭)। পানি প্রাপ্যতায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তিনি বলেন, ‘তোমরা যে পানি পান কর সে সম্পর্কে কি তোমরা চিন্তা করেছো ? তোমরাই কি পানি মেঘ থেকে নামিয়ে আন, না আমি তা বর্ষণ করি ? আমি ইচ্ছা করলে তা লবণাক্ত করে দিতে পারি। তবুও কেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর না ?’ (সূরা ওয়াকিয়া, আয়াত ৬৮-৭০)।
প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবন পানি ছাড়া এক মুহুর্তও বেঁচে থাকা সম্ভব না। মোট কথায়, পানির ওপর নির্ভরশীল সকল প্রাণী ও উদ্ভিদ। তাছাড়া সৃষ্টি জগতে পানির ব্যবহার বলে শেষ করা সম্ভব নয়। যে কারণে পানিকে বলা হয় ‘পানির অপর নাম জীবন’। বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে সাগরের পানিতে প্লাবিত ও ডুবন্ত অবস্থায় রয়েছে ভূপৃষ্ঠ অপেক্ষা অধিক প্রাণী ও উদ্ভিদ যা পানিকে ঘিরেই আবর্তিত। যা নিয়ে চলছে ব্যাপক গবেষণা। আধুনিক বিজ্ঞান পানিকে নানাভাবে ব্যবহার করছে। পানিকে কাজে লাগিয়ে উদ্ভাবিত হয়েছে বিদ্যুৎ শক্তি। অপরদিকে পানিকে বাষ্পে পরিণত করে বিভিন্ন যান্ত্রিক কলা-কৌশল আবিস্কৃত হচ্ছে। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে বলা যায় যে, আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরাও পানির অনবরত ঘূর্ণন থেকে ‘আন লিমিটেড’ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিভিন্ন পদ্ধতি আবিস্কার করেছেন, করছেন। যা আমাদের বাঙালি জাতির গৌরবের ব্যাপার বলা যায়। তাছাড়া পানিকে ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশ কৃষি ও শিল্প ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, হচ্ছে। বিশ্বব্যাপি বিভিন্ন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানসমূহ পানি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। উদ্দেশ্য-মানুষের দেহ সুস্থ রাখতে বিভিন্ন খনিজ উপাদান ও পানিকে দূষণমুক্ত রাখার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান লাভ অতঃপর এর ব্যবহারের মাধ্যমে উপকৃত হওয়া।
অঞ্চল ভেদে ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে পানিতে রয়েছে ২০/২৫ প্রকার খনিজ পদার্থ। এসব খনিজ পদার্থের রয়েছে নানাবিধ কার্যকারিতা। পানিতে বিদ্যমান উল্লেখযোগ্য খনিজ পদার্থগুলো হচ্ছে-ক্যালসিয়াম, বাই-কার্বনেট, সোডিয়াম, আয়রণ, কপার সালফেট, ম্যাগনেশিয়াম, ফ্লোরাইড ইত্যাদি। এসব খনিজ পদার্থ মানবদেহ এবং উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য অতি প্রয়োজনীয়। আধুনিক বিশ্বে বিজ্ঞানীরা মানব শিশুর দাঁত গজানো থেকে শুরু করে দেহের পুষ্টি সাধন পর্যন্ত পানির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। চিকিৎসা ক্ষেত্রে পানির ব্যবহার অতিপ্রাচীন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে ক্রমে ক্রমে পানির ব্যবহার বেড়েই চলছে। বোতলজাত করে বিভিন্ন দেশে ফ্রেস পানিকে ঘিরে গড়ে ওঠেছে অসংখ্য শিল্প-কারখানা। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে অনেক মানুষের। যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে পানির ভূমিকা আদিকালের। মৎস্য চাষে ও প্রাকৃতিক মৎস্য ভানর পানির উপরই নির্ভরশীল। সম্প্রতিকালে মারাত্মক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পানিতে আর্সেনিক’ বিষয়টি। এ অবস্থায় বিশুদ্ধ খাবার পানি পাওয়া দুস্কর হয়ে পড়েছে। তবে আর্সেনিক থাকলেই পানি অযোগ্য হয় না খাওয়ার জন্য। বাংলাদেশের জন্য পানিতে লিটার প্রতি ৫০ মাইক্রোগ্রামের বেশি আর্সেনিক থাকলে তা ক্ষতিকর। বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকার পানিতে মাত্রারিক্ত আর্সেনিক যুক্ত পানি মিলছে-এক্ষেত্রে আর্সেনিক থেকে রক্ষা পেতে ‘বৃষ্টির পানি’ ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বিজ্ঞানভিত্তিতে। অথচ আল্লাহ তায়ালা বৃষ্টির পানিকে ‘বিশুদ্ধ পানি’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন বহু আগেই। আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহের প্রাক্কালে সু-সংবাদবাহীরূপে বায়ু প্রেরণ করেন এবং আকাশ থেকে বিশুদ্ধ পানি বর্ষণ করেন, তা মৃত ভূখ-কে সজ্জীবিত করতে ও অসংখ্য জীব-জন্তু এবং মানুষের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য (সূরা ফুরকান, আয়াত ৪৮-৪৯)।
নবজাতক থেকে শুরু করে মৃত্যু পথযাত্রী পর্যন্ত এ পানির চাহিদা সবার কাছেই রয়েছে। স্রষ্ঠা প্রদত্ত আবে জমজমের পানি ও হাউজে কাউছারের পানি সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে আলোচনা করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণভাবে। আল্লাহ তার পছন্দের বান্দাদেরকে সর্বপ্রথম আপ্যায়িত করবেন কাক্সিক্ষত হাউজে কাউছারের পানি দ্বারা। আবে জমজমের পানির উপকারিতা বিশ্বব্যাপি খ্যাত। এ পানি বহু জটিল রোগের মহৌষধ হিসাবে বিবেচিত। এই পানির জন্য প্রত্যাশিত সব বয়সী মানুষ। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) পানির উপকারিতা সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি পানির অপচয় রোধ ও পানিকে দূষণমুক্ত রাখতে বলেছেন। আল্লাহর দেয়া এ পানি শ্রেষ্ঠ নেয়ামত, যার সুষ্ঠু ব্যবহার ও সংরক্ষণ প্রতিটি মানুষের জন্য দায়িত্ব ও কর্তব্য। আর এই উপলব্ধি থেকেই আজ বিশ্বব্যাপি দাবী উঠেছে, পানি দূষণ মুক্ত রাখার। আমাদের বিশ্বাস, স্রষ্টা প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ নেয়ামত এ পানির অপচয় রোধ ও দূষণ মুক্ত রাখতে দেশ-জাতি বর্ণভেদে সকলের প্রচেষ্টা হবে সমান। আজ আমাদের সকলকে সংকল্প করতে হবে, আমরা আর কখনো পানির করবো না অপচয়, পানির সুষ্ঠু ও যথাযথ ব্যবহার করবো নিশ্চিত। শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকা নয়, স্ব-স্ব উদ্যোগে ডোবা-পুকুর-খাল খনন করে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যাবহার কমিয়ে আনতে হবে। এবং পানি ব্যবহারে আমাদের প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। আর তবেই আমাদের মিঠতে পারে পানির চলমান সমস্যা।

লেখক: সংগঠক, গবেষক ও কলামিস্ট
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।
তারিখ:১৬.০৩.২০১৪

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply