একুশে পদকটিকে সরকার বারবার কলঙ্কিত করছে

মো. আলী আশরাফ খান:–
এদেশের আমজনতা মনে করে, ‘একুশে পদক’ মানেই ভাষা নিয়ে যারা সংগ্রাম করেছে তাদেরই অধিকার। অর্থাৎ যারা ভাষাসংগ্রামে জীবন উৎসর্গ করেছেনে এবং যারা বেঁচে আছেন তাদেরই প্রাপ্য এই একুশে পদকটি। অবশ্য পরবর্তীতে যারা ভাষাচর্চায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে এবং রাখবে তাদের ক্ষেত্রেও এ গুরুত্বপূর্ণ পদকটি প্রযোজ্য বলে মনে করে সাধারণ মানুষ। কিন্তু সরকার স্বাধীনতার পর অর্থাৎ ১৯৭৬ সাল থেকেই এ পদকটির সঠিক ব্যাবহার করেনি। যে সরকার ক্ষমতায় আসে সে সরকারই দলীয় লোকদের ‘একুশে পদক’ প্রদান করে এ পদকটিকে বারবার কলঙ্কিত করছে। সরকার এ ক্ষেত্রটিকে এখন এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করেছে যে এ পদকটির গুরুত্ব নেই বললেই চলে।
আমাদের কথা হলো, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বহু পদক চালু রয়েছে এদেশে। সরকার প্রয়োজনে আরো পদক সংস্কৃতি চালু করতে পারে। কিন্তু একুশে পদকটিকে লেজেগোবরে করার মানে আমাদের ভাষার প্রতি এবং সংগ্রামের প্রতি অবজ্ঞারই বহিঃপ্রকাশ বলে আমরা মনে করি। যদিও কিছুু কিছু ক্ষেত্রে সরকার ভাষা সৈনিকদের সম্মান প্রদর্শনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। কিন্তু তা দলীয় বিবেচনায় করা হচ্ছে বলে অনেকেই বাদ পড়ছেন। সরকার বলেছিলেন, জীবিত সকল ভাষা সৈনিকদের একুশে স্মারক প্রদান করা হবে। যারা একুশে পদক পাননি, তাদের একুশে স্মারক প্রদান করা হবে বলে এ ঘোষণায় বলা হয়েছে। ভাষা আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের সবাইকে মরণোত্তর জাতীয় পদক প্রদান এবং জীবিতদের ক্রমন্বায়ে জাতীয় পদক প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সরকার (সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়) কে নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। ভাষা শহীদের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্তসহ ছবি সংবলিত বোর্ড ডিসপ্লে¬ বোর্ড স্থাপন করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। যে সব ভাষাসৈনিক জীবিত আছেন, তাদের মধ্য থেকে যদি কেউ সরকারের কাছে আবেদন করেন, তাহলে তাদের যথাযথ আর্থিক সাহায্য এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিল। সচিব, সংস্কৃতি মন্ত্রাণালয় রেসপন্ডেট নং-২ কে ভাষাসৈনিকদের প্রকৃত তালিকা তৈরির জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে ১টি এবং জেলায় জেলায় ডিসির মাধ্যমে কমিটি গঠন করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিল।
উল্লেখ করা হয়েছিল, কমিটি কর্তৃক দাখিলকৃত তালিকা যাচাই-বাছাইপূর্বক গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। কমিটির সদস্য থাকবেন ভাষা সৈনিক, কবি, সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ এবং মুক্তিযোদ্ধা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে একটি লাইব্রেরীসহ ভাষা জাদুঘর নির্মাণ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করার কথা বলা হয়েছিল। ওই জাদুঘরে সার্বক্ষণিক গাইড নিয়োজিত রাখা, ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে প্রকৃত ইতিহাস (সংক্ষিপ্ত তথ্যবলী) সন্নিবেশিত করে বাংলা, ইংরেজি ভাষা ব্রুসিয়ার আকারে প্রস্তুত করে জাদুঘরে রাখার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিল। যাতে দেশী-বিদেশী পর্যটকরা ওই ব্রুসিয়ার হলে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে তথ্যাবলী পেতে পারেন। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী জীবিত ভাষা সৈনিকদের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ করা এবং সরকারের সাধ্যমতো সব রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করার জন্যও নির্দেশ দেয়াও দেয়া হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার তৈরি এবং সংরক্ষণের করতেও বলা হয়েছিল। কিন্তু এসবের বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে? এ প্রশ্ন কিন্তু ১৬ কোটি মানুষের।
সরকার জীবিত ভাষা সৈনিকদের ব্যাপরে যে একুশে স্মারকের কথা বলেছেন, এটির সঙ্গে সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই একমত হতে পারছে না। কারণ, মানুষ মনে করে, বিগত দিনে যে সব ভাষা সৈনিকরা একুশে পদক পেয়েছেন এবং বর্তমানে জীবিত যারা আছেন তাদের ক্ষেত্রে এ চিন্তা দ্বৈতনীতিরই বহি:প্রকাশ। সুতরাং জীবিত সকল ভাষা সৈনিকদের একই দিনে, একই সময়ে, একই কাতারে দাঁড় করিয়ে যত দ্রুত সম্ভব একুশে পদক প্রদান করাই হবে যুক্তিযুক্ত ও যথাযথ সম্মানের। মরণত্তোর শব্দটি শুধু ভাষা সৈনিকদের ক্ষেত্রেই নয় বরং কারো ক্ষেত্রেই কাম্য নয়।
সবশেষ কথা হলো আমরা আর চাই না, সরকার একুশে পদকটিকে কলঙ্কিত করুক। আমরা চাই, ভাষা সৈনিকদের ঋণমুক্ত করতে জাতির প্রয়াস হোক অনিন্দনীয়। সরকার দলীয় বিবেচনায় নয় প্রকৃত ভাষাসৈনিকদের একুশে পদক প্রদান করুক-এটা আমাদের কাম্য। একুশে পদক ও ভাষা সৈনিকদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শনে সরকারের ভূমিকা হোক প্রশংসনীয়। ভাষা সৈনিকেরা সঠিক মর্যাদায় আসীন হোক, বিশ্ববাসী দেখুক তাদের দেয়া হয়েছে যথাযথ সম্মান ।
লেখক: কবি-কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।
তারিখ: ১৯.০২.১৪

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply