[ বিজয়ের বাঁশি ] মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ আজো পাইনি

এম আহসান হাবীব :–
আর ক’দিন পরই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। মাগুরার শ্রীপুর কলেজ থেকে পরীক্ষা দেবে এক তরুণ। কিন্তু তাঁর কাছে পরীক্ষার চেয়েও অধিক জরুরি মাকে বাঁচানো; মাকে শত্রুর হাত থেকে উদ্ধার করা। তাই পরীক্ষার পাঠ বন্ধ করে মাকে বাঁচাতে অস্ত্র হাতে তুলে নিল সেই তরুণ। সেই মা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। আর সেই শত্রু হানাদার পাক বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশাম্স। একাত্তরের সেই স্বপ্নবাজ তরুণ যার কাছে এই দেশ ঠিক মায়েরই মতো, তিনি কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ট্রেজারার বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর কুন্ডু গোপীদাস। মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কুমিল্লাওয়েবের সাথে কথা বলতে গিয়ে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও সামপ্রদায়িকতামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছি, মুক্তিযুদ্ধের সে কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ আমরা আজো পাই নি। সাক্ষাতকারের মূল কথাগুলো তার ভাষায় তুলে ধরা হলো:
কেন মুক্তিযুদ্ধ:
১৯৪৭ সালে পাক-ভারত ব্রিটিশমুক্ত হয়ে সামপ্রদায়িকতার ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা সকল দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনসাধারণকে অধিকারবঞ্চিত করতে থাকে। ভাষাকে কেন্দ্র করে এ অধিকারবঞ্চিত মানুষগুলো ধীরে  ধীরে ফুঁসে ওঠতে থাকে। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মাতৃভাষার বিজয়ও ছিনিয়ে আনে তারা। কিন্তু অত্যাচার-নিপীড়ন বাড়তে থাকে বহুমাত্রায়। সোহরাওয়ার্দীর তৈরি করা ছাত্রনেতা মুজিব ছাত্রলীগকে নিয়ে নিপীড়ন থেকে মুক্তির মূল প্রচেষ্টা শুরু করেন। মুক্তিকামী আপামর জনতা ৭০-এর নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী করে আওয়ামীলীগকে। কিন্তু ক্ষমতালিপ্সু পাকিস্তানিরা ক্ষমতা হস্তান্তর না করে শুরু করে নানা টাল-বাহানা। গ্রেপ্তার হন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু, নির্বিচারে হত্যা করা হয় নিরীহ বাঙালিদের। এমতাবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া বাংলার আপামর জনতার আর কোন বিকল্প থাকে না। ৩০ লাখ জীবন আর ২ লাখ সম্ভ্রমসহ অগুণতি ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পাই লাল-সবুজের স্বাধীন পতাকা।
যুদ্ধের প্রেরণা:
আমাদের শ্রীপুরে শাহজাহান নামে পুলিশের এক হাবিলদার ছিলেন। ১৬/১৭ মার্চের দিক থেকে তিনি এলাকায় ছাত্র-যুবকদের সংগঠিত করা শুরু করেন। পাকিস্তানিদের অত্যাচার-অনাচারের কথা শুনিয়ে তিনি আমাদের উদ্বুদ্ধ করতেন।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ:
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণের অন্যতম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ প্রত্যক্ষভাবে শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সেদিন বাবার সঙ্গে এসে ‘দেহমনে জোয়ার তুলে দেওয়া’ এ ভাষণ শুনেছিলাম।
৮ নং সেক্টর:
মুক্তিযুদ্ধে ৮ নং সেক্টরের অধীনে যুদ্ধ করেছিলাম আমি। প্রথম সেক্টর কমান্ডার ছিলেন বর্তমান চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী। পরবর্তীতে সেক্টর কমান্ডার হন মেজর মঞ্জুর (পরবর্তীতে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের জিওসি)। জিয়া হত্যায় জড়িত সন্দেহে তাকে একদিন কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
আকবর বাহিনী ও শ্রীপুর বাহিনী:
হাবিলদার শাহজাহানের সাথে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আকবর কাকা (যিনি বিমান বাহিনীর চাকরি ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধের অনেক আগেই এলাকার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন), ইপিআর-এর আনোয়ার ভাইসহ বিভিন্ন বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য একসাথে হয়ে গঠণ করেন আকবর বাহিনী। পরবর্তীতে প্রায় ১ হাজার সদস্য নিয়ে তা শ্রীপুর বাহিনীতে পরিণত হয়। ক্যাপ্টেন (পরে মেজর জেনারেল হন) শিকদার আব্দুল ওহাব গ্রামে এসে আমাদের সাথে যোগ দেন এবং পরে ডেপুটি সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন।
যুদ্ধের প্রশিক্ষণ:
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে হাবিলদার শাহজাহানের নেতৃত্বে লাঠি চালনা, ক্রলিং, থ্রিনটথ্রি রাইফেল চালানোর প্রশিক্ষণ নেই। শ্রীপুর স্কুলের সামনে প্রায় ১০০ জন প্রশিক্ষণে অংশ নিত। পরবর্তীতে আকবর বাহিনী গঠণের পর থেকে স্থানীয় ট্রেনিং ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে নদীয়ার রানাঘাটে অধিকতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো আমাদের।
যুদ্ধের বিভীষিকা:
পুরো দেশটাই একাত্তরে হয়ে ওঠেছিল বিভীষিকাময়। হাজার হাজার উদ্বাস্তু মানুষ যখন প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে পিঁপড়ের মতো ইন্ডিয়ার বর্ডারের দিকে ছুটছিল তখন মানুষের কষ্ট ও আতঙ্ক পৃথিবীর কোন ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এছাড়া পাক হানাদার ও তাঁদের এদেশীয় দোসরদের জ্বালাও-পোড়াও, ভাংচুর, লুটপাট, হত্যা-ধর্ষণের কথা এক কথায় অবর্ণনীয়।
সম্মুখযুদ্ধ:
মূলত আমাদের আকবর বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল আমাদের এলাকায় হানাদারদের অনুপ্রবেশ ঠেকানো। যখনই আমরা খবর পেতাম তারা ঐ পথ দিয়ে আসবে, তখনই আমরা সেখানে প্রতিরোধ গড়ে তুলতাম।  ৩০ সেপ্টেম্বরে মাগুরা থানার গাংনালিয়ায়, অক্টোবরের ২৫/২৬ তারিখে শ্রীপুর থানার গয়েশপুরে এবং নভেম্বরের শেষ দিকে মোহাম্মদপুর থানার বিনোদপুরে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেই। ইটের ভাটা, নদীর পাড়ে পজিশন নিয়ে আমরা আক্রমণ করতাম। গাংনালিয়ার যুদ্ধে আমরা ২৩ জন পাকসেনাকে হত্যা করতে সক্ষম হই। বিনোদপুরের যুদ্ধে শহীদ হয় আমার বন্ধু সাইফুল আলম মুকুল।
রাজাকার-আলবদর-আলশাম্স:
রাজাকার-আলবদর-আলশাম্সরা ছিল সাধারণত দুই প্রকৃতির। একটা অংশ ছিল যারা মুক্তিবাহিনীর খবরাখবর পাকবাহিনীর কাছে পৌঁছে দিত। আরেকটা অংশ সশস্ত্রভাবে দস্যুতা-গুন্ডামি করত, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতন চালাত। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ বাঙালিদের হত্যা পর্যন্ত করত। এছাড়া আমাদের মা-বোনদের পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিত। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা অনেক রাজাকারকে ধরে এনে শাস্তি দিয়েছি। আবার কয়েকজন রাজাকারকে যুদ্ধের পর সাধারণ মানুষ গণপিটুনিতে হত্যা করেছে।
রাজাকারদের বিচার:
রাজাকারদের বিচার শুধু আমার নয়, বাংলাদেশের সকল মুক্তিযোদ্ধার দাবি, শহীদদের আত্মার দাবি। তবে বিচারের ক্ষেত্রে তাদেরকে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের সকল সুযোগ দিতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে। এখন পর্যন্ত যাদের বিচার হয়েছে বা হচ্ছে নিঃসন্দেহে তারা কোন না কোন মাত্রায় যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্ত।
মুক্তিযোদ্ধাদের রাজনৈতিক বিভাজন:
প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধাই দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন -এটা প্রশ্নাতীত। কিন্তু আজ তাদের রাজনৈতিক বিভাজন খুবই কষ্ট দেয়। স্বার্থের কারণেই তাদের এই বিভাজন। খুবই দুঃখজনক, বঙ্গবন্ধুর হত্যার সাথেও কিছু মুক্তিযোদ্ধা যুক্ত ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা:
শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী সবাই যে যেখানে আছি সেখান থেকে দেশ গঠণের জন্য কাজ করাই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নে সবাই মিলে আগামী প্রজন্মকে সৎ, দেশপ্রেমিক ও ধর্মীয় নৈতিকতাবোধে উজ্জীবিত করে গড়ে তুলতে হবে।
আক্ষেপ:
যে সুখী-সমৃদ্ধ; ক্ষুধা-দারিদ্র্য ও সামপ্রদায়িকতামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছি, মুক্তিযুদ্ধের সে কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ আমরা আজো পাই নি। আজ মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা। চলমান রাজনীতিতে দলীয় সংকীর্ণতায় নিমজ্জিত সবাই। সরকার-বিরোধীদল কেউই সাধারণ মানুষের কথা ভাবে না। দলাদলি, হানাহানি, হরতাল-অবরোধে সাধারণ মানুষ আজ নিস্পেষিত। এমন বাংলাদেশের জন্য আমরা যুদ্ধ করি নি।
ভীষণ আশাবাদী:
কখনোই হতাশাবাদীদের দলে নই আমি। বাংলার মাটিতে রাজাকারদের বিচার হবেই। ২০১২ না হোক, ২৫/৩০ সাল নাগাদ সচেতন দেশপ্রেমিক, যোগ্য নেতৃত্ব আমরা পাবোই। নবীন প্রজন্মের ওপর আমার অগাধ আস্থা। হাজার বছর স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে হয়ে টিকে থাকবে আমার প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।
এক কথায় মুক্তিযুদ্ধ:
মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার, আমার গর্ব; আমার মা এই দেশকে তৈরি করেছে মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ অবশ্যই গড়ে ওঠবে।

Check Also

করোনাযুদ্ধে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিমকে বুড়িচংয়ে সমাহিত

বুড়িচং প্রতিনিধিঃ করোনাযুদ্ধে পুলিশে প্রথম জীবন উৎসর্গকারী কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে (৩৯) কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়েছে। ...

Leave a Reply