‘তিতাস’ ছোট কাগজ ছোট নয়

——মো. আলী আশরাফ খান
আমরা মানুষ স্বভাবতই স্বপ্নবিলাসী। স্বপ্ন দেখতে আমরা ভালোবাসি। পৃথিবীর সব মানুষই স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নই আমাদের আলো দেখায়-আলোকিত করে, আমাদের জীবনকে সুন্দর ও মসৃণ করে। আবার এ স্বপ্নই আমাদের জীবনকে কখনো কখনো উলটপালট করে দেয়, অন্ধকারের অতল গভীরে পৌঁছে দেয়। আমরা যখন অতি আবেগপ্রবণ ও নেশায় বুঁদ হয়ে স্বপ্ন দেখি কিংবা স্বপ্নের সঙ্গে আমাদের কাজের গভীর মেলবন্ধন তৈরি করতে ব্যর্থ হই, ঠিক তখনই আমাদের স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে যায়; স্বপ্নের মাঝে আমরা হাবুডুবু খাই, একসময় আমাদের জীবনের ছন্দপতন ঘটে। সামগ্রিক অর্থে এটা বলা যায় যে, আমাদের জীবন ভ্রান্তপথে ধাবিত হয়ে নিজ নিজ অস্তীত্বকে বিপন্ন করে আমাদের এ স্বপ্ন। আমি কিন্তু বরাবরই স্বপ্নবিলাসীদের দলে। ছোট্টকাল থেকেই বহুমুখী স্বপ্ন লালন করে চলেছি হৃদয়ে। বড়-দীর্ঘ স্বপ্ন দেখে এমনি করে আজ আমি অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছি। বিশেষ করে ছোট্টকালে আমার মায়ের দেয়া নৈতিক শিক্ষা, ডা. লুৎফর রহমান ও ডেল কার্নিগীর লেখা বইগুলো আমাকে অনেক ক্ষেত্রে সফলতা পাইয়ে দিয়েছে বলে আমি মনে করি। এরপরেও যে এ চার যুগেরও অধিক সময়ে কোথাও কোথাও ব্যর্থতা আমাকে গ্রাস করেনি তা কিন্তু নয়।
অবশ্য তা ক্ষণে ক্ষণে আমার জীবনের পরতে পরতে শিক্ষার মহাওষধ-দাওয়াই হিসেবে কাজ করেছে। তবে এ ক্ষেত্রে আমার সফলতার ভাগই বেশি বলা যায়। তারপরেও আমি জানি এবং অকপটে স্বীকার করি, আমি কিছুই হইনি-কিছুই করতে পারিনি। ভাল কিছু অর্জন করাটাও হয়ে ওঠেনি এখনও। তবুও আমি স্বপ্ন দেখি! স্বপ্ন দেখি নিরন্তর স্বপ্ন এবং স্বপ্নের সঙ্গে কাজের মিল রেখে শ্রম, সময় ও মেধার সন্নিবেশ ঘটিয়ে এগিয়ে চলি। আর এমনই এক স্বপ্ননুরাগী আমার ভাই নাজমুল করিম ফারুক। তিনি তিতাসবাসীকে নিয়ে বহুদিন ধরে স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটি পত্রিকাও সম্পাদনা করে চলছেন। ‘তিতাস’ নামের একটি লিটলম্যাগ দিয়েই শুরু হয় তাঁর সাহিত্যচর্চা। এ পত্রিকাটি সম্পাদনার মধ্যদিয়ে তরুণদের সাহিত্য চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করেন তিনি। তার দায়িত্ব ও কর্তব্যকে আরো শাণিত করতে পরে আরো কয়েকটি পত্রিকা সম্পাদনার মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন আমার ভাই নাজমুল। আমরা তাকে সাধুবাদ জানাই, জানাই অন্তরের অন্তরস্থল থেকে ভালোবাসার রক্তিম শুভেচ্ছা। আমরা দোয়া করি, তাঁর এ কঠিন কাজটি সঠিকভাবে সম্পাদন করার তৌফিক আল্লহ তায়ালা যেন দান করেন তাকে। আমি বিনম্র চিত্তে সকল সৃজনশীল কাজকে শ্রদ্ধা জানাই। নিঃসন্দেহে পত্রিকার মত প্রকাশনার কাজ একটি বড় কাজ-মহৎ কাজ-এটি অতি দায়িত্বশীলতার ব্যাপারও। যেনোতেনো ব্যক্তি-গোষ্ঠী এমন ভারি কাজের দায়িত্ব নেন না, নিতে পারেন না। সাহস আর প্রজ্ঞা না থাকলে এ কাজের ধারাবাহিকতা চলতে পারে না। এর চেয়েও বড় কথা, ‘অনৈতিকতার মহাজালে আবদ্ধ সমাজ’-এর যুগে এমন কঠিন কাজ কে নেয় কাঁধে তুলে? এটা কিন্তু ভাবার সুযোগ থেকেই যায়। তারপরেও যে এ সৈনিক এ গুরুত্বপূর্ণ কাজসহ সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন, প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন আমাদেরকে সোনালী সময়ে ফিরিয়ে নেয়ার, এ জন্য তাকে অভিনন্দন জানাই, জানাই ক্তৃজ্ঞতা।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, কঠিন ও বন্ধুর পথ অতিক্রমের সময় কতটা যে সর্তক হয়ে এগোতে হয় তা সেই যাত্রীই জানে, যে যাত্রী ইতোপূর্বে পা পিছলে পড়ে পা ভাঙ্গার তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করেছেন। সাদামাটা আর দশটা মানুষের মত ডান-বামে না তাকিয়ে কিংবা নীতিহীন হয়ে পথ চলা কিন্তু দক্ষ নাবিকের কাজ নয়। দক্ষ নাবিক বিশ্বাস, সততা ও ভালোবাসার প্রচ- শক্তি নিয়ে শক্ত করে হাল ধরে সমুদ্র পাড়ি দেয়। এ কন্টকাকীর্ণ-কঠিন সময় ও ভ্রান্তধারার রাজনীতি চর্চার মাঠে একটি পত্রিকা নীতি-নৈতিকতা বজায় রেখে চালিয়ে রাখা কিন্তু সমুদ্র পাড়ি দেয়ার মতই। যে কারণে আমার নাবিক ভাইকে সর্তক থাকা চাই শতভাগ। একটি পত্রিকাকে যে কোনো অপশক্তির কাছে হেরে যাওয়া মানি অগনিত পাঠককে কুঠারাঘাত করা। সাবধান! পাঠক যদি কষ্ট পায় তাহলে পত্রিকা টিকে থাকে না-এটা মনে রাখতেই হবে এ নাবিককে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পাঠক সব সময় প্রত্যাশা করে, নিরপেক্ষ ও সত্যের মানদ-ে শতভাগ অঁটুট থেকে পত্রিকা প্রকাশ করা বড়ই কঠিন কাজ। কোনো রকম অতি মুনাফা কিংবা ছলচাতুরি নয়, সেবার মানসে যেন হয় এ মহান কাজ-পত্রিকা প্রকাশনা; এমনটিই কাম্য সাহিত্য-সংবাদপ্রেমীদের।
পরিশেষে আমরা বলবো অপ্রিয় একটি সত্য কথা। এখন প্রকৃত লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট এবং সংস্কৃতিসেবীদের যথাযথ মূল্যায়ণ নেই সমাজে। কারণ, এসব সত্যের সৈনিকেরা কখনো কাউকে তোয়াজ-তোষামোদ করে না। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে জানে না সত্যের অনুসারীরা। তাদের লেখনি ও চিন্তায় থাকে সৃজনশীলতা-সৃষ্টিশীলতা। লেজুড়বৃত্তি ও অপরাজনীতির চর্চা থেকে তারা দূরে থাকে বলেই উল্লেখযোগ্য কোনো সভা-সেমিনার কিংবা সরকারি অনুষ্ঠানে তাদেরকে ডাকা হয় না। ওইসব অনুষ্ঠানে এমন সব লোকদের নিয়ে যাওয়া হয়, যারা সমাজের অনিষ্ট করার জন্যই হয়তো জন্মেছে। যাদের দ্বারা সমাজে অকাজ হয় ভুরি ভুরি। তারাই করে এখন জেলা-উপজেলা তথা সর্বক্ষেত্রের মাতাব্বরী। তারপরেও আমি বলবো, এতে সৃষ্টিশীল ভাইদের দুঃখ করার কিছু নেই। এ অন্ধকার একদিন দূর হবে। আলো জ্বলবেই। সব ভ্রান্ততা ও নষ্ট মানুষদেরকে ঠেলে প্রকৃত মানুষেরা ঠিকই দাঁড়াবে মাথা উঁচু করে। তারা দেশ-জাতি-পরিবারকে করবে সম্মানিত। সুতরাং লিটলম্যাগ-ছোট কাগজ ছোট নয়, এটা এক সময় মহিরুহ আকারে প্রকাশ পায় এটা আমাদের বুঝতে হবে। পত্রিকার সঙ্গে সংযুক্তদের এ বিষয়টি মনে রাখতে হবে। প্রকৃত সম্মানিদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শণে এগিয়ে আসতে হবে। যে কোনো একজন লোক এসে টাকার বিনিময়ে যেনো নিজে যা নয় তা যেন জাহির করতে না পারে, এবিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। এখন আমরা লক্ষ্য করছি, পত্রিকায় এমন সব লেখা, সংবাদ ও বিজ্ঞাপন ছাপা হয় যা দেখলে বড্ড দুঃখ লাগে। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন ছাপাবো, এতে অন্যদের মাথা ব্যথা কোনো! হ্যাঁ, তা ঠিক আছে। তবে নিজে যা নয়, তা প্রচার করা কি নিজ বিবেকের প্রতি অবিচার। এতে কি ধীরে ধীরে নিজ সুপ্রবৃত্তি ধ্বংস হয়ে যায়। পত্রিকার সম্মানিত পাঠকরা এসব বুঝতে পারেন এখন। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পত্রিকা সম্পাদনা পরিষদকে বুঝতে হবে।
সৃষ্টিশীলদের মনে রাখতে হবে, যে কোনো কাজ শুরু করা যতটা না সহজ এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এর চেয়ে বহুগুনে কঠিন। সুতরাং কা-ারী হুঁশিয়ার! শক্ত করে ধরো কলম, সর্বদা পথ চলো চোখ-কান-নাক খোলা রেখে। আমি আবারো বলছি, আমরা চাই সকলের সহযোগিতায় এ তরী-‘তিতাস’ চলবে জ্ঞানসাগরে এমনটিই আমরা প্রত্যাশা করি। এ ‘তিতাস’-এ সকলের অংশগ্রহণ হোক স্বঃতস্ফূর্ত। সকলের সহযোগিতায় এগিয়ে যাক দূর বহু দূর।
===========================
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সংগঠক
গৌরীপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা।
মুঠোফেন-০১৮১৬-২৫৯৫৩২
তারিখ: ০৪ নভেম্বর ২০১৩ খ্রিস্টাব্দ

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply