কুমিল্লার চান্দিনার গণকবর গুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই

মাসুমুর রহমান মাসুদ,চান্দিনা(কুমিল্লা):–
চান্দিনা উপজেলার বিভিন্নস্থানে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন গণকবরগুলো স্বাধীনতার ৪২ বছর পরেও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই। এ উপজেলায় বেশ কয়েকটি গণ-কবর রয়েছে। এসবস্থানে রাজাকারদের সহায়তায় নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে নিরপরাধ মানুষকে। কালানুক্রমে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে, বিভিন্নস্থানে স্মৃতি স্তম্ভ করে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নির্বিচারে হত্যার পর যাদেরকে গণ-কবরে স্তুপাকারে দাফন করা হয়েছে তাদের স্মৃতি রক্ষায় চান্দিনায় আজও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। চান্দিনার কাশিমপুর, কংগাইসহ বিভিন্ন এলাকায় এরূপ গণ-কবর রয়েছে। অন্তত একটি গণ-কবর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার দাবি চান্দিনার জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের, তথা সর্বস্তরের মুক্তিপ্রেমী মানুষের।

মুক্তিযুদ্ধের ৪২ বছর অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার কাশিমপুর গ্রামের পেইরারপাড় নামকস্থানে যুদ্ধস্মৃতি বিজড়িত দুটি গণ-কবর সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ওই দুটি কবরে ৮ ব্যক্তির মরদেহ রয়েছে। এরা হলো কাশিমপুর পশ্চিমপাড়া’র মৃত গুরু চরণ সরকার এর ছেলে চিত্ত রঞ্জন সরকার, মৃত কৃষ্ণ দাসের ছেলে অমূল্য দাস, মাধাইয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষক জগবন্ধু সরকার এবং তার ছেলে সুধীর চন্দ্র সরকার, মৃত শসি চন্দ্র সরকার এর ছেলে চেতন চন্দ্র সরকার, রামকৃষ্ণ সরকার এর ছেলে  যোগেশ চন্দ্র সরকার, মৃত দ্বীনবন্ধু সরকার এর ছেলে শিশু চন্দ্র সরকার এবং রোহিনী শীল এর ছেলে কালু চন্দ্র শীল। এলাকার অনেকেই জানেনা এখানে দুটি গণ-কবর আছে। সরকারি খাস ভূমিতে ওই দুটি কবর থাকলেও খাস ভূমিগুলো দীর্ঘ বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্দোবস্ত নিয়ে দখল করে রেখেছে স্থানীয়রা। গণ-কবর গুলো এখন নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে। অপরদিকে স্বজন হারাদের খোঁজ-খবর নেয়নি কেউ। এলাকাবাসী ওই দুটি গণ-কবরের স্থানে স্মৃতি স্তম্ভ করে তাদের নাম লেখার দাবি জানিয়েছেন।

জানাযায়, এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর কাশিমপুর গ্রামের গনি মিয়ার ছেলে সিরাজ মিয়া, জিন্নত আলীর ছেলে দুধ মিয়া এবং লাল মিয়ার আবেদনের প্রেক্ষিতে গণ-কবর দুটির স্থানসহ ২১ শতাংশ ভূমি ৯৯ বছরের জন্য বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। ওই গণ-কবর দুটি এখন গো-চরণের জায়গায় পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এক রাতে পাশ্ববর্তী জোড়পুকুরিয়া গ্রামের রাজাকার আঃ রহিম এর নেতৃত্বে দেড়শতাধিক পাকিস্তানি সৈন্যের একটি বাহিনী কাশিমপুর পশ্চিম পাড়ায় হামলা চালায়। ওই গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন বেশি। গভীর রাত পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে সশস্ত্র পাকহানাদাররা গ্রামের মাতব্বর মাধাইয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষক জগবন্ধু সরকার এবং তার ছেলে সুধীর চন্দ্র সরকারসহ প্রায় ২৫-৩০ ব্যক্তিকে আটক করে পাশ্ববর্তী একটি খালের কাছে নিয়ে আসে । ভোর ৬টার দিকে ৮ হিন্দু ব্যক্তিকে বর্বরোচিত নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করা হয়। এসময় আটককৃত মুসলিম ব্যক্তিদেরকে ছেড়েদেয় পাকবাহিনী।

জানাযায়, ওই রাতে গ্রামের যুবতী হিন্দু মেয়ে ও নতুন বৌ দের অনেকেই সম্ভ্রম হারায়। ওই রাতে গ্রামের ৮০টিরও বেশি ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দেয় পাকবাহিনী। হানাদার বাহিনী চলে যাওয়ার পর আগুন নিভাতে ব্যস্ত হয়েপড়ে এলাকাবাসী। আবার অনেকেই পালিয়ে যায়। ওই বিভীষিকাময় অবস্থায় এলাকাবাসী নিহতদের ২টি কবর খুড়ে পুঁতে ফেলে।

নিহত জগবন্ধু মাষ্টারের ভাই রাখাল চন্দ্র সরকার এর সাথে কথা বলে জানাগছে, বাংলা ১৯ আষাঢ়, শনিবার ভোরে ওই ঘটনা ঘটে। কবর গুলো সংরক্ষণ করেননি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওই সময় নিজের জীবনের চিন্তা করে আমরা বিভিন্নস্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। দেশ স্বাধীন হলে ওই ঘটনার প্রায় ১১ মাস পরে আমরা লাশগুলো তুলে ধর্মীয় নিয়মানুযায়ী পোড়ানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ততদিনে লাশগুলো গলে গিয়েছিল। ফলে কবরগুলো গণ-কবরই রয়েগেছে। নিহত যোগেশ চন্দ্র সরকার এর স্ত্রী প্রিয় বালা সরকার স্বামী হারিয়ে এখন অসহায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪২ বছর পূর্ণ হলেও কেউ তাদের শান্তনা দিতেও আসেনি।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে চান্দিনার কংগাই গ্রামে আরও ৭ জন নিরপরাধ মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে পাক হানাদার বাহিনী। পরে তাদেরকে গণকবর দেওয়া হয়।

জানাযায়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে চান্দিনার উপজেলার কংগাই গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান করছিলেন, খবর পেয়ে পাক বাহিনীর শতাধিক সৈন্য কংগাই গ্রামে প্রবেশ করে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা এ পাক বাহিনীকে মোকাবেলা করার মতো প্রস্তুতি না থাকায় মুক্তিযোদ্ধরা পিছু হটে যায়। এ সুযোগে পাক বাহিনীরা দ্রুতগতিতে  গ্রামে প্রবেশ করে নিরস্ত্র লোকদের হত্যা করে।

পরে কংগাই গ্রামে ৭ জনের লাশ পড়ে থাকতে দেখে এলাকাবাসী ৭ শহীদের লাশ একই স্থানে গণ কবর দেয়। গণ হত্যার শিকার সেই ৭ শহীদরা  হলেন, আবব্দুস সামাদ, ধনু মিয়া, বজলুর রহমান,  মুসলেহ উদ্দিন, আবিদ আলী, আয়েত আলী, আফসর আলী। অথচ মুক্তিযোদ্ধের ৪২ বছর পরও  মুক্তিযোদ্ধের চান্দিনার সেই গণকবরটি এখনো বাঁশ ঝাড়। স্মৃতি রক্ষায় কোন উদ্যোগ নেই কারো। শহীদদের স্মরণে ওই স্থানে এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোন স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে উঠেনি।

এখনও গণকবরটি অবহেলায় পড়ে আছে। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে নানা ক্ষোভ। গণকবরটি সংরক্ষণ ও এখানে একটি স্মৃতি ফলক নির্মাণের দাবী জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply