খোঁজ

—-মিহির সেনগুপ্ত

এই লেখাটা বরিশালি সংলাপের গ্রামীণ-অতি-প্রাকৃতের মাধ্যমে লিখলে প্রবাণে আরাম পেতাম। কিন্তু খাস বরিশালি ভূমিপুত্রেরা যাঁরা এখনো বরিশালেই ভূমিস্থ আছেন, তাঁরা পর্যন্ত সেই ভাষা আর অবিকৃত বলেন না। যুগ, শিক্ষা, যাতায়াত ব্যবস্থা সব কিছুর পরিবর্তন ঘটে চলেছে। সুতরাং তার প্রভাব ভাষার উপর পড়বে, তাতে বিচিত্র কী?
সম্প্রতি মাস পাঁচেক আগে বরিশাল শহরের নবীন এবং প্রবীন সংস্কৃতি কর্মী বান্ধবেরা আমন্ত্রণ করেছিলেন, তাঁরা কবি জীবনানন্দ দাশের নামে একটি মেলার সূচনা করতে চান, যা প্রতিবছরই অতঃপর থেকে চলবে। আমাকে তার উদ্বোধক হিসাবে সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে। অনেক পরিচিত নামের মধ্যে সেখানে একজন ব্যক্তির নাম ছিল। তাঁর নাম সিকদার আবুল বাশার, তিনি ঢাকা থেকে আসবেন; সেখানকার অত্যন্ত প্রখ্যাত-একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানÑ গতিধারার কর্ণধার তিনি। আমাকে বলা হল, তিনি না কি আমার একদার ভদ্রাসনের কাছাকাছি একটি গ্রামের লোক। আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। খোঁজ নিয়ে জানলাম, তাঁর গ্রামটির নাম তারুলি। আমার আর একটি জ্ঞাতব্য ছিল, ‘কোন বাড়ির’। জানা গেল শিকদারবাড়ির। আর কিছু জানার দরকার ছিলনা আমার। এই দুটি কথায়ই আমার বুকের মধ্যে এক অসম্ভব আবেগের উদ্ভব হল। আমার পাঠক বর্গ জানেন, এই আবেগটাই-আমার লিখনদারির যথাসর্বস্ব, আমার জীবন চর্চারও এরজন্যে প্রশংসা এবং নিন্দা দুইই জোটে।

Mehersanguptho
জীবনানন্দ মেলার উদ্বোধনের আমন্ত্রণ অজুহাত মাত্র। ‘তারুলি’ এবং ‘শিকদারবাড়ি’ এই শব্দ দুটি আমাকে নিয়ে ফেলল এক ধূসর সময়ের স্বপ্নময় উপত্যকায়। অসংখ্য-লাল, নীল এবং সবুজ সব-ছবি ভেসে উঠতে লাগলো মনের আকাশে। সেইসব ছবি এমন একটা বয়সের যা মানুষ বোধ হয় কোনো দিনই ভোলেনা। সুতরাং অত্যন্ত জরাব্যাধি গ্রস্ত এক অশক্ত শরীরের ভার বহনকারী হওয়া সত্ত্বেও, সিদ্ধান্ত নিলাম, বরিশাল যাব। শিকদারবাড়ির যে এক আবুল বাশার আমাকে খুঁজছে। ‘খোঁজার’ ব্যাপারটা আমার তরফেও ছিল এবং সে কারণেই-দেশ ছাড়ার সুদীর্ঘকাল পর থেকে কারণে এবং অকারণেও আমার বরিশাল তথা বাংলাদেশ যাতায়াত অব্যাহত। বাশার আমাকে কেনো খুঁজছিল তখনো জানিনা। আমার একজন বাশার বা দুলাল বা মক্বুল এর দেখা পাওয়ার দরকার ছিল। দুলালও শিকদারবাড়ির ছেলে ছিল, ওই গ্রামেরই ইস্কুলে আমার ইস্কুল জীবনের সহপাঠি। বেশ কয়েক বছর আগে ঢাকা শহরে তাকে খুঁজে পেয়েছিলাম অনেক তিতিক্ষায়।
কিন্তু-তার মধ্যে ‘তারুলি’র খোঁজ পাইনি বলে, আমার সন্ধানটা অসম্পূর্ণই থেকে গিয়েছিল। আসলে আমি খোঁজ করছিলাম আমার কিশোর বেলাটাকে। দুলাল তখন অনেক দূরের অধিবাসী, একজন কর্মব্যস্থ ডাক্তার। পূণর্মিলনটা বেশিদূর এগোয়নি। কারণ, একতরফাভাবে আমিই ওকে খুঁজছিলাম, ও খোঁজেনি, ওর খোঁজার কারণও বাস্তবভাবে ছিলনা। তবে ওরা, ও আর স্ত্রী খুবই খুশি হয়েছিল, প্রচুর আপ্যায়নও করেছিল। আমাদেরও ভাল লেগেছিল নিঃসন্দেহে। কিন্তু আমার রচিত ‘বিষাদবৃক্ষের’ সেই রেন্ট্রির তলায় বসে গল্প করার নিবিড় ভালবাসার দিনগুলো ও ছুঁতে পারেনি। এটা জীবন যাপন এবং মানসিকতার ভিন্নতা। কিন্তু সে কথা থাক।
বাশার কেন আমায় খুঁজছেÑ বরিশাল গিয়ে একে তাকে জিজ্ঞেস করে। জানলাম যে তার প্রকাশনার কাজটা বেশির ভাগই আঞ্চলিক লোকায়ত ইতিহাস বিষয়ক এবং সে আমার বিষাদবৃক্ষ পড়েছে। সুতরাং তার খোঁজ করার মোটামুটি একটা কারণ বুঝলাম। কিন্তু ব্যক্তিক ভাবে তাকেতো আমি চিনিনা। জীবনানন্দ মেলার অনুষ্ঠান ছিল তিন দিনের। দ্বিতীয় দিনের মধ্যাহ্নেই শারিরীক কারণে শহর ছেড়ে আমাকে গ্রামের বাড়িতে চলে আসতে হয়েছিল, বাশারের অনুষ্ঠান ছিল তৃতীয় দিনে। সুতরাং তার সঙ্গে দেখা হল না। এক বন্ধু জানালেন, বাশার জানিয়েছে, ঢাকায় ও যে করে হোক আমাকে খুঁজে নেবে। ফেরার আগে ঢাকা যাওয়া বরাবরের মত এবারও বরাদ্দ ছিল। ওর কাছে আমার মোবাইল নম্বর বন্ধুরা দিয়ে দিয়েছিল।
গ্রামে ফিরে দুদিন পর মানসিক একটা অস্থিরতার মধ্যে পড়লাম। মনের মধ্যে তারুলি, শিকদারবাড়ি, শিকদারবাড়ির একদা যাঁদের চিনতাম, সেইসব লোকজন, রাস্তা ঘাট, সামনের খালটা, খাল পাড়ে সেই ইস্কুল বাড়িটা, সব কিছুর ছবি গুলো বড়ো উতলা করছিল। ঠিক করলাম, বাশারের সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয় হওয়ার আগে-জায়গাটা একটু ঘুরে আসা দরকার। গ্রামের বাজারে পরিচয়, একজন রিক্সওলা, নাম হানিফ। তার কাছে জানতে চাইলাম রিকসায় ওখানে যাবার রাস্তা আছে কিনা। ও বলল, ‘আছে, তয় রাস্তা ভাল না। আপনের যা শরীলের অবস্থা পেহার অইবে সাইদ্যের।’ বছর দুয়েক আগে ওর সঙ্গে পরিচয়। সেই থেকে ওখানে গেলে ও-ই আমাকে এখানে ওখানে নিয়ে যায়। প্রসঙ্গত বলি, আমি হাড়-সংক্রান্ত ব্যাধিতে প্রায় অর্ধপঙ্গু। কিন্তু আমাকে যে যেতেই হবে। বাশার যদি জানতে চায় ওই গ্রামে আমি কখনো যাই-কিনা এদেশে এলে, কী বলব? হানিফকে আবার বলতে সে জিজ্ঞেস করল, ‘হেহানে কী? কী দ্যাখথে যাইবেন?’ যথাসাধ্য ব্যাপারটা তাকে বুঝিয়ে বলতে সে বলল, ‘ঠিক আছে। লইয়া যামু হ্যানে, তয় ভাড়া নিমু না।’ ‘সে কী কেন?’ হানিফ বলল, ‘আপনের কথায় মোর বুকটার মইদ্যেও বড়ো মোচর দেতে আছে। আসলে মুইও ওই ইস্কুলেরই ছাত্তর আছিলাম কিনা। নাইন তামাইত পড়তে পারছি, হেহানেই শ্যাষ।’ অর্থাৎ হানিফও বোধ হয় আমাকে খোঁছে এবং আমিতো এদেশে এদের খোঁজেই আসি।
হানিফের বয়স আমার চাইতে ঢের কম। বাড়ি সংগ্রামনীল পূর্ব তারুলির সংলগ্ন। বাশারদের পরিবারকে চেনে। বাশারকেও। বলল, ‘এই  অনেকটা আপনার ল্যাহান বাতিক। থাকে ঢাকায়, ব্যবসা শুনছি বই পত্তরের। তয় গেরামের লগে যোগাযোগ রাহে। খালি পুরান দিনের মাইনসের খোজখবর করে।’ হানিফের কথায় বাশারের আন্দাজ খানিকটা চপলাম। হানিফ অত্যন্ত দুর্বিণীত রাস্তায় যায় ক্লেশে রিকস চালিয়ে তারুলি ইস্কুলে নিয়ে গেল। জায়গাটা এখন অনেক উন্নত। ইস্কুল বাড়ি, প্রাইমারি মিলিয়ে কয়েকটা। পুরোনোটাও আছে। খালটা আছে। বাশারদের বাড়ি খালটায় পূব পাড়ে। আমার চেনা জানা কেউ এখন থাকেন না। সেদিন ইস্কুল ছুটি ছিল, সাপ্তাহিক। একজন প্রৌঢ় লোককে পেলাম। অচেনা। দুলালের সম্পর্ক নিয়ে পরিচয় দিতে খাতির করলেন। বললেন, ‘হেনার’ পরিবারের কেউ এহানে নাই। যোগাযোগ একমাত্তর বাশার রাহে। ওইতো দ্যাহেন হে এ্যাটটা বাহারইয়া লাইবারি বানাইছে গেরামইয়া পোলাপান আর ইস্কুলের ছাত্তরেগো লইগ্যা, মায়ের নামে ‘সৈয়দা আশ্রাফুননেছা (ফকরুনেছা) গ্রন্থাগার-এই নামে। গেরামের লগে নাড়ির টানডা ভাল। করেও অনেক গেরামের মাইনসের লইগ্যা।’
শুনে ভাল লাগছিল বেশ। বাশারের বাবা আবদুস সামাদ শিকদারকে আমি দেখেছি এই ইস্কুলে পড়ার সময়। সে অনেককাল আগের কথা। আর চিনতাম ওর চাচা সৈজদ্দি শিকদারকে। তাঁদের চাচা বলে ডাকতাম। তাঁরা সবাই খুব øেহ করতেন আমাকে। প্রৌঢ় ভদ্রলোক ঘুরে ঘুরে তাঁদের কবরগুলি আমাকে দেখালেন। বাশার কি কি করেছে সেসবও দেখালেন। ভাল লাগছিল খুবই। কিন্তু আমার মন খোঁজ করছিল সেই দিনের ছবি, যখন-এই ইস্কুল সদ্য স্থাপিত হয় এবং শিক্ষক, ছাত্র, আসবাবপত্র বা ঘর সব কিছুরই অভাব। তখন প্রথম হেডমাস্টার সাহেব ছিলেন আমার পরমশ্রদ্ধারজন হাতেম মাঝি স্যার। তাঁকে পেয়েছিলাম মাত্র চার পাঁচ মাসের জন্য। পুরোনো দিনের মেট্রিক পাশ। আমার বাবার বন্ধু ছিলেন। ক্লাশ সেভেনএ দুমাস এবং এইটে মাস তিনেকের মত। তারপর ইস্কুল অ্যাফিলিয়েশন পেল। নতুন বি. এ. পাশ হেডমাস্টার এলেন। মাঝি স্যার চলে গেলেন। ওই চার পাঁচ মাসের মধ্যে মাঝি স্যার আমাকে এবং দুলালকে ব্যাকরণসম্মত শুদ্ধ ইংরাজি ভাষা শিখিয়েছিলেন অনুবাদ পদ্ধতিতে। তাঁর চলে যাওয়াতে আমরা খুশি হইনি। শিকদারবাড়ির বৈঠক খানার দলুজে এক সৌম্য দর্শন, দীর্ঘ অশ্র“ বৃদ্ধ দিনের বেশির ভাগ সময় বসে থাকতেন। মাঝি স্যারকে দেখতাম অবসর সময় তাঁর কাছে বসে আলাপ আলোচনা করতে। ভদ্রলোকের নাম মনে নেই। সম্ভবত দুলালের কোনো চাচা হবেন। মাঝি স্যার বলতেন, ‘পাঠান যুগের ইতিহাস এনার মুখুস্থ। তোরা এনার ধারে আইয়া মাঝে মাঝে গল্প শুনইয়া সাইস, পরে কামে লাগবে।’
সেইসব ছবি এখন আমার মনে ভাসছে। বাশারকে এখনো দেখিনি। তার বিষয়ে প্রৌঢ় ভদ্রলোক যখন তার ইতিহাস নিয়ে আগ্রহের কথা বলছিলেন তখন দলুজের সেই বৃদ্ধের স্মৃতি আমাকে আকুল করছিল। ভাবছিলাম, ঢাকায় গিয়ে যদি বাশারের সঙ্গে যোগাযোগ হয় ওকে বলব, ‘চল্, তারুলি যাই। সেখানে ওই মানুষটির কবরের পাশে বসে আমি তোকে তারুলির আসল ইতিহাস শোনাব। সেসব তোর জন্মের আগের কথা। কিছুটা হয়ত এর পর কাছে শুনে থাকবি। কিন্তু ওই সময়ের বেশির ভাগ মানুষইতো আর নেই। আমারও সময় এসে গেছে। যাওয়ার আগে, কয়েকটা খবর তোকে জানিয়ে যাব, যা আগে কেউ তোকে শোনায় নি। তোকে কি কেউ বলেছিল, এই ইস্কুলের অ্যাফিলিয়েশন পাওয়ার জন্য উপযুক্ত সংখ্যক ছাত্র জোগার করতে আমরা কী করেছিলাম?
মাস্টার সাহেবেরা দায়িত্ব দিয়েছিলেন, ক্লাশরুম অন্তত একদিনের জন্য ভরাভর্তি দেখাবার কারণে ছেলে জোগার করতে হবে। দলুজে বসা সেই চাচা মিঞার কাছে গিয়ে বললাম, ‘গেরামেতো এমন পোলাপান নাই যাগো আনাইয়া বওয়ানো যায় কেলাসে। যারা ল্যাহাপড়া করার মত, হ্যারা এদিক উদিক ইস্কুলে পড়ে। বাকিরা তো কোলায় কাম করে, সোমায় নাই। এদিনে ফজলুর রহমান সাহেব ইস্কুল পরিদর্শনে লাইনে আছেন। কী করুম?’
দলুজের বৃদ্ধ বললেন, ‘কোলার পোলাপানেগো ধরইয়া আনো’ আমরা তেমনই করেছিলাম। ফজলুর রহমান সাহেব শিকদারবাড়িরই সন্তান। ইস্কুল অ্যাফিলিয়েশন পেল। সঙ্গের প্রৌঢ়কে গল্পটা শুনিয়েছিলাম। তিনি জানিয়েছিলেন, তারুলি গ্রামে এখন অক্ষর জ্ঞান নেই, এমন একজনও বোধহয় পাওয়া যাবেনা।
পরশুর-জাহাজে ঢাকা যাব। তারুলির বাশার ‘আমারে বিচড়ায়’ আমি বাশারকে খুঁজি। ও কে আমার অনেক কথা, অনেক ইতিহাস বলার আছে। এটা আমার পরম্পরার দায়। পরম্পরা ছাড়া ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকে।

=========================================
মিহির সেনগুপ্ত
জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ পূর্ববঙ্গের বরিশাল জেলার কেওড়া গ্রামে (অধুনা বাংলাদেশের ঝালোকাঠি জেলায়)। কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু ১৯৬৩ সালে কলকাতায় চলে আসার কারণে আবার স্কুলপর্যায় থেকে পড়াশুনা করতে হয় তাঁকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষায় সন্মান (১৯৬৮)। ব্যাংক অব ইন্ডিয়াতে কর্মরত অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চলের বসবাস করেছেন। ‘বিষাদবৃক্ষ’ গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন ১৪১১ বঙ্গাব্দের আনন্দ পুরস্কার। আনন্দ থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ‘উজানি খালের সোঁতা’। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের হুগলির ভদ্রেশ্বর শহরের বাসিন্দা।

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply