জাতি আর অপরাজনীতির অনলে পুড়তে চায় না চায় দুই নেত্রীর অবসর গ্রহণ

—–মো. আলী আশরাফ খান
রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি যে এখন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপরেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর আজ কেনো যেনো মনে হলো, জাতির এই দু:সময়ে দেশের অপরাজনীতি নিয়ে দু’চার কলম না লিখলে বিবেকের কাছে দায় থাকতে হবে মৃত্যুর আগ অবধি। সোজাকথা হলো, মানুষ এখন অল্প সময়ে অল্প কথায় অনেক কিছু জানতে চায়-জানাতেও চায়। ঘুরিয়েফিরিয়ে জানার চেয়ে-জানানোর চেয়ে স্পষ্ট ভাষায় জানতে চান এবং জানাতেও চান এমন ধরনের মানুষকেই এখন পছন্দও করেন সাধারণ মানুষ। আর এই শ্রেণীর মানুষকেই আমজনতা গ্রহন করবে এবং যোগ্য নেতৃত্ব দেয়ার জন্য বেছে নেবে এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে আমাদের তরুণ প্রজন্ম এ বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে-করছে বলে আমি মনে করি। যে কারণে আমার এ ‘জাতি আর অপরাজনীতির অনলে পুড়তে চায় না॥ চায় দুই নেত্রীর অবসর গ্রহণ।’ শীর্ষক লেখাটি স্বল্প পরিসরেই শেষ করবো এখানে।
আমরা যদি বর্তমান সরকারের শাসনামলের গেল পাঁচ বছর এবং ‘চারদলীয় জোট তথা বিগত সরকারের আমল এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার অর্থাৎ অনির্বাচিত সরকারের দীর্ঘ পথ পরিক্রমা নিয়ে কথা বলতে যাই তাহলে বলতে হবে, এই দীর্ঘ সময়ে অন্যান্য সরকারের চেয়েও মহাজোট অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকার চরম ব্যর্থতারই পরিচয় দিয়েছে। যা এখন দেশের সিংহভাগ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে শোনা যাচ্ছে। দেশের মানুষ নিশ্চয়ই দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর ভালো কিছু আশা করেছিল। আর এমনটা আশা করা কোন অমূলকও ছিল না। কিন্তু দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ যে আশা-আকাঙক্ষা নিয়ে মহাজোটকে ভোট দিয়েছিল, সেটি যে চরম ভুল হয়েছিল তা আজ প্রমাণিত হয়েছে-এটা আর বলার কোন অপেক্ষা রাখে না।
এখন দেশের সর্বত্র সাধারণ মানুষকে বলতে শোনা যাচ্ছে, এ সরকার নিজেদের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে এমন কোন জঘন্য কর্মকা- নেই যে যা করছে না। এতটাই তারা মরিয়া হয়ে উঠছে দেশের যানপরনাই ক্ষতি সাধন করেও ক্ষমতা তাদের চাই-চাই। শুধু তাই নয়, মানুষ এখন বলাবলি করছে, মহাজোট-বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনার সর্বক্ষেত্রে যে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এটা জাতিকে বহুগুনে পিছনে ঠেলে দিয়েছে এবং তাদের নানান ব্যর্থতা ধামাচাপা দেয়ার জন্য একেরপর এক নাটকের জন্ম দিয়ে হাসির পাত্রে পরিণত করেছে। মহাজোট যে অঙ্গিকারের মধ্যদিয়ে ওইসময় জনগণের মহামূল্যবান ভোট গ্রহণ করেছিলেন তা বাস্তবায়ন তো দূরের কথা নতুন করে বড় বড় সমস্যার জন্ম দেয়ায় এখন জনগণ তাদের প্রতি ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বলে বহু সুধীজন মনে করছেন।
এটা অস্বীকার করার কোন জো নেই যে, বিশেষ করে ওইসময় দেশের প্রায়সব তরুণ ভোটাররাই চারদলীয় জোট সরকারের মন্দ দিকগুলোকে বেশি প্রধান্য দিয়েছে মিডিয়া এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আশির্বাদে। দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তি-গোষ্ঠী চারদলীয় জোট সরকারের বেশ কিছু অরাজনৈতিক দুর্নীতিবাজদের শিক্ষা দিতে গিয়ে চরমভাবে দলটির মূলে আঘাত হেনে ছিল। যার ফলে ওইসময় মহাজোটকে সমর্থন ছাড়া কোন পথও দেখেনি এদেশের সাধারণ মানুষ। আর এ মহা সুযোগটিকে কাজে লাগিয়েই মহাজোট ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল! এবং একেরপর এক যতসব অনাকাক্সিক্ষত সিদ্ধান্তসমূহ জাতির কাঁধে চাপাতে থাকেন সরকার। তদন্ত আর তদন্ত কমিটি এবং দুর্নীতিসহ এমন কিছু ঘটনা তারা ঘটান এদেশে-যা জাতির কাছে তাদের অমার্জনীয় অপরাধে পরিণত হয়। দেশের শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি সেক্টরে এমন সব অরাজকতা সৃষ্টি করে এ সরকার, যা অনভিজ্ঞ, অদক্ষ, অযোগ্য ও আনাড়িদের হলিখেলার এক মহোৎসব বলে প্রতিয়মান হয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষ এখন হায়! হায়!! করছে দেশের মহামূল্যবান দায়িত্ব ভুল মানুষদের হাতে তুলে দিয়েছেন বলে।
সরকার এখন বরাবরই প্রতিহিংসা, রেষারেষি, উস্কানি এবং যাচ্ছেতাই আক্রমণাত্মক কর্মকান্ডের মধ্যদিয়ে দেশে এক ভয়াবহ অরাজক অবস্থার সৃষ্টি করেছে। দেশে যে রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি চলে আসছে দীর্ঘদিন যাবত, সরকার ওই অপসংস্কৃতিকে আরো মোটাদাগে প্রতিষ্ঠা করেছে সর্বত্র। এখন সরকার বিরোধীদলীয় ও সাধারণ মানুষদের দাবিকে উপেক্ষা করে এমন সব দমননীতি চালু করেছে যা একাত্তরের সেই ভয়াবহতাকেও হার মানায়। সরকার নিজেদের সুবিধার্থে সংবিধানকে সংযোজন-বিয়োজন করে অনৈতিকতার পথধরে নিজেদের ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে একরকম নীলনকশা বাস্তবায়নের স্বপ্নে বিভোর বলে মনে করছেন দেশের বিদগ্ধজনরা। শুধু তাই নয়, তারা রাস্তায় লেলিয়ে দিয়েছে দলীয় ক্যাডার, পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবিসহ অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি বাহিনীকে, যা জাতির ললাটে কলঙ্ক তিলক হিসেবে অঙ্কিত হয়েছে। সরকার বিরোধী দলের কর্মীদের হামলা-মামলা, নির্যাতন-নিপীড়ন, গ্রেফতার ও রিমান্ডসহ যেসব অশুভ প্রক্রিয়ায় দমন করতে চাচ্ছে তা মোটেও একটি স্বাধীন দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। বরং তা দিনে দিনে দেশে একটি অসহিষ্ণু ও অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
আমরা দেখে আসছি, সরকার ও বিরোধী দলীয়রা প্রায় সময়ই বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করে আইন তথা মানবাধীকারের পরিপন্থি অনেক কর্মকা- ঘটাচ্ছেন। সরকার ও বিরোধী দলীয় বেশ কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এমন সব আস্ফালন মার্কা, ভীতিকর ও উস্কানীমূলক বক্তব্য অহরহ মিডিয়ার সামনে প্রকাশ করছেন যা কোনোভাবেই সৃজনশীল, সুস্থ রাজনীতিচর্চা এবং গণতান্ত্রীকতার পর্যায়ে পড়ে না। বরং তা জাতির সামগ্রিক জীবনে এক কালো অধ্যায়েরই জন্ম দেয়। যেখানে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর কর্মকান্ডের ফলে গণ-মানুষের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্থ হয়, সাধারণ মানুষের জানমালের হচ্ছে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি, দেশজুড়ে নির্মমভাবে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে, পুড়িয়ে মারা হচ্ছে সাধারণ জনগণকে, চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি, হত্যা-ধর্ষণ, গুম-অপহরণ, সাংবাদিকদের ওপর হামলা-অমানষিক নির্যাতন-হত্যা, বুদ্ধিজীবীদের নেই কোনো জীবনের নিশ্চয়তা, চলছে মাদকের মহাবাণিজ্য, অস্ত্র আর সন্ত্রাসের হলিখেলায় স্তব্ধ দেশ, নিজেদের অপস্বার্থ হাসিলের জন্য দেশের মূল্যবান সম্পদ ধ্বংস করা হচ্ছে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে সব তছনছ করা হচ্ছে, ছাত্ররাজনীতির নামে চাঁদাবাজি, দাঙ্গাহাঙ্গামা ও ভাগবাটোয়ারা নিয়ে নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে, জ্বালাও-পোড়াও ও ভাঙ্গার মত জঘন্যতায় মেতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে হেন হীন কর্ম নেই যা বাদ যাচ্ছে তাদের দ্বারা। সেখানে কি পেতে পারে এই দু’টি দল থেকে দেশের জনগণ? এ প্রশ্ন এখন দেশের সাধারণ মানুষের।
কি সরকার কি বিরোধী দল রাজনীতির সুস্থধারাকে ব্যতিরেকে নিজেদের মন মতো হিং¯্র কর্মকা- করে দেশে ক্ষমতায় টিকে থাকা কিংবা ক্ষমতায় আসার জন্য একরকম মহা যুদ্ধের আশ্রয় নেয়া কিন্তু নেহাত বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের এই অপকৌশল কোন দিনই বাস্তবায়ন হবে না। জনগণ তাদের এই অশুভ চিন্তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে সহসাই। বিগত দিনে আমরা দেখেছি, ক্ষমতায় যাওয়ার আগে রাজনৈতিক নেতারা বড় বড় কথা বলেন। তাদের মুখে শোনা যায়, ‘আমরা জনগনের কল্যাণে কাজ করবো; আমরা কখনও হরতাল-অবরোধ করবো না’। ক্ষমতায় যাওয়ার পর কিংবা ক্ষমতা হারানোর পর নানান অজুহাত-ছলচাতুরীতে ওইসব প্রতিজ্ঞা ভুলে যান তারা। তারা ভাবেন না যে, কারসাজি কিংবা শক্তি প্রদর্শন করে কেউ ক্ষমতায় যাওয়া কিংবা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি এবং পারবেও না। বাংলার আপামর জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের ভোট রায়ের মাধ্যমে জবাব দেবে ওইসব অপরাজনীতিজীবীদের বিরুদ্ধে।
আজ দেশের দু’টি রাজনৈতিক দলের অপজনীতির কারণে যে অস্থিতিশীল ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, এতে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রত্যেক সচেতন মানুষ ভীষণভাবে চিন্তিত। জনগণ বরাবরই এখন বড় দুই রাজনৈতিক দলের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তারা যে কলকাঠি নেড়েচেড়ে দেশকে একান্তই নিজেদের সম্পদ মনে করছেন এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই রাজনীতি করেন এটা এখন দিনের আলোর মতই পরিস্কার হয়ে গেছে জনগণের সামনে। তারা যে বারবার ক্ষমতায় গিয়ে একে অপরের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ব্যস্ত হবে এবং দেশের বারোটা বাজাবে-এটা মানুষ এখন বুঝে গেছে। সুতরাং মানুষ এখন ভ্রান্ত একরোখা নেতৃত্বে এ বড় দুই দলকে ক্ষমতায় আর দেখতে চায় না, মানতে চায় না শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব। জনগণ চায়, নতুন নেতৃত্ব এবং সর্বঐক্যের ভিত্তিতে যদি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয় দেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল তাহলে হয়তো এ সমস্যার সমাধান হবে এবং জনগণও স্বত:স্ফুর্তভাবে ভোট রায়ে অংশ নেবে। তবে এ জন্য সর্বাগ্রে জাতীয় স্বার্থে তরুণ-শিক্ষিত প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে এবং পিছনের সব কিছু ভুলে পরিশুদ্ধ হওয়ার সংকল্পবদ্ধ করতে হবে সকল রাজনৈতিকদের। পরিশেষে আমাদের বিশেষ অনুরোধ প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় প্রধানের কাছে, আপনারা দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে বসে আলাপ আপলোচনার মাধ্যমে নিজেরা রাজনীতি থেকে অবসর নিন। দেখবেন, দেশে যে ভয়াবহ সমস্যা বিরাজ করছে তা সমাধান এমনিএমনিই হয়ে যাবে। দয়া করে জাতিকে অপরাজনীতির অনল থেকে মুক্তি দিন। আর নয়তো জেগে ওঠা জনগণ দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়ে বুঝিয়ে দেবে যে জনগণ যা চায় তাই হয়। মনে রাখবেন, জাতি আর আপনাদের অপরাজনীতির অনলে পুড়তে চায় না, চায় দুই নেত্রীর অবসর গ্রহণ। আর তবেই শান্তি ও সমৃদ্ধির বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে তরুণ প্রজন্মের দ্বারা।
=====================

লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর দাউদকান্দি, কুমিল্লা।
তারিখ:০২.১২.১৩

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply