দেবিদ্বারে ৬৪ ফুট মাটির নীচ থেকে তুলে আনা হলো গৃহবধূ শাহিনার লাশ

স্টাফ রিপোর্টার:–
কুমিল্লার দেবিদ্বারে পুলিশ এবং উদ্ধারকর্মীদের ৬ দিনের শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযানে প্রায় ৬৪ ফুট মাটির নীচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ছেচড়াপুকুরিয়া গ্রামের গৃহবধূ শাহিনার গলিত লাশ। বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় কুমিল্লা পুলিশ সুপার টুটুল চক্রবর্তীর উপস্থিতিতে শাহিনার গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়।
জানা যায়, গত ৭ ফেব্রুয়ারি গভীর রাত থেকে নিখোজ হয় গৃহবধূ শাহিনা। ৯ ফেব্রুয়ারি তার ভাই দেবিদ্বার থানায় সাধারণ ডায়েরী করেন। পরে পুলিশ শাহিনার মোবাইল  কল লিস্ট এবং এলাকায় অনুসন্ধান করে একই গ্রামের আবদুল করিমকে গত ৬ মার্চ রাতে আটক করে। পরে সে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে শাহিনাকে আরো ২ ঘাতক নিয়ে হত্যার কথা স্বীকার করলে রাতেই পুলিশ ঘাতকের বাড়ির অদূরে নলকূপ এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করে। ৭ মার্চ থেকে সেখানে খকন কাজ শুরু হয়। লাশ উদ্ধারে আনা হয় ভারী যন্ত্রপাতি ও একটি বিশেষজ্ঞ টিম। গত ৯ মার্চ  কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক শফিকুল ইসলামের নিকট এ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় খুনী আবদুল করিম। টানা ৬ দিন খননের পর বৃহস্পতিবার  ৮৫ ফুট পাইপের মধ্যে ৬৪ ফুট উত্তোলন করার পরই উদ্ধার করা হলো ৩ সন্তানের জননী শাহিনার লাশ।
পুলিশ , নিহতের স্বজন ও শাহিনার অন্যতম ঘাতক আ: করিমের জবানবন্দী সূত্রে জানা যায়,  জেলার দেবিদ্বার উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের তুলাগাঁও গ্রামের কেরামত আলীর মেয়ের সাথে ১২ বছর পূর্বে পাশ্ববর্তী ছেচরাপুকুরিয়া গ্রামের সোলেমান মিয়ার পুত্র দুবাই প্রবাসী মোবারক হোসেনের বিয়ে হয়। তাদের ২ ছেলে ও ১ মেয়ে সন্তান রয়েছে। বিগত প্রায় ২ পূর্বে তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ দেখা দেয়। মোবারক ছুটিতে দেশে আসার পর পরিস্থিতি আরো অবনতি ঘটে। প্রায় ৩/৪ মাস ছুটি শেষে মোবারক হোসেন বিদেশে চলে যাওয়ার পরও মোবারক হোসেনের পরিবার শাহিনাকে শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়েছিল। এক পর্যায়ে শাহিনা  বাদি হয়ে তাদের বিরুদ্ধে দেবিদ্বার থানায় নারী নির্যাতন আইনে মামলা দায়ের করেন। মোবারক বিদেশ যাওয়ার পর পরে তাকে হত্যার পরিকল্পনা নেয়।   শাহিনা হত্যা মিশনে অংশ নেয় ৩ খুনী। তাকে হত্যা করতে স্বামী মোবারক হোসেনের দেয়া ১লাখ টাকা ভাড়াটিয়া ৩ খুনী ভাগাভাগি করে নেয়। প্রেমের অভিনয় করে ঘর থেকে বের করে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর গৃহবধু শাহিনাকে ৮০ ফুট গভীর নলকূপে নিক্ষেপ করে ঘাতকরা। ৯ মার্চ আদালতে চাঞ্চল্যকর এ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে প্রধান ঘাতক আব্দুল করিম। গ্রেফতারকৃত ঘাতক আবদুল করিম পুলিশের কাছে ১৬১ ধারায় জবানবন্দি দেয়ার পর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। ঘাতক আবদুল করিম তার জবানবন্দিতে জানিয়েছে, স্বামী মোবারকের পরামর্শে সে ও আরো ২ ঘাতক শাহিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। সে মোতাবেক আব্দুল করিমের পার্শ¦বর্তী বাড়ির গৃহবধু শাহিনার সাথে সে প্রেমের অভিনয় করে। এক পর্যায়ে তাকে রাতে বাড়ি থেকে বের করে ঘাতকরা গত ৭ ফেব্রুয়ারি দেবিদ্বারের ধামতী ওরশে নিয়ে যায়। গভীর রাতে ওরশ থেকে ফিরে বাড়ির পাশে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর আব্দুল করিমসহ ওই ঘাতকরা তাকে মাথা নিচে ও পা উপরে রেখে ৮০ ফুট গভীর নলকুপে নিক্ষেপ করে। পরে নলকূপের মুখ মাটি চাপা দেয়। তাকে হত্যার জন্য স্বামী মোবারক হোসেন দুবাই থেকে কুমিল্লার মুরাদনগরে জসিম উদ্দিন নামে তার এক বন্ধুর ব্যাংক একাউন্টে ১লাখ টাকা প্রেরণ করে। প্রধান ঘাতক আবদুল করিম ওই টাকা উত্তোলনের পর শাহিনাকে হত্যা করে সে নিজে ৪০ হাজার টাকা ও অপর দুই ঘাতককে ৩০ হাজার টাকা করে ভাগ করে দেয়। চুক্তি মোতাবেক অবশিষ্ট ১ লাখ টাকা বুঝে পাওয়ার আগে সে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে।
লাশ  উদ্ধারের পর কুমিল্লা পুলিশ সুপার টুটুল চক্রবর্তী সাংবাদিকদের জানান, এ মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে থানার ওসি ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সবাই দিবা-রাত্রি পরিশ্রম করে লাশ উদ্ধারসহ ঘটনার রহস্য উৎঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে। শাহিনার স্বামীকেও আইনী প্রক্রিয়ায় বিদেশ থেকে ফেরৎ আনা হবে। থানার ওসি তারেক মোহাম্মদ আবদুল হান্নান জানান, ঘটনার সাথে জড়িত অপর ২ আসামীকে গ্রেফতার করে শিগগিরই মামলার চার্জশিট আদালতে দেয়া হবে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহ মো: কামাল আকন্দ জানান, আসামীকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। শাহিনার মা ও ভাই  ও অন্যান্য স্বজনরা জানান, বিদেশে অবস্থান করেও মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে নিরপরাধ শাহিনাকে হত্যার জন্য ৩ ঘাতক ভাড়া করা হয়। তার ৩ সন্তানকে যারা এতিম করেছে তারা এদের ফাঁসি দাবি করেছেন। সুলতানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোশররফ হোসেন এবং সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান সরকার ও উপজেলা আ’লীগের সহসভাপতি আবদুল মতিন সরকার  অবিলম্বে ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্য ঘাতকদের গ্রেফতার ও বিচার দাবি করেছেন।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply