ও কাজলকালো তিতাস নদীরে পানিরে তোর রক্তে রাঙা বৈঠা কান্দে তাই!

—-ফারুক ওয়াহিদ
দিনটি ছিল ১৯৭১-এর ৫ অক্টোবর মঙ্গলবার।ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর থানার তিতাস নদীর তীরে উজানচর এবং উজানচর বাজারে হানাদার বর্বর নরপিশাচ পাকিস্তানিরা অগ্নিসংযোগ, নারী ধর্ষণ এবং গণহত্যায় মেতে উঠেছিল। বর্বর নরঘাতক পাকিস্তানিরা সেদিন উজানচরে মুক্তিযোদ্ধাসহ শতশত নিরপরাধ নারী-পুরুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।
“বললো কেঁদে তিতাস নদী হরিণ বেড়ের বাঁকে, হাত দিয়ো না আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।” –তিতাস পারের কবি আল মাহমুদের সেই পবিত্র তিতাস নদীকে অপবিত্র করেছিল হানাদার বর্বর নরপিশাচ পাকিস্তানিরা। বাঞ্ছারামপুরের সেই তিতাস নদীর কাজলকালো জল শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল- সেদিন ভরে গিয়েছিল লাশ আর লাশে।
পাকিস্তানি সৈন্যদের শক্ত ঘাঁটি বাঞ্ছারামপুর থানাটি ছিল তিতাস ও তার শাখা-প্রশাখা বেষ্টিত প্রকৃতগতভাবেই যুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য অত্যন্ত সুরক্ষিত। থানা সংলগ্ন নদীর পাড়ে ছিল কংক্রিটের তৈরি শক্ত বাঙ্কার। একমাত্র বিমান আক্রমণ ছাড়া পাকিস্তানিদের কাবু করার আর কোনো পথ ছিল না- কিন্তু সেটাতো মুক্তিবাহিনীর পক্ষে তখন সম্ভবপর ছিল না।
4343435
এই বাঞ্ছারামপুর থানাটি প্রকৃতভাবে অত্যন্ত সুরক্ষিত হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকবার থানা আক্রমন ঘেরাও করে ব্যর্থ হন- তাই মুক্তিযোদ্ধারা সময় নষ্ট না করে যুদ্ধের কৌশল পাল্টিয়ে ফেলে। যেই সিদ্ধান্ত সেই কাজ- উজানচর লঞ্চঘাটের পশ্চিমদিকে তিতাস নদীর বাঁকে ৩২ হাজার ভোল্টেজ-এর বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইন তিতাস নদীর উপর দিয়ে ক্রস করেছে। তিতাস নদীর দুই পারের দুটি বিদ্যুতের টাওয়ারকে মুক্তিযোদ্ধারা শক্তিশালী এক্সপ্লসিভ দিয়ে উড়য়ে দিয়ে দুটিকেই নদীর দিকে কাত করে ফেলে দেয় এবং এতে বাঞ্ছারামপুর থানায় পাকিস্তানি ঘাঁটিতে উৎকণ্ঠা আর ভীতির সৃষ্টি হয়- কারণ সারা পৃথিবী থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং তাদের খাবার এবং রসদও ফুরিয়ে আসছে। পাকিস্তানিদের উদ্ধারকারী গানবোট তিতাস নদী দিয়ে হোমনা থানা পর্য্যন্ত এসে ফিরে যায় আর এগোতে সাহস পায় না- কারণ বাঞ্ছারামপুর থানায় যেতে হলে উজানচরে তিতাসের উপর হেলে পড়া বৈদ্যুতিক টাওয়ারের ৩২ হাজার ভোল্টটেজ-এর বিদ্যুতের তার কেটে তারপর যেতে হবে। তাছাড়া উজানচর লঞ্চঘাটে মুক্তিযোদ্ধাদের শক্ত ঘাঁটিতো আছেই।
উদ্ধারকারী পাকিস্তানিদের প্রবেশের একটিমাত্র অজানা অত্যন্ত দুর্গম পথ ছিল নৌকাযোগে ধারিয়ারচর-কল্যাণপুর ব্রিজের কাছ দিয়ে প্রবেশ করে কল্যাণপুর-শেখেরকান্দি দিয়ে পিছন দিক দিয়ে উজানচরে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি আক্রমন করা। কিন্তু সে পথ এত অচেনা এবং দুর্গম ছিল যে হানাদার পাকিস্তানিদের পক্ষে সেটা চেনা কিছুতেই সম্ভব নয়। সেচিন্তা অবশ্য মুক্তিযোদ্ধাদেররও ছিল। ধারিয়ারচর বাজার টু কল্যাণপুর ব্রিজ পর্য্যন্ত সারারাত মুক্তিযোদ্ধাদের টহল ছিল। সারারাত খোশমেজাজে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের গান গেয়ে গেয়ে নৌকাযোগে টহল দিতে দিতে ৫ অক্টোবর ’৭১ মঙ্গলবার ঊষার আলো ঊকিঁ দেওয়ার সাথে সাথে মুক্তিযোদ্ধারা ক্লান্ত হয়ে পরেন। সারারাত টহলরত ক্লান্ত নির্ঘুম মুক্তিযোদ্ধারা ডিউটি শিফ্ট পরিবর্তন করার জন্য কিছুক্ষণের জন্য অন্য জায়গায় গেলে অর্থাৎ একটু চোখের আড়াল হলেই এই সুযোগে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা এদেশীয় পদলেহী কুখ্যাত রাজাকারদের দেখিয়ে দেওয়া পথ দিয়ে ১০/১৫টি ছইওয়ালা বড় বড় নৌকা বোঝাই হয়ে খুব ভোরে হানাদার পাকিস্তানিরা তড়িৎগতিতে একযোগে ধারিয়ারচর-কল্যাণপুর ব্রিজের গোড়ায় নেমে পড়ে। পাকিস্তানি সৈন্যরা ডাবল মার্চ করতে করতে রাজাকারদের দেখিয়ে দেওয়া পথে কল্যাণপুর-শেখেরকান্দি হয়ে উজানচরে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের পিছন দিক দিয়ে অতর্কিতে একযোগে এলএমজি, রকেট ল্যাঞ্চার, মর্টারসহ আক্রমন চালায়। হঠাৎ পিছন দিক থেকে একযোগে এ্যাটাক হওয়াতে মুক্তিযোদ্ধারা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেও শেষ রক্তবিন্দু নিঃশেষ না হওয়া পর্য্যন্ত হানাদার পাকিস্তানিদের সাথে বীরের বেশে লড়তে থাকে। দুপক্ষের মুখোমুখি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে হোমনা-বাঞ্ছারামপুরের বিরাট এলাকা এবং প্রচন্ড গোলাগুলিতে তিতাসের জলও কেঁপে কেঁপে উঠে।
বুকের তাজা রক্ত ঢেলে বীরের বেশে লড়তে লড়তে বাঞ্ছারামপুরের উজানচরের তিতাসের তীরের পবিত্র মাটি মাতাকে সিক্ত করেছিলেন যে সকল মুক্তিযোদ্ধারারা- সেই শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধারা হলেন- (১) হাবিবুল্লাহ হাবিব(রহিম সাহেবের ছেলে), গ্রাম: বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া; (২) শাজাহান, গ্রাম: গুনাইঘর, দেবীদ্বার, কুমিল্লা; (৩) নূরুল ইসলাম, গ্রাম: গুনাইঘর, দেবীদ্বার, কুমিল্লা; (৪) ফকরুল, গ্রাম: সুসন্ধ্যা, মুরাদনগর,(৫) বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল, গ্রাম: মানিকপুর, বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। কুমিল্লা এবং আরো অনেক নাম না জানা মুক্তিযোদ্ধা- এছাড়াও আহত হয়েছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যেকেরই বুকের মধ্যে গুলি লেগেছিল- এটাই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা। এই রক্তাক্ত ৫ অক্টোবরই নেকড়ের চেয়েও অধিক হিংস্র পশু হানাদার পাকিস্তানিরা পদলেহী দোসর রাজাকারদের সহযোগিতায় উজানচরে নির্বিচারে গণহত্যা, নারীনির্য্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও লুঠতরাজে মেতে উঠে। পার্শ্ববর্তী নালাদক্ষিণ গ্রামের মসজিদ থেকে মুসল্লীদের ধরে এনে উজানচর লঞ্চঘাটের সরকারি পাকা গোডাউনের পাশে লাইন করে দাড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে এবং অতি উল্লাসিত হয়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে এবং লাশ তিতাসে ফেলে দেয়।
তিতাসের উত্তর তীর সংলগ্ন উজানচর লঞ্চঘাট, উজানচর বাজার এবং সমগ্র উজানচর এলাকা ছিল বাঞ্ছারামপুরের অভিজাত এলাকা। হিন্দু অধ্যূষিত উজানচরের সাজানো বাড়িঘরগুলো হিংস্র হায়েনার দল তথা পাকিস্তানিরা গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। শতশত নিরপরাধ শিশু-মহিলা-পুরুষদেরকে নির্বিচারে গুলি করে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী জমজমাট অভিজাত উজানচর বাজারটি ঘাতক হানাদার পাকিস্তানিরা গানপাউডার ছিটিয়ে দিয়ে জ্বালিয়ে সম্পূর্ণ ভস্মিভূত করে ফেলে। বাজারের শতবর্ষী বটগাছগুলোও পুড়ে যায়। উজানচর বাজারের আগুনের লেলিহান শিখা দশ মাইল দূর থেকেও দেখা গিয়েছিল। কালো ধোঁয়ায় সেদিন শরতের নীল আকাশ ঢেকে গিয়েছিল। বাজারটি সম্পূর্ণ ভস্মিভূত হলেও আগুনের লেলিহান শিখা থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পায় উজানচর বাজারের প্রাচীন মঠটি- যা এখনও অক্ষত আছে।
কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন- “তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা/ সকিনা বিবির কপাল ভাঙলো,/ সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর।” – কিন্তু ৫ অক্টোবর’৭১ মঙ্গলবার বাঞ্ছারামপুরের উজানচরের কত সকিনা বিবির কপাল ভেঙেছিল এবং কত হরিদাসীর সিঁথির সিঁদুর সেদিন মুছে গিয়েছিল স্বাধীনতার এত বছর পরও সেই খবর কেউ কি কোনোদিন নিয়েছেন? উজানচরের গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুঠতরাজ এবং নারী ধর্ষণে সেদিন হানাদার পাকিস্তানিদের সাথে মুখে গামছা বেঁধে যেসকল কুলাঙ্গার রাজাকাররা অংশগ্রহণ করেছিল- তাদের অনেককেই বাঞ্ছারামপুর তথা উজানচরের জনগণ ভাল করেই চেনেন- কিন্তু এতবছর যাবত ভয়ে চুপ করে ছিলেন- আর কতকাল চুপ করে থাকতে হবে? এখনও কি সময় হয়নি এই নরঘাতক বেঈমান মিরজাফরদের চিনিয়ে দেওয়ার? কারণ উজানচরে একাত্তরের তিতাস পারের আর্তনাদ আজও শোনা যায়! এইসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করে সুকান্তের ‘দিনবদলের পালা’-র ভাষায় বলবো- “অনেক নিয়েছ রক্ত, দিয়েছ অনেক অত্যাচার, আজ হোক তোমার বিচার।”
স্বাধীনতার এতোবছর পরও এই নিষ্ঠুর গণহত্যার বিচারের অপেক্ষায় একমাত্র সাক্ষী বহমান তিতাস নদী নীরবে নিভৃতে আজও কেঁদে যাচ্ছে- তাই অমর পাল-এর একটি গানের সুরে মিল রেখে বলবো-
‘ও কাজলকালো তিতাস নদীরে
পানিরে তোর রক্তে রাঙা বৈঠা কান্দে তাই!’

=================================
লেখক:- ফারুক ওয়াহিদ
মুক্তিযোদ্ধা, ২ নং সেক্টর বাঞ্ছারামপুর
বর্তমানে ম্যানচেস্টার, ক্যানেটিকাট, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।

Check Also

মাদকসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরকারকেই জোরালো ভূমিকা নিতে হবে

—-মো. আলীআশরাফ খান লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন, কেনো লেখাটির এমন শিরোনাম দেয়া ...

Leave a Reply