মহানবী (স.)’র আদর্শই পারে বর্ণ-বৈষম্যকে রোধ করতে

মো. আলী আশরাফ খান:–
এক মহৎ ও মহিমান্বিত গুঢ় রহস্যময় সৃষ্টি মানব জাতি। অসীম ক্ষমতাময় এবং সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী মহান রাব্বুল আলামীন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা সু-উন্নত জীবের সম্মান দিয়ে। সমগ্র সৃষ্টির চেয়ে ভিন্ন ও অতি মর্যাাদাবান এ মানব জাতি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক কোরানুল কারীমে বর্ণনা করেন, “নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি; স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি; তাদেরকে দিয়েছি উত্তম রিজিক আর আমি যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের ওপর তাদের (আদম সন্তান)-কে দিয়েছি শ্রেষ্ঠত্ব। (সূরা-বনী ইসরাইল, আয়াত-৭০)। এছাড়া সূরা তীনে রাব্বুল আলামীন আরও বলেছেন, ‘আমি তো সব মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতম আকৃতি ও সু-গঠনে (আয়াত-৪)। পবিত্র গ্রন্থ আল কোরানের এ ঘোষণা থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টিগতভাবে সকল মানুষকে সমমর্যাদার অধিকারী করে সৃষ্টি করেছেন। এবং পৃথিবীতে প্রেরণ করছেন।
কোনো ক্ষেত্রেই দেশ, গোত্র ও বর্ণ হেতু কাউকে আলাদাভাবে নির্ধারণ করেননি তিনি। অথচ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, বর্তমান বিশ্বে ‘সুপারসনিক-গ্লোবাল ভিলেজ’-এর দাবীদার মানুষ সভ্যতা নামের কালো ছায়ায় পতিত হয়ে নিজেদের সম্মান নিজেরাই ভুলন্ঠিত করছে। সাদা-কালোর বৈষম্য, ধনী-গরীব তথাকথিত শিক্ষিত ও অশিক্ষিতের প্রার্থক্য ব্যক্তি-সমাজ-জাতি সর্বোপরি রাষ্ট্র ছাড়িয়ে বিশ্বে এক ভয়াবহ অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। এ ব্যাধি বিনষ্ট করছে শান্তি-শৃঙ্খলা বিশ্বের সর্বত্রই। বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকায় বর্ণ বৈষম্যের দরুণ নির্যাতিত-নিপীড়িত হচ্ছে বহু নিরীহ নিরপরাধ সহজ-সরল মানুষ। সাদা-কালোর দাঙ্গায় অনেক সত্যনুসারী পতিত হচ্ছে মৃত্যুমুখে। দফায় দফায় জাতিসংঘসহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা উদ্যোগ নিয়েও পারছে না রোধ করতে এই ভয়াবহতা। অথচ মানবাধিকার নামের কথাটি বিশেষ করে পশ্চিমা দেশ থেকেই বেশি প্রচার হয়ে থাকে। এবং প্রতি বছরই বিশ্বব্যাপি পালিত হয় ‘বর্ণ বৈষম্য রোধ দিবস’। কিন্তু এসব লোক দেখানো মহড়ায় কাজের কাজ তেমন কিছু হতে দেখা যায় না; হবেও না।
আজ বলতে কোনো দ্বিধা নেই, যদিও দিনের পর দিন বিশ্বব্যাপী চলছে বিভিন্ন দিবস উদযাপনের খেলা। আমার মনে হয় ৫/৭ বছর পর দেখা যাবে বছরের ৩৬৫ দিনই কোনো না কোনো জাতীয় বা বিশ্ব দিবস পালিত হবে এবং তা মানুষকে অন্যান্য বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজকে বাধাগ্রস্ত করবে-যা প্রকারান্তরে মূল বিষয় থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দেবে এক সময় আমাদেরকে। এ দিবস উদযাপনের প্রবণতায় আমরা একরকম অসুস্থ হয়ে পড়বো। আসলে আমাদেরকে যদি প্রশ্ন করা হয়, এসব দিবস উদযাপন থেকে আমরা কি শিক্ষা গ্রহণ করি? আমাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক লোকই উত্তর দিতে পারবে। আবার যারা উত্তর দিতে পারে, এসব বিষয়ে জ্ঞান রাখে, তাদের মধ্যেও দেখা যাবে নিজেদের মধ্যে রয়েছে বহু গলদ। তাহলে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক এসব দিবস উদযাপন কতটা সচেতনতা সৃষ্টি করছে আমাদেরকে? আর যদি তা নাই হয় তাহলে আমাদের পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত কোথায়? না, আসলে তেমন কোনো উল্লে¬খযোগ্য পরিবর্তন বয়ে আনে না বছরের প্রায় সবদিনই উদযাপিত দিবসগুলো। যে কারণে সামাজিক অবক্ষয় দিনে দিনে দ্রুত হারে বেড়েই চলছে, সমস্যার আর্বতে বন্ধি হচ্ছি আমরা। লঙ্গিত হচ্ছে বিশেষ করে সাধারণ মানুষদের অধিকার ‘মানবাধিকার’। বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। অহরহ নিস্পেষিত হচ্ছে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে সাধারণরাই।
আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বে আমাদের দয়াল নবী শ্রেষ্ঠ মানবতার ধারকবাহক, সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (স.) মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আরাফাতের ময়দানে তাঁর যুগান্তকারী ঐতিহাসিক অমূল্য ভাষণ প্রদান করেন। তিনি সমবেত জনতাসহ আগত বিশ্ববাসীকে এই জঘন্য ব্যাধি বর্ণ-বৈষম্যের ব্যাপারে সতর্ক করে উল্লেখ করেন যে, ‘হে মানবমণ্ডলী! আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘তিনি তোমাদের একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করে তোমাদের পারস্পরিক পরিচিতির সুবিধার্থে বিভিন্ন সমাজ ও গোত্রে বিভক্ত করেছেন। তোমাদের মাঝে সে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট বেশি মর্যাদার অধিকারী যে তার জীবনের প্রতিটি কাজে অধিকতর তাকওয়া অবলম্বন করে। সদা সর্বদা আল্লাহর কথা সবচেয়ে বেশি স্মরণ করে। ইসলামে জাতি, শ্রেণী ভেদ ও বর্ণ বৈষম্য নেই। আরবের ওপর যেমন কোনো অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই তেমনি কোনো অনারবের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই কোনো আরবের। এমনি করে সাদার ওপর কালোর আবার কালোর ওপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব বা বৈশিষ্ট্য নেই। শ্রেষ্ঠত্ব, বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার একমাত্র ভিত্তি হলো তাকওয়া। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৫ম খন্ড, সিরাতে ইবনে হিশাম-২য় খন্ড)। রাসূলে পাক (স.) যেন তাঁর সে মহামূল্যবান ভাষণে বললেন, মানুষ রং ও বর্ণে ভিন্ন হতে পারে, কেউ সাদা, কেউ কালো, দেশ ও ভাষার ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে, কেউ বাঙালি, কেউ আমেরিকা, কেউ আরব, কেউ বা আনারব কিন্তু এ ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সব মানুষ এক সূত্রে গ্রোথিত, সকলেরই স্রষ্টা এক। সব মানুষই এক পিতা ও এক মায়ের সন্তান। সব মানুষেরই পিতা আদম আর মাতা হাওয়া। সকল মানুষ পরস্পরে ভ্রাতৃত্বের সুনিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ। সকলেই মাটির তৈরি। সব মানুষই একস্থান থেকে পৃথিবীতে এসেছে এবং একই স্থানে প্রত্যাবর্তন করবে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই রয়েছে গভীর যোগসূত্র। যে যত বেশি স্রষ্টাকে ভয় করবে সে হবে মানুষের মাঝে অধিক মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। সুতরাং বংশ গৌরব ও মর্যাদার লড়াই নয়। নয় বর্ণ বৈষম্য। সব মানুষই এক। যে কালো সেও ভাই, যে সাদা সেও ভাই। তাই ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি হানাহানি ঝগড়া ফ্যাসাদ নয়। নয় দাঙ্গা-হাঙ্গামা।
আমাদের প্রিয় নবী রাসূলে পাক (স.) কেবল ভাষণ দিয়েই শেষ করেননি বরং বাস্তব কার্যক্ষেত্রে তিনি তা জীবনের পরতে পরতে বাস্তবায়ন করে আগত বিশ্ববাসীর সম্মুখে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। এ লেখায় আমরা হযরত আলী (রা.) এর উদাহরণ তুলে ধরতে পারি। তিনি ছিলেন কালো, বাহ্যত দেখতে অসুন্দর, ঠোঁট দু’টো মোটা মোটা। কিন্তু দরবারে নবুওয়াতে তার মর্যাদা অতি উচ্চে। তিনি সবচে’ বেশি সুন্দর ও সুশ্রী। অর্থ্যাৎ ভেতরগতভাবে তিনি ছিলেন প্রকৃত সুন্দর। রাসূল (সা.) তার আপন মসজিদ, মসজিদে নববীতে বেলালের মতো এক হাবশী কৃষ্ণ সাহাবীকে মোয়াজ্জিনের মতো পবিত্র ও মহান দায়িত্ব দিয়ে গোটা বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন ইসলামে বর্ণ বৈষম্যের কোনো স্থান নেই। বর্ণ-বৈষম্য বলতে ইসলামের মধ্যে কিছু নেই। শ্রেষ্ঠত্বের মাপ কাঠিতেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন হয়। যা প্রকৃত যোগ্যতা দিয়ে প্রমাণ করতে হয়। এখানে বর্ণ বৈষম্যের জালে জড়িয়ে সুন্দরতম আবাস ভূমি-পৃথিবীকে কলুষিত করার অধিকার কারই নেই।
পৃথিবীকে নরকে পরিণত করতে সাদা কালোর বিবাদ ঘটতে পারে। যে জন্য তিনি এ বৈষম্যকে এড়িয়ে গিয়ে সুস্থ-সুন্দরভাবে মিলেমিশে বেঁেচ থাকার কথাই বুঝিয়েছেন। সৃষ্টির ব্যাপারে আদৌ কারও হাত নেই। আল্ল¬াহ যাকে যেমন খুশী ঠিক তেমনই সৃষ্টি করছেন। বর্তমান বিশ্বে এই ভয়াবহ বর্ণ বৈষম্যকে রোধ করতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর আদর্শের বাস্তবায়ন। আমরা যদি প্রিয় নবী (স.) এর উপরে উল্লে¬খিত ভাষণের অর্থবহতাকে আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করি তাহলেই আমাদের মাঝে সৃষ্টি হবে সাম্যের, বন্ধুত্বের, ভ্রাতৃত্ববোধের তথা আমরা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারবো এই অপরূপ সৌন্দর্যময় ধরনীতে।

লেখক:কবি-কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্ল¬¬া।
মুঠোফোন-০১৮১৬-২৫৯৫৩২
তারিখ:০৯.০৭.২০১২
ই-মেইল: khan_sristy@yahoo.com

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply