রুখতে হবে অপসংস্কৃতি” ভ্যালেন্টাইন ডে”

মো. আলী আশরাফ খান:–
প্রত্যেক গোষ্ঠী-জাতি তথা দেশেরই রয়েছে স্ব-স্ব সংস্কৃতি, হোক তা শুভসংস্কৃতি বা অপসংস্কৃতি। সংস্কৃতি-শুভসংস্কৃতি বলতে আমরা যা বুঝি-পরিশীলন, পরিমার্জন, সু-সম্পাদন কিংবা উত্তমরূপে কোন কর্মের পরিসম্পাদন। প্রত্যেক জাতিরই স্ব-স্ব চিন্তার দ্বারা নিজেদের জীবন চালনার জন্য কিছু কিছু উলে¬øখযোগ্য স্বকীয়তা থাকে,  যার চর্চার মধ্যদিয়ে তাদের কৃষ্টি-কালচার ফুটে ওঠে এবং তারা কতটা উৎকর্ষতার সঙ্গে সভ্যতা বহন করে তা তাদের চিন্তা-চেতনায়, চলন-বলনে, আচার-আচরণে ও পোশাক-পরিচ্ছদে প্রতিভাত হয়। এসব বিষয়গুলোয় যেজাতি যতটা পরিচ্ছন্ন ও উন্নত সেজাতি ততটা সুখী-সমৃৃদ্ধশালী এবং শান্তি-শৃংখলার দিক দিয়েও তারাই দৃষ্টান্ত স্থাপন অতঃপর নিজেদেরকে সভ্যতার চালিকা শক্তিরূপে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু  অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, আজ আমরা যদি বিশ্বের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো, কোন দেশই সংস্কৃতির দিক দিয়ে পরিশুদ্ধতার চর্চায় অভ্যস্ত নয়। শুধু তাই নয়, যত্তসব কুসংস্কার, যারপরনাই নষ্টামি-বেহায়াপনা, ভ্রান্তধারণা প্রসূত অপসংস্কৃতিকেই আমরা সংস্কৃতি বা কখনও কখনও আধুনিক সংস্কৃতি বলে দিব্যি চালিয়ে দিচ্ছি দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে, গোষ্ঠীতে-গোষ্ঠীতে সর্বোাপরি পরিবার-ব্যক্তি পর্যায়েও ।
যতই দিন যাচ্ছে ততই আমরা যেনো প্রকৃত সংস্কৃতি থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছি। এখানে মুসলিম সংস্কৃতিকে যদি আমরা বাদই দিই তারপরেও বলতে হয়, যে সংস্কৃতির চর্চা আমাদের মধ্যে বিদ্যমান তা নিঃসন্দেহে বিশ্বমানুষকে নরকে নিক্ষেপ করছে এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আর মুসলিম সংস্কৃতিকে আমরা বাদই বা দেবো কেনো? আমরা যেহেতু মুসলমান হিসেবে দাবি করি সেহেতু  মুসলিম সংস্কৃতিকে বাদ দেয়ার কোন অবকাশ নেই। এরচেয়েও বড় কথা, আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে  মানবজাতির হেদায়েতের কা-ারী সাইয়েদুল মুরসালিন হযরত মুহাম্মদ (সা.) যে সংস্কৃতি আমাদের জন্য উপহার দিয়ে গেছেন এরচেয়ে বিশুদ্ধ-উন্নত বাস্তবসম্মত বড় সংস্কৃতি আর কি হতে পারে? সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আধুনিক মানুষটি কি তাঁর জীবনের দীর্ঘসময়-৬৩ বছরের পরিক্রমায় আমাদেরকে দান করে যাননি কিভাবে জীবন যাপন করলে মানুষ সর্বোত্তম ও উৎকর্ষতার স্বাদ গ্রহণ করবে? মানুষ জন্ম লাভের পর যত দিন এই ধরাধামে বেঁচে থাকবে তার এমন কোন ক্ষেত্র নেই যে, বিশ্বমানবতার পথপর্দশক প্রিয় নবী (সাঃ) আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়ে যাননি। তবে কেনো আবার নতুন করে আমাদেরকে সংস্কৃতিকে নিয়ে ভাবতে হবে। আমরা যদি মুসলমান হয়ে থাকি তাহলে ওই সংস্কৃতিই আমদের সংস্কৃতি। এটিই মুসলিম সংস্কৃতি।  এর কোন বিকল্প নেই, থাকতে পারেনা। এটা আমাদেরকে স্বীকার করতেই হবে।
কিন্তু আজ বিশ্ববাসী এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, চারদিকেই অপসংস্কৃতির হলিখেলার করালগ্রাসে  বিপর্যস্ত-নাস্তানাবুঁদ হয়ে পড়েছে। আমাদেরকে এখন মানুষ নামের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে এমন কিছু জাতি-গোষ্ঠী আধুনিকতার নামে চরম বেহায়াপনায় লিপ্ত রয়েছে-যারা শক্তি সামর্থ্য ও অর্থনীতিক দিক দিয়ে আমাদের চাইতে অনেক এগিয়ে। তাদের কাছে আজ আমরা একরকম জিম্মি। বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতার নামে তারা আমাদের স্বকীয়তা, দেশপ্রেম, মানবতাবোধ সর্বোপরি স্বজাতীয় সংস্কৃতিকে গলাটিপে হত্যা করছে এবং আমাদের মধ্যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে ঢুকিয়ে দিচ্ছে তাদের অপসংস্কৃকিগুলোকে। এই বিষাক্ত সাপের ছোবল থেকে রেহাই পাচ্ছেনা শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী ও বৃদ্ধরাও। আকাশ সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতিকে এমনভাবে আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে যা বলাইবাহুল্য। ডিস চ্যানেলগুলোতে এখন মানবিক বোধ বা চেতনার লেশমাত্র নেই। মানুষের মানবিক গুণাবলীর বা নৈতিক উৎকর্ষের বিকাশধর্মী কোন কিছুর প্রতিফলন দেখা যায়না এসব চ্যানেলগুলোয়। বরং যৌন সংগম, নারীর উন্মুক্ত বক্ষ, অশ্লীলনৃত্য, পৈশাচিক উন্মাদনার লোমহর্ষক খুনের চিত্রগুলো আমাদের মাঝে অপরাধ প্রবণতা দিনে দিনে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এবং কম্পিউটার গেম, ইন্টারনেট, ফেসবুক, পর্নো ছবি ও টেলিভিশনের সিরিজের প্রতি আকর্ষণ প্রকারান্তরে সমাজে ব্যাপক হিংসাত্মক মনোবৃাত্তি ও হৃদয়হীন আচার-আচারণের উন্মেষ ঘটাচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন এগুলো চর্চা-দেখার কারণে ছেলেদেরে চেয়ে মেয়েদের উপর প্রভাব ফেলছে প্রকটভাবে। সিংহভাগ শিশুরা পারিবারিক ভায়োলেন্সের শিকার। এবং এতে কিশোর-কিশোরী ভয়াবহ শারীরিক জখম ভোগ করে।
এখন আসা যাক ভ্যালেন্টান ডে ’র মতো  অপসংস্কৃতি প্রসঙ্গে। ভালোবাসার নামে এই দিনটিকে এমনভাবে আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীদের মাঝে ভ্রান্তধারণা বদ্ধমূল করা হয়েছে যে, যেনো এই দিনটিই ভালোবাসার দিন। এই দিনে উন্মাদ হয়ে একে অপরের মাঝে বিলিয়ে দাও দেহে যা আছে তা। অশ¬ীল নৃত্যঝংকারে, স্বল্প বসনে, আনন্দ-উল্ল¬াসে ও নেশায় মত্ত হয়ে মেতে ওঠো দেহের সমগ্রশক্তি দিয়ে। যার আছে যেজন ঝাঁপিয়ে পড়ো পার্কের কোন নিরালায়-গাছের আড়ালে, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরায় যে যেমন পারো ভোগ করো দেহ যে যার মত করে। খাও দাও ফূর্তি করো যত্ত পারো তত্ত। কিন্তু এর পরিণাম যে কতটা ভয়াবহ তা কি চিন্তা করে দেখেছে আমাদের দেশকর্ণধাররা। পশ্চিমারা তো ইচ্ছে করেই উস্কে দিয়েছে আমাদের। তারা তো চায়, আমরা আমাদের স্বজাতীয় সংস্কৃতিকে পদদলিত করে তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে একাকার হই। পৃথিবীতে কে না চায় তার দল ভারি হোক। তাদের উপর দোষ চাপানোর মানে নিজেদের অজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ।
কে কবে ভালোবাসার ভুল সংজ্ঞায় পর্যবসিত হয়ে নিজেদের মধ্যে এমন একটি দিনের জন্ম দিয়েছে আর তার সূত্রধরে আমরাও নাচনেওয়ালা পুতুলের মত নাচতে থাকবো,তা কি করে হয়। এর প্রতিরোধে সচেতনদেরকে কি এগিয়ে আসা উচিত নয়? তাও আবার এই দিনটিকে কে কখন কিভাবে আবিষ্কার করল আমরা বা তা কতটুকু জানি? আসলে এই দিনটি ঘিরে যেসব ইতিহাস রয়েছে এরই বা কতটুকু ভিত্তি রয়েছে? আধোআলো আধোঅন্ধকারের মধ্যে এর ইতিহাসে রয়েছে যথেষ্ট গোঁজামিল। আমরা যদি একটু পেছনে ফিরে দেখি তাহলে দেখবো যে, এর যথাযথ কোন  ভিত্তি খূঁেজ পাবো না। যে ভালোবাসার নামে সৃষ্টির চেয়ে ধ্বংসের প্রবণতা, রয়েছে এই দিনটিকে নিয়ে অনেক মত প্রার্থক্য। এটাকে নিয়ে এতো মাথা গামানোর কি প্রয়োজন আছে আমাদের(?) তারপরেও কিছু রেফারেন্স না টেনে এ লেখাটি শেষ করলে অপুর্ণতা থেকে যাবে। ৮২৭ খ্রিস্টাব্দে রোমের পোপ সেট ভ্যালেন্টাইন নির্বাচিত হয়েছিলেন বলে কেউ কেউ মনে করেন। ভাল ব্যাবহার ও সৎচরিত্রের জন্যই নাকি তিনি সকলের পছন্দনীয় হয়ে ওঠেন। কিন্তু পোপের দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র ৪০ দিনের মাথায় তার মৃত্যু হয়। আর পোপের মৃত্যুর পর রোমের বাসিন্দারা স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ১৪ ফেব্র“য়ারি। সাধারণত প্রেমিকরা  এ অনুষ্ঠানে যোগ দিত। এর পর থেকেই নাকি এই দিনটিকে ভ্যালেন্টাইন ডে হিসেবে পালন করা হয়। আবার অনেকে মনে করেন, প্রাচীন রোমবাসী কুমারী মেয়েরো এদিন ভালোবাসার কাব্য লিখে মাটির পাত্রে জমা করতো। ওই পাত্র থেকে তরুণরা যে মেয়ের নাম তুলে আনতো সে মেয়ের সঙ্গেই তাকে বিয়ে দেয়া হতো। অন্য আরেক কথায় এমন যে, সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামে দুইজন  খ্রিস্টান যাজক ছিলেন, যাদের একজনকে রোম সম্রাট ১৪ ফেব্রুয়ারি শিরশ্চেদ করেন। কারণ, তিনি যুবক সৈনিকদের বিয়ে করাকে দ-নীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। অথচ, তিনিই এআইনকে ভঙ্গ করে এক অষ্টাদশী তরুণীকে বিয়ে করেন। আবার কারো মতে, সম্রাট রোমানদের দেবী পূজার বিরোধীতা করতেন। এটাকে মহা অপরাধ ভেবে তাকে বন্ধি করা হয়। এইসময় যাজকের বন্ধুরা তাদের ভালোবাসার কথা লিখে কারাগারে ছুঁেড় মারে। বলা হয়, ২৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ফেব্র“য়ারি এ যাজককে হত্যা করা হয়। একারণে পোপ প্রথম জুলিয়ার্স ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন ডে ঘোষণা করেন।
আরো দু’টি কাহিনী দিয়ে শেষ করবো এই লেখা।  ১৪ ফেব্রুয়ারি উদ্যাপিত হতো জুনো উৎসব। সন্তান জন্ম এবং বিবাহের দেবী জুনো হলো-রোমান উপকথার প্রধান দেবী। এ উৎসবের দিনে তরুণরা একটি বাক্সে রাখা তরুণীদের নামে লেখা কাগজ তুলতেন। যার নাম ওঠতো ওই তরুণীই হতো  সেই তরুণের নাচের সঙ্গী। পরে তারা নেচে গেয়ে আগত সকলকে আনন্দ দিত। পরের একটি কাহিনী, ১৪ ফেব্রুয়ারিতে পাখিরা তাদের সঙ্গী বেছে নেয়। এই দিনটিকেই বসন্তের আগে পক্ষীকূলের মিথস্ক্রিয়ার প্রিয়শেষ্ঠ সময় বলে মনে করা হয়। ইত্যাদি ইত্যাদি উদ্ভট ধারণা থেকে ভ্যালেন্টাইন ডে’র জন্ম। পাঠক মহল নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝে নিয়েছেন যে, এই দিনটির গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু? অস্বীকার করার কি কোন সুযোগ আছে? সুতরাং এখনই রুখতে হবে ভ্যালেন্টাইন ডে অপসংস্কৃতি। আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘ভালবাসা’ শব্দটি অতি পবিত্র একটি শব্দ। এই শব্দটিকে ঘিরে বেহায়াপনা, অশ্ল¬ীলতা ও কুৎসীত কোন ঘটনার অবতারনা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা আজ থেকে এসবের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবো। আমাদের ভালোবাসা হবে-শ্রদ্ধার-স্নেহের, ত্যাগের সর্বোপরি শান্তির। আমরা সকল ক্ষেত্রে ভালোবাসার মহিমাণ্বি^ত শব্দের শক্তিতে জয় করবো সমগ্র সৃষ্টিকূলকে। প্রমাণ করবো মানুষই সৃষ্টির সেরা জীব।

লেখক: কবি-কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লøা ।
তারিখ:১২.০২.১৪

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply