ইসলামে ক্ষমা প্রদর্শণ ও ওয়াহ্শী’র ইসলাম গ্রহণ

মো. আলী আশরাফ খান:–
ওয়াহ্শী (রা.)-এর নাম শুনেননি এমন মুসলমানের সংখ্যা বিরলই বলা যায়। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত সাহাবী। অথচ তিনিই হযরত হামজা (রা.)’র হত্যাকারী। আর হযরত হামজা (রা.) ছিলেন হুজুরে পাক (স.)’র অতিপ্রিয়জনের একজন। পর্যায়ক্রমে চাচা, দুধ ভাই ও বন্ধুত্বের মত প্র্রগাঢ় ছিল তাদের আত্মিক সেতুবন্ধন। যার ইসলাম গ্রহণে শক্তির সঞ্চার হয়েছিল মুসলমানদের। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এই সাহসী ও সত্যের সৈনিক হামজা (রা.)-কে হত্যা করেছিল ওয়াহ্শী।
সত্যের সঙ্গে মিথ্যার যুদ্ধ চলছে; চলছে যুদ্ধ অবিরাম আলোর সঙ্গে অন্ধকারের। বাতিলের সঙ্গে সত্যানুশারীদের। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-তাঁর অর্ন্তদৃষ্টি দিয়ে দেখছিলেন বীর বিক্রমদের যুদ্ধ। হঠাৎ হযরত হামজা (রা.)-কে দেখতে পেলেন না তিনি। যিনি একটু আগেও দু’হাতে তরবারি নিয়ে শত্রুর ভীষণ ভিড়ে প্রচ- শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন আর সেই তিনি এখন কোথায় গেলেন! হুজুর (স.) তাড়াতাড়ি দুইজন সাহাবীকে হামজা (রা.)-এর খোঁজে পাঠালেন। সাহাবীদ্বয় সেখানে গিয়ে দেখলেন হামজা (রা.) শহীদ হয়ে গেছেন। তাঁর বুক চিরে ফেলা হয়েছে। পেট ফাড়া; বেরিয়ে গেছে নাড়িভুড়ি; কলিজা চিরে ফেলা হয়েছে; ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে সমস্ত দেহ। এই নিষ্ঠুর-নির্মম ও বিভৎস দৃশ্য দেখে সাহাবীদ্বয় শোকে-দুঃখে যেন বোবা হয়ে গেলেন। তারা অতি তাড়াতাড়ি ফিরে এলেন প্রিয় নবী (স.)-এর কাছে। হুজুরে পাক (স.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘হামজা কোথায়? কী অবস্থা তাঁর। তাঁরা পারলেন না উত্তর দিতে। শুধু বললেন, ‘আপনি নিজে গিয়ে দেখে আসুন, ইয়া রাসুলুল্লাহ’।
হুজুরে পাক (স.) সেখানে গেলেন। দেখলেন ছিন্নভিন্ন লাশ। তিনি তাকিয়ে রইলেন নির্মিমেষে। তাঁর ঠোঁট দু’টো কেঁপে উঠলো। চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে এলো। তিনি ধীরে ধীরে বসে পড়লেন। লাশের ওপর হাত রাখলেন। চাচার রক্তাক্ত দেহে হাত রাখতেই চলে এলো তাজা রক্ত। অনেকক্ষণ সেই রক্তের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। তেইশ বছরে যা তিনি দেখেননি, তা দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। শিশুর মতো উচ্ছকিত স্বরে এতো জোরে কাঁদলেন যে, বহু দূর পর্যন্ত সে শব্দ পৌঁছে গেল। সাহাবারা ছুটে এলেন দূর থেকে। সকলের চোখে মুখে শোকের ছায়া, বিস্ময় ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কারণ, তারা তাদের প্রিয় নবীকে এত বেশি শোকাভিভূত হতে আর কখনও দেখেননি। হুজুর (স.) কাঁদছেন, হযরত আলী (রা.) কাঁদছেন, কাঁদছেন সাহাবা (রা.)। চারদিকে কান্নার রোল পড়ে গেল। এক হৃদয় বিদারক মর্মস্পর্শী দৃশ্য। অসহ্য এ বেদনায় গুমরে গুমরে কাঁদছেন হুজুরে পাক (সা.)। এমন সময় আসমান থেকে নেমে এলেন জিবরাইল আমিন। তিনি বললেন, ‘ইয়া (রা.)! আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আপনি দুঃখ করবেন না। আমি হামজাকে আরশে নিয়ে গেছি’। আর হামজা হচ্ছেন, ‘হামজাতু আসাদুল্লাহি ওয়া আসাদুর রাসুল। হামজা (রা.) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে বাঘ’।
মক্কা বিজয়ের পর ওয়াহ্শী (রা.) পালিয়ে গেলেন তায়েফে। যার দূরত্ব মক্কা থেকে প্রায় দুইশত কিলোমিটার। হযরত মুহাম্মদ (স.), একজন সাহাবীকে ওইখানে পাঠিয়ে দিলেন। যাও, ওয়াহ্শীর সঙ্গে দেখা করো। তাকে বলো, সে যেন কালিমা পড়ে নেয়। আল্লাহ পাক তাকে মাফ করে দেবেন। সে জান্নাতে যাবে’। হুজুর পাক (স.) মহান-মহৎ ও অতি দয়ালু, তিনি ভুলে গেলেন প্রতিশোধ নেয়ার কথা। তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্যকে বড় মনে করে; প্রিয়জন হারানোর বেদনাকে সহ্য করে উম্মতের হেদায়াতের জন্য সামনের দিকে এগিয়ে চললেন। দূত পাঠানো হলো, তাকে ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার জন্য। সেই বার্তাবাহক সাহাবী (রা.) তায়েফে পৌঁছে দেখা করলেন ওয়াহ্শী’র সাথে। প্রিয় নবীর পয়গাম শোনালেন তাকে। তিনি বললেন, ‘আমি এই কালিমা পড়ে কি করবো? আমি তো শিরক্ করেছি। আমার গুনাহ মাফ হবার নয়’। সাহাবী বললেন, ‘আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করে দেন’। ওহাশী বললেন, ‘আমি চুরি করেছি, ব্যভিচার করেছি, মানুষ খুন করেছি। এমন কি আমীর হামজার হত্যাকারীও আমি নিজে। আমি মদ পান করেছি। আমার আর মাফ পাবার কোনো রাস্তা নেই। অন্য কোনো কথা বলো। তুমি ফিরে যাও’। সেই দূত ফিরে এলেন এবং হযরত মুহাম্মদ (স.) কে ওয়াহশী’র সর্ব কথা শোনালেন। হযরত পুনরায় ওই দূতকে বললেন, ‘তুমি ফিরে যাও তায়েফে। আর ওয়াহ্শীকে এ কথা বলো যে, আমার মহান প্রতিপালক একথা বলেন ‘তাওবা করো, ঈমান আনো, সৎ কর্ম করো। দয়ালু আল্লাহ তায়ালা গুনাহকে নেকিতে পরিণত করবেন’।
ওয়াহ্শী শুনে বললো, ‘এ বড় কঠিন শর্ত। ঈমান আনো সৎ কর্ম করো-এ আমাকে দিয়ে হবে না। অন্য কোনো রাস্তা বলো’। সাহাবী আবারও ফিরে এলেন। মানব জাতির হেদায়াতের নবী মুহাম্মদ (স.) বললেন, ‘তুমি আবার ফিরে যাও’। ঐ সময় ছয় শ’ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া দুরহ ব্যাপার ছিল। তবুও শুধু মাত্র একজন মানুষের হেদায়াতের লক্ষ্যে এ প্রচেষ্টা ছিল কতটা প্রগাঢ় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাও সে হুজুর (স.)-এর সবচে’ প্রিয়জনের হত্যাকারী। তারপরও সবকিছু উপেক্ষা করে অবিরাম হেদায়াতের মিশন চালিয়ে যাচ্ছেন সকল কষ্টকে মেনে নিয়ে। হুজুর (স.) সাহাবীকে বললেন, ‘তুমি ফিরে গিয়ে তাকে বলো আমার প্রতিপালক অত্যন্ত দয়ালু’। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা শিরক্ ছাড়া সব গুনাহ মাফ করে দিবেন। যাকে ইচ্ছা’। ওয়াহ্শী শুনে বললো, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা’ বলেছেন আমাকে নাও মাফ করতে পারেন। কথার মধ্যে জটিলতা রয়েছে। অন্য রাস্তা দেখো। তুমি ফিরে যাও’। তিনি আবারও ফিরে এলেন। আল্লাহু আকবার। আল্লাহ আমাদের কেমন মহান দ্বীন দরদী নবী দিয়েছেন। এমন গভীর প্রেম তার উম্মতের প্রতি। একজন কাফিরের কাছে বারবার পাঠাচ্ছেন সত্যের বাণী। তাঁর দরদভরা মন ওয়াহ্শীকে সত্যের পথে আসতে প্রাণান্ত পরিশ্রম চালিয়ে ছিল।
যিনি আমাদের মৃত্যুর সময় কাছে দাঁড়াবেন, কবরে আমাদের সাহায্য করবেন। হাশরের মাঠে সব নবী বলবেন, ‘ইয়া নাফসি’ ইয়া নাফসি’। তখন তিনি, আমাদের নবী আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবেন। পুলসিরাতে সমগ্র মানব একে অন্যকে ভুলে যাবে। আর তিনি পুলসিরাত আঁকড়ে ধরে বললেন ‘হে আল্লাহ, তুমি পাড় করে দাও, তুমি পাড় করে দাও’। সুতরাং একজন খুনী মানুষ ওয়াহ্শীর হেদায়াতের জন্য যখন হুজুর (স.) মেহনত করলেন তখন তার অন্তরকে আল্লাহ তায়ালা পাল্টে দিলেন। ¯্রষ্টার দিকে। নবীর দিকে। সত্য ও সুন্দরের দিকে।  প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর দূত ফিরে যাবার পর থেকে ওয়াহ্শীর মাথায় শুধু একই চিন্তা। তিনি সর্বদাই ভাবছেন দূতের কথাগুলো। ভেবেই চলছেন সারাক্ষণ। দূতের কথামালা ওয়াহ্শীর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তার ভাবনার বলয়ে কাজ করছে, সত্যিই কি আল্লাহ আমাকে মাফ করে দেবেন? ইসলাম যে সত্য তা আমার বুঝতে বাকী নেই। দিবালোকের মত পরিষ্কার। আর যদি তা না হতো তাহলে আবু তালিবের ইয়াতিম ভাতিজা কি করে এতো বড় সফলতা পায়। এতো সম্মানের অধিকারী হয়। সকলেই তার কথা মান্য করছে। তাকে শ্রদ্ধা করছে। মক্কা আজ তাঁর হাতের মুঠোয়! সবচেয়ে আশ্চার্যের ব্যাপার, আকরামার মতো দুর্দান্ত আজ মুসলমান। দুর্বিনীতা হিন্দাও! দুর্জয় আবু সুফিয়ান ও মহাবীর খালিদ? আমার ইবনুল আস? তাহলে বাকি থাকলোটা আর কে?
মুহাম্মদ যদি এসব মিথ্যে বলতো তাহলে এমন অবিশ্বাস্য ঘটনা কি করে সম্ভব? সবার অন্তর আশ্চর্যজনকভাবে পাল্টে গেল। তাহলে কি আমাদের এতো দিনের পূজা-অর্চনা সব মিথ্যে। লাত, ওজ্জা, হোবল … সব মাটির পুতুল কি কোনো ক্ষমতা রাখেনা? সব কিছু আল্লাহ করেন। তিনি কি একা সৃষ্টি করেছেন সমগ্র পৃথিবী? পৃথিবীর সকল গ্রহ-তারা, নদী-সাগর, পাহাড়-পর্বত, মরু-জঙ্গল, আকাশ-বাতাস ও জমিন সব কিছুই তারই সৃষ্টি? আল্লাহ তায়ালা’র এসব সৃষ্টি অতঃপর সৃষ্টিকর্তাকে নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন, ওয়াহ্শী (রা.)। বারবার ওয়াহ্শীর মনে চিন্তার ঢেউ খেলছে হুজুর (স.)’র পাঠানো দূতের বলা শব্দ সমষ্টি। তার মাঝে পুনঃ পুনঃ সৃষ্টি করছে ঢেউয়ের পর ঢেউ। চেতনার সাগরে আছড়ে পড়ছে বিবেকে উদয় হওয়া সত্য-সুন্দরের চিন্তা। ওয়াহ্শী আবার ভাবছেন, নবীজির সবচেয়ে প্রিয়জন আমির হামযা (রা.)-কে আমি হত্যা করেছি। আমিই তো এখন নবীর সবচেয়ে বড় দুশমন। অথচ তিনি আমাকে এ পথে নেয়ার জন্য বারবার দূত পাঠাচ্ছেন। কিসের দায়বদ্ধতা তাঁর? এমন কি মহত্মতা আছে তাতে? নিশ্চয় এই অসামান্য আয়োজন ও মহান মহানুভবতায় বিরাট কিছু লুকায়িত আছে। আছে আলো ও অন্ধকারের প্রার্থক্য। আমি ওই সাহাবীর চোখে দেখেছি জল। দেখেছি দরদ ভরা ভালবাসা। মানুষ পথ না পেলে এমন কি ক্ষতি ওদের?
ওয়াহ্শী ভাবছেন, কেবলই ভাবছেন। ভাবতে ভাবতে দিগি¦দিগ হারিয়ে ফেলছেন। ভাবনার কিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি। ‘কি বললো ওই দূত’ বারবার তার কথাগুলো ঘুরে ফিরে আসছে তার মাথায়, ‘আল্লাহ বলে একজন আছেন একথা কি সত্যি? তা যদি না হবে তাহলে বদরের যুদ্ধে জয়ী হলো কেমন করে? এক হাজার সৈন্যের, বিপক্ষে মাত্র তিন শতের জন নিয়ে এই অসম লড়াই জিতে গেলেন তারা অনায়াসে। নিশ্চয়, এমন কোনো মহাপরাক্রান্ত অদৃশ্য শক্তি এদের পেছনে আছেন। সর্বদা সাহায্য সহযোগীতা করছেন। তেমনি করে ওহুদের লড়াইয়ে বিজয় এবং খন্দক বিজয় এসব কিসের আলামত? চাঁদ, সুরুজ, আকাশ-পাতাল, তারা নীহারিকা, নিসর্গ, নদী, সাগর, পাহাড়, তরুলতা, পশু-পাখি সবচে আশ্চর্য আমরা মানুষ! আমাদের বলিষ্ঠ দেহ, চোখ, কান, নাক, দৃষ্টিশক্তিসহ আরও কত কি। এগুলো অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন কে? অবশ্যই এসব কিছুরই সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন। যিনি আমাদের সকল কিছু রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। আর সত্যিই যদি তিনি সব কিছুর স্রষ্টা হয়ে থাকেন তাহলে আমি কি করলাম? আমার কর্মের মাধ্যমে আমি বিবেকহীনতার পরিচয় দিলাম। স্রষ্টাকে অস্বীকার করলাম; তার বন্ধুকে দুঃখ দিলাম, তাঁর প্রিয়জনকে হত্যা করলাম। এসব ভাবতে গিয়ে শিউরে উঠলো ওয়াহ্শী। তার ঘাড়ের পেছনের লোম দাঁড়িয়ে গেল সরসর করে। তার সর্বশরীর কেঁপে উঠলো। হৃদপি- উত্তাল হয়ে আছড়ে পড়ছে বুকের পাটাতনে। সর্বনাশ! একি করেছি আমি এত দিন? এতো বড় পাপ! মহান প্রভু কি মাফ করবেন আমাকে? মনে হয় না। উহু …কিন্তু … কিন্তু …তাহলে আমি কি বিশ্বাস করে ফেলেছি মহান স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে?
তিনি ভাবছেন আর ভাবছেন। ওই যে … দূত বললেন … ‘তওবা করো, ফিরে এসো, তওবাকারীর কোনো গুনাহই বাকি থাকে না। সে নিস্পাপ হয়ে যায়, মাসুম হয়ে যায়’। আচমকা … গভীর আবেগে চোখ ভুঁজে ফেললেন ওয়াহ্শী। বিড়বিড় করে কি যেন বলছেন। আর একটু পরেই ‘ক্ষমা করো … ক্ষমা করো …’ তাঁর চেপে রাখা চোখের পাতার তীর ভেঙ্গে বেরিয়ে আসছে অশ্রুধারা। তিনি বললেন, ‘হে পরম প্রভু …’ তাঁর গলা বসে গেল। ফিস্ফিস্ করে বলে উঠলেন, হে বিশ্ব জগতের স্রষ্টা। দয়া করো … দয়া করো … আমাকে পথ দেখাও … পথ দেখাও …। এসব বলেই চলছেন বিরামহীন। এক পর্যায়ে চুপ হলেন তিনি। উপলব্দি হলো তিনি জ্ঞান হারাচ্ছেন বুঝি। ভাঙ্গছে ভুল। আসছে চেতনা নতুনের-আলোর। জাগছেন, জ্ঞান হারাচ্ছেন ফের জাগছেন। মনে হচ্ছে চোখের সামনে আলো; আবছা আলো। কুয়াশার ভেতর থেকে অস্পষ্ট রহস্যময় ভেতরে আরো আলো। আলোর ভেতর আরও আলো। চোখ ঝলসে যায়। আস্তে আস্তে হৈচৈ হেঁটে হেঁটে চলে এলো তাঁর কাছে। হেসে উঠলো ভূবনজয়ী আলো। অন্তরে জ্বলে উঠলো আলো। সুবহানাল্লাহ! এবার সব কিছু দিনের মতো পরিষ্কার। স্পষ্ট ধরা পড়ছে-আলো আর আঁধারের প্রার্থক্য। সত্য আর মিথ্যা; সোজা-সরল; সহজ সাদা পথ। কে যেন হাত ধরে সোজা পথে দাঁড় করিয়ে দিলেন তাঁকে। বিড়বিড় করে কি যেন পড়লেন। বুঝতে পারলেন না নিজেই। বার বার পড়ছেন, কি যেন পড়ছেন। একসময় অবশ হয়ে পড়লেন তিনি। তাঁর বিবশ নেত্রকোণে জমে এলো তপ্তঅশ্রু। দিন যায় রাত যায় ওয়াহ্শী নিঝুম। একাকী একটা ঘরে সময় কাটায়। ভাবছেন শুধুই ভাবছেন; ভেবেই চলছেন।
একসময় সব স্মৃতি মনে তার। আবদুল মোত্তালিব, আবদুল্লাহ, আবু তালিব, মুহাম্মদ। তাঁর অমলিন মহান চরিত্র। সুদৃঢ় পদক্ষেপ, বলিষ্ঠ বক্তব্য, ত্যাগ তিতিক্ষা, চরমমূল্য, অনেক রক্ত ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব ভেবে ওয়াহ্শী অবাক। কখন যেন তিনি দাঁড়িয়ে গেছেন বসা থেকে। তাঁর মাথাটা একটু টলে উঠলো। একদিনে চোখের নিচে কালি দাগ পড়েছে তাঁর। শরীর দূর্বল হয়েছে, গাল বসে গেছে। কোণঠাসা বাঘের মতো তার অবস্থা। অনেকদিন ধরে গায়ে জড়িয়ে রেখেছেন একটা চাদর। সেটা আবার ভালভাবে জড়িয়ে নিলেন। আপনাআপনিই তার পা সামনে বাড়লো। পা’টা কোথায় ফেলছেন ঠাহর করতে পারছেন তিনি। মনে হচ্ছে শূন্যে ভাসছে। শরীরে যেন কোনো ওজন নেই; ভর নেই। নিজ ইচ্ছায় পা ফেলতে পারছেন না। কে যেন হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাকে। আর তিনি চলছেন তো চলছেন-ই। চলার যেনো কোনো শেষ নেই। অন্তহীন কোন ঠিকানায় এগিয়ে চলছেন। নাওয়া খাওয়া নেই, শোয়া নেই, সাথী নেই, একা একা পথ চলছেন। কি কাজে কেনো এ পথ চলা তাও মনে নেই। শুধুই এগিয়ে যাওয়া। সামনে পথ চলা। ঠিকই একদিন এসে পৌঁছলেন সেই শহর স্মৃতির নগরী-‘সুকুল লাইল’। সেই পরিচিত ‘রাত্রির বাজার’। সেই আগেকার চির পরিচিত রাস্তা-ঘাট সব কিছুই আজ অচেনা মনে হয়। আজ এখানে নেই আর কোনো প্রতিমা পূজারী। ধ্বক্ করে কেঁপে ওঠে ওয়াহ্শীর বুক। পরিচিত প্রতিমারা কেউ নেই, সবশেষ, সবই শেষ।
তিনি ভাবছেন, শেষ না হয়ে উপায় কি? শেষ হওয়াই ভাল। মিথ্যার ধ্বংস তো অনিবার্য। যা হয়েছে ভালই হয়েছে। তবুও পুরানো স্মৃতির মিথ্যা মায়ায় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। ওয়াহ্শীর অবস্থা এমন হয়েছে যেনো তাকে চেনাই ভার। পরিচিত জনের কেউ দেখলে হয়তো তাকে ভূত দেখার মতই চমকে উঠবে। সেই ওয়াহ্শীর আর নেই, নেই তার সেই দর্প। ভিখারীর ন্যায় ছুটে চলেছেন মানবতার মহাপুরুষ, জগতের আলো মুহাম্মদ (স.)-এর নিকটে। উদ্দেশ্য একটা আত্মসমর্পণের। পুণ্যের কাছে পাপের; তাওহিদের কাছে শিরকের; একাত্ববাদের কাছে অংশীবাদীর; আল্লাহর কাছে বান্দার; প্রভুর কাছে ক্রীতদাসের; মালিকের কাছে গোলামের; পরমাত্মার কাছে আত্মার সম্পূর্ণ উজার করে সপে দেওয়া। দ্রুত পায়ে ছুটে চলছেন ওয়াহ্শী। আলোকবর্তিকা নবীজির দিকে। কখনও দৃষ্টি বিভ্রম কখনও আবছা আবছা। সব কিছুই যেনো অচেনা ব্যতিক্রম লাগছে। বাড়ি-ঘর, পথ-ঘাট, সবই যেনো নতুনের সাজে সেজে আছে। মনে হচ্ছে এ শহরের মানুষগুলো অনেক উঁচু, আকাশের মতো। তবুও সামনে চলার পিপাসায় দ্রুত চলছেন তিনি। ভাবছেন আর ঘামছেন ওয়াহ্শী। কোন দিকে যাবেন ঠিক করতে পারছেন না কিছু। একবার এ গলি আরেকবার ও গুলিতে হেঁটে চলছেন। চারদিকে সাজ সাজ রব। সবার ভেতর এক প্রশান্তির ঢেউ খেলছে যেনো। আলোকিত বদন নিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে আছে কেউ হাঁটছে। পরিচিত জনদের কেউ দেখছেনা তো? কেউ চিনে ফেলেনি তো? চেনার তো কথা নয়, মুখ তো চাদর দিয়ে ঢাকা। কিন্তু কে যেন একজন তাঁর দিকে চেয়েছিল অনেকক্ষণ। অপলক দৃষ্টিতে ওয়াহ্শীর বুক ধ্বক্ করে উঠেছিল। কিন্তু না চিনতে পারেনি। পাশ কেটে চলে গেল দ্রুত।
ওয়াহ্শী ভাবছেন, আমার নামে হুলিয়া আছে। আছে মৃত্যু পরোয়ানা। আমি নিরাপদ না মোটেও। যে কোনো সময় ঘটে যেতে পারে বিপদ। কিন্তু সে ঝুঁকি মাথায় নিয়েই তিনি এসেছেন এখানে। উদ্দেশ্য একমাত্র সত্যের কাছে, আলোর কাছে, আত্মসমর্পণ করা। দ্রুত চলছেন তিনি সামনের দিকে। যেমন করে হোক দেখা করতে হবে হযরত মুহাম্মদ (স.) এর সাথে। তার ভাবনার বলয়ে কাজ করছিল গত বেশ কিছুদিন হযরত মুহাম্মদ (স.) সত্যি-সত্যিই নবী। ব্যস আর কোনো দ্বিধা নেই মনে। নেই কোনো মনের সাথে বোঝাপড়া। আলো এসেছে মনের ভেতরে। সে আলোই দেখিয়েছে সত্য ও সুন্দরের পথ। প্রাণের বিনিময়ে হলেও নবীজির সাথে দেখা করতে হবে। পড়তে হবে সেই পবিত্র কালিমা। কিন্তু … মসজিদে নববী আর কত দূর? যদি এই পথ শেষ না হয় তাহলে সেই অমীয় সুধা থেকে কি বঞ্চিত হবো? ওয়াহ্শীর গায়ে কাঁটা দিল, শিউরে উঠলো সমস্ত শরীর। দ্রুত এগিয়ে চলছেন তিনি সামনের দিকে। যেমন করেই হোক তাকে পৌঁছতে হবে নবীজির কাছে। মনে মনে ওয়াহ্শী দোয়া পড়ছেন, হে আল্লাহ, ‘হে পরম প্রভু, হে বিশ্বভুবনের স্রষ্টা, আমাকে ক্ষমা করো, আমাকে রক্ষা করো। ইসলাম ধর্মে না আসা পর্যন্ত আমাকে মুহাম্মদ (স.)’র কোনো সাথী যেন না দেখতে পায়। আমি মুসলমান না হয়ে মরতে চাই না। হে আল্লাহ, আমাকে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে দাও। একটু সুযোগ দাও … একটু সময় দাও …’। হঠাৎ মনে হলো তিনি বাইতুল্লাহ পৌঁছে গেছেন। কে পৌঁছে দিল তাকে এখানে, দূর্গম কন্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে কি করে তিনি এখানে এলেন! ওয়াহ্শীর দু’চোখ দিয়ে ঝরলো দু’ফোঁটা অশ্রু। মিশে গেল মসজিদের কাঁকর ভরা মেঝেয়। চোখ মুছলেন, এদিক ওদিক তাকালেন, দেখলেন ওইতো …! ওই তো তিনি…!!
পাথরের ন্যায় জমে গেলেন ওয়াহ্শী। মনে হলো পা’ জোড়া পেরেক দিয়ে কে যোনো গেঁথে দিয়েছে মেঝোয়। বুকের পাটাতনে আছড়ে পড়ছে উম্মাদের মতো হৃদপি-। তার আসার শব্দ পৌঁছে গেল মানবতার মহান শ্রেষ্ঠ মানুষ নবীজির কাছে। তিনি চোখ তুলে তাকালেন। কি অপরূপ সৌন্দর্য, বিশাল আঁখি, মায়াভরা বদন, মায়াময় চাহনি, অশ্রুতে ভেজা দু’চোখ। অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন ওয়াহ্শীর দিকে। ওয়াহ্শী মনের অজান্তেই চাদরের কোন টেনে মুখটাকে বেশি করে টেনে নিলেন। ভয় অনুকম্পায় তার হৃদপি- দেহ খাছা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তাঁর পা যেনো অচল, বিবশ সামনে এগুনোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। স্বপ্নের রাজ্যে ঘন ঘোরতায় যেন তার এ চলা। জোর করে পা ঠেলে নিয়ে এগিয়ে গেলেন দু’ কদম। ঝট করে তাঁর সামনে বসে পড়লেন। নবীজি (স.) চোখ মেলে তাকালেন, অবাক দৃষ্টিতে। চিনতে পারছেন না মানুষটাকে। চাঁদরের দেয়াল ফুঁড়ে শব্দ উঠলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ …’। ‘কে?! কে তুমি?’ হুজুর অবাক কন্ঠে শুধালেন। হু-হু করে কেঁদে দিলেন ওয়াহ্শী (রা.)। খানিক পর মুখের চাদর না সরিয়েই বললেন,‘ হুজুর, আমি’। হুজুর (স.) তাঁর কোনও সাহাবী মনে করে ফের ধ্যানের জগতে চলে গেলেন। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় খুলে গেল ওয়াহ্শীর মুখের চাদর। চোখ খুললেন, নবীজি (স.)। চেয়ে রইলেন অপলক দৃষ্টিতে ঝাড়া তিরিশ সেকেন্ড। তাঁর বিস্ময় বাড়লো। ‘তুমি?!’
‘আসহাদুল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ’উচ্চকিত স্বরে, বারে বারে পড়েই চলেছেন ওয়াহ্শী (রা.)। তার চোখ বেয়ে দরদর পানি নামছে। বোবা দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন বিশ্ব নবী (স.)। পলকহীন চাওয়ায় কি যেন বিরাজ করছে কেউ জানে না। চারদিক থেকে চলে এসেছেন সাহাবী (রা.) আজমাঈন। হাতে খাপ খোলা তলোয়ার। অপেক্ষা শুধু মাত্র হুজুরের ইশারা। সঙ্গে সঙ্গে গর্দান উড়ে যাবে ওয়াহ্শীর। কিন্তু না … নবীজির তরফ থেকে তেমন কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। তিনি বললেন, ‘সাথীরা সাবধান! ওয়াহ্শীকে কেউ ছুঁতে পারবে না। সে কালিমা পড়ে নিয়েছে। সে উচ্চারণ করেছে পবিত্র কথাগুলো। সাহাবীরা থমকে গেলেন, হলেন অবাক! ধীরে ধীরে খোলা তলোয়ার ঢুকে গেল খাপে। বসে পড়লেন চারদিক ঘিরে। চোখের সামনে ভেসে উঠলো বদরের সেই অবর্ণনীয় দৃশ্য। তাদের চোখ থেকে নির্গত হলো ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু। যেনো কবরের নিরবতা নেমেছে আজ এখানে। ওয়াহ্শীর মাথা নিচু। সাহাবীরাও মাথা নিচু করে হুজুরের মুখে কিছু শুনতে উদগ্রীব। হুজুরে পাক (স.)’র চোখে পানি। সবার চোখে অশ্রুঝর্ণা, মনে ব্যথার ঢেউ আছড়ে পড়ছে মনোতীরে।
কিছু সময় পেরিয়ে গেল। মনের দুয়ারে পুরানো সেই দিনের স্মৃতি ভীড় করেই চলছে। কিছুতেই দূর করতে পারছেনা বেদনাবিধূর বিভীষিকাময় হত্যাকা-ের কথা। এমন সময় হযরত মুহাম্মদ (স.) বললেন, ‘শোনো সাথীরা! ওয়াহ্শী কালিমা পড়ে নিয়েছে। একজন অবিশ্বাসী বিশ্বাস এনেছে। কেটে গেছে অবিশ্বাসের আঁধার। এক হাজার অবিশ্বাসীকে হত্যা করার চেয়ে একজনের বিশ্বাসী হওয়া অনেক ভাল। তিনি মহান ধৈর্য’র পরিচয় দিতে চাচার সেই রক্তভেজা শরীর, চিবিয়ে খাওয়া কলিজা, ছিন্নভিন্ন লাশ তার হৃদয়কে করেছিল বিদীর্ণ তা সংবরণ করলেন। তা প্রকাশ হতে দিলেন না। এজন্যে যে, একটি মানুষ অবিশ্বাসের নিঃসীম আঁধার থেকে বেরিয়ে বিশ্বাসের পৃথিবীতে আলোর দুনিয়ায় ঢুকে পড়েছে। এসেছে সত্যের ঠিকানায়। কাজেই ব্যক্তিগত সব দুঃখ ব্যথার এখন কোনো সুযোগ নেই। একজন মানুষ ইসলামে বিশ্বাসী হওয়া মানে তার জীবনে পরম আনন্দ আলোকময় পথের দিশা পাওয়া। ওয়াহ্শীর এই বার্তাটিও খুশী ও আনন্দের। সব বেদনার খড়কুটো যেন নিমিষেই বন্যায় ভেসে গেল। হুজুরে পাক (স.) এই সময় সব ভুলে গেলেন। এবং ওয়াহ্শীকে কিভাবে নিরাপত্তা দেওয়া যায় তা নিয়ে চঞ্চল হলেন। তাঁর চোখের পাতা ধীরে ধীরে খুললো। অশ্রুসিক্ত নয়ন। কিছুক্ষণ বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। মহাশক্তিধর অলৌকিক আঙ্গুল তুললেন। সে আঙ্গুল খানিকটা এগিয়ে গেল ওয়াহ্শীর দিকে। আরও উপরে উঠলো। ঠিক ওয়াহ্শীর চেহারার দিকে। স্থির হলো আঙ্গুল। কেঁপে উঠলো ঠোঁট। ‘তুমি ওয়াহ্শী!’ প্রায় শোনা যায় না এমন কন্ঠস্বর। কান্নার দমক চেপে রাখার কারণে বুঁজে এলো। কিন্তু সাহাবা (রা.) আজমাঈনের কাছে মনে হলো বিস্ফোরণ হলো ঘরে। কেঁপে উঠলো অন্তরাত্মা ওয়াহ্শীর। তিনি বললেন, ‘জ্বি হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ওয়াহ্শী। সত্যিই!’ ‘তুমি-তুমি আমার চাচাকে হত্যা করেছিলে?’ ‘কিভাবে?’ জবাব না শুনেই ফের বললেন রাসুল (স.), ‘আমাকে শোনাও সে কাহিনী’।
ওয়াহ্শী অনেকক্ষণ চুপ থেকে শুরু করলেন সেই লোমহর্ষক ঘটনার কাহিনী। ‘যুদ্ধ চলছিল, তুমুল যুদ্ধ। আমি অপেক্ষায় ছিলাম। দুশমন ঘায়েল করার জন্য সতর্ক আছি। এমন সময় দেখি মহাবীর হামজা (রা.) কে। তিনি বীর বিক্রমে যুদ্ধ করছিলেন। এমন লড়াকু সাহসী মানুষ আমি আর দেখিনি। দু’হাতে শত্রু শেষ করছেন। বিদ্যুৎগতিতে সামনে এগিয়ে চলছেন। প্রচ- হিংসায় আমি জ্বলে উঠলাম। সুযোগের অপেক্ষায় রইলাম। হামলা করার জন্য প্রস্তুত। হামজা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যেখানটায় যুদ্ধ করছিলেন তার এক পাশে একটা টিলার আড়ালে লুকিয়ে থাকলাম। অপেক্ষায় আছি, কখন হামলা করার সুযোগ পাবো। এমন সময় তার পেছনে দিকটা অরক্ষিত হয়ে পড়লো। তৎক্ষণাৎ আমি বর্শা চালালাম। তিনি একপাক ঘুরে পড়ে গেলেন। তাকে হত্যা করতে পারলে আমার মালিক আমাকে মুক্তি দেবে। এই লোভ আমাকে পীড়া দিচ্ছিল। আমি তার লাশের দিকে এগিয়ে গেলাম, আমার সহযোদ্ধাদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। হে রাসূল তারপর আর আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় …’। ওয়াহ্শীর গলার স্বর বুঁজে এলো।
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরবে কাঁদছেন। কপোল বেয়ে পড়ছে অশ্রুজল। ওয়াহ্শী ও কাঁদছেন, কাঁদছেন সব সাহাবাই কেরাম। খানিকবাদে, হুজুরে পাক (স.) বললেন, ‘শোনো ওয়াহ্শী, যা কিছু তুমি করেছ তাতে মহান রাব্বুল আলামিন ও তাঁর রাসূল নারাজ হয়েছেন। এখন থেকে তাদের খুশী করার চেষ্টা করো। বুঝতে পারছি, অনুতাপের আগুনে পুড়ে খাঁটি সোনা হয়েছো। তবুও তোমার কাছে আমার অনুরোধ, তুমি কখনও আমার সামনে বসবে না। তাহলে আমার চাচার কথা মনে পড়বে। আমি কষ্ট পাবো, ভীষণ কষ্ট। তা নিশ্চয়ই তুমি চাও না’। ওয়াহ্শী চুপ যেনো বোবা হয়ে গেছেন। চোখের পানি ঝরছে অঝর ধারে। হায়! এভাবেই এসেছে দ্বীন। শান্তির ধর্ম ইসলাম। যার সুশীতল পতাকা তলে সমবেত হয়ে মানুষ পেয়েছে আলোর দিশা।  আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) বুকের ব্যথা বুকে চাপা দিয়েছেন। তাঁর হাজার দীর্ঘশ্বাস, হাজার রাত্রি জাগরণ আর হাজার রক্তের সাগর-নদী পেরিয়ে এক একটি মানুষ পেয়েছে হেদায়াত। পেয়েছে সঠিক পথের দিক-নির্দেশনা। একজন মানুষের জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করলেন নবীজি। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন বিরল ঘটনা আর একটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। যে মানুষটি ছিল তার চাচা, দুধ ভাই, দ্বীনি ভাই তাকে হত্যা করেছিল ওয়াহ্শী। অথচ তাকেও ক্ষমা করলেন তিনি।
এই হামজা (রা.)’র জন্য প্রিয় নবী সত্তরবার জানাজার নামাজ পেড়েছেন। নিজ হাতে খাটিয়া নিয়ে কবরে গেছেন। কেঁদেছেন আর বলেছেন, ‘আমার চাচার জন্যে কেউ কাঁদার নেই। আবশোস!’ তখন আবু ওবায়াদা (রা.) বললেন, ‘আমরাও কাঁদছি হুজুর! আপনার ব্যথায় আমরাও ব্যথিত’। তার কথায় হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুশী হলেন। শিশুর মতো উৎফুল্ল হলেন। তিনি বললেন, ‘আবু ওবাইদা, আল্লাহ পাক তোমার ঘরকে আবাদ রাখুক। শান্তি দিক’। তারপর … তারপরও চাচার হত্যাকারী হেদায়াত পাক বেহেশত পাক। ইসলামের এই কালজয়ী ইতিহাস স্বাক্ষী, ইসলাম যা শিক্ষা দেয় তা বরাবরই শান্তির-সমৃদ্ধির, ক্ষমার এবং সত্য-সুন্দরের। আর আমরা ইসলাম সম্পর্কে জেনে না জেনে মন্তব্য করি। তথাকথিত প-িতরা বা শিক্ষিতরা ইসলাম ও মানবতার নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) সম্পর্কে এবং ইসলামকে সন্ত্রাসবাদ আখ্যা দেয় এবং প্রিয় নবী সম্পর্কে মন্তব্য করে। আল্লাহ্ আমাদের সকলকে হেদায়াত দান করুক। সঠিক পথে চলার তৌফিক দান করুক। পৃথিবীর সমস্ত মানুষ পাক আলোর দিশা। আমিন।

 
লেখকঃ কবি, কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক
গেীরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।
তারিখ: ০৫.০২.২০১৪

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply